|
ছোট প্রয়াস, বড় পরিবর্তন: তরুণ নেতৃত্বে স্বেচ্ছাসেবা ও দক্ষতার বিকাশ
নাজমুল হাসান
|
![]() ছোট প্রয়াস, বড় পরিবর্তন: তরুণ নেতৃত্বে স্বেচ্ছাসেবা ও দক্ষতার বিকাশ বাংলাদেশের তরুণসমাজ আজ সামাজিক পরিবর্তনের কেন্দ্রে অবস্থান করছে। রক্তদান, দুর্যোগ-সহায়তা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, পরিবেশ রক্ষায় গাছ লাগানো, শিক্ষায় সহায়তা, সচেতনতা, সব ক্ষেত্রেই তরুণদের প্রাণবন্ত উপস্থিতি ভবিষ্যতের জন্য আশাব্যঞ্জক। স্কাউট, রেড ক্রিসেন্ট, বিএনসিসি, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক বিভিন্ন ক্লাব ও সংগঠন এবং স্থানীয় ক্লাবগুলো তরুণদের মধ্যে দায়িত্ববোধ, নেতৃত্বগুণ এবং মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আমাদের দেশে প্রায়ই মনে করা হয় যে, শিক্ষার মূল লক্ষ্য যেন শুধু পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান জীবনযুদ্ধে যথেষ্ট নয়। মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা, দলে কাজ করা, সংকটে সিদ্ধান্ত নেওয়া, সময় বণ্টন, পরিকল্পনা গ্রহণ, এগুলো বাস্তব অভিজ্ঞতায় গড়ে ওঠে। স্বেচ্ছাসেবাই তরুণদের সেই অমূল্য বাস্তব জ্ঞান দেয়, যা কখনো বই থেকে শেখা যায় না। আজকের বিশ্ব প্রযুক্তিনির্ভর। উচ্চতর দক্ষতা ছাড়া ভবিষ্যৎ কর্মবাজারে টিকে থাকা কঠিন। উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীদের ক্লাব-অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব, সমাজসেবামূলক কাজ এবং প্রকল্প পরিচালনার দক্ষতাকে মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করে। বাংলাদেশেও এখন নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো উপলব্ধি করছে যে, শুধু ভালো ফলাফলই নয়, একজন তরুণেদর ব্যক্তিত্ব, যোগাযোগ-দক্ষতা, নেতৃত্ব এবং মানবিক অভিজ্ঞতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যারা স্বেচ্ছাসেবায় যুক্ত থাকে, তারা অনেক বেশি পরিকল্পনা করতে পারে, দায়িত্বশীল ও সময়-সচেতন হয়ে ওঠে। ফলে তারা শিক্ষাজীবনেও অধিকতর সফল হয়। স্বেচ্ছাসেবার মধ্য দিয়ে যে বিশেষ চরিত্র গুণ গড়ে ওঠে তা হলো মানবিকতা। বন্যার্ত মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া, রক্তের প্রয়োজন শুনে দ্রুত এগিয়ে যাওয়া, জলবায়ু সংকটে সচেতনতা সৃষ্টি করা, এসব কাজ তরুণদের চেতনায় মানবতার গভীর বীজ বপন করে। সমাজের বৈষম্য, সংকট ও দুর্বলতা চোখে দেখলে তারা কেবল দর্শকের ভূমিকায় থাকে না, বরং সমাধানের পথ খোঁজে। সহমর্মিতা, সাম্য এবং নৈতিকতার মতো মূল্যবোধ স্বেচ্ছাসেবার মাধ্যমে ব্যক্তিত্বে স্থায়ীভাবে গড়ে ওঠে। আজ বহু শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছে। বিভিন্ন সম্মেলন, প্রশিক্ষণ, স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ শুধু দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছে না, বরং তাদের জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিজ্ঞতাকে বৈশ্বিক পরিসরে প্রসারিত করছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, স্বেচ্ছাসেবা আর শুধু দেশসেবা নয়, এটি আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জনেরও এক সুবর্ণ সুযোগ। অনেকেই ভুল ধারণা পোষণ করেন যে, স্বেচ্ছাসেবায় যুক্ত হলে পড়াশোনায় বাধা সৃষ্টি হয়। কিন্তু গবেষণা ও অভিজ্ঞতা জানাচ্ছে, বিষয়টি আসলে এর বিপরীত। যারা সমাজসেবায় যুক্ত থাকে, তারা সময়ের মূল্য ভালো বোঝে, কাজের পরিকল্পনা আগে সাজিয়ে নেয় এবং দায়িত্বশীলতা অনুশীলন করতে করতে শিক্ষায়ও আরও মনোযোগী হয়ে ওঠে। তারা শেখে, কীভাবে একাধিক কাজ দক্ষভাবে একসঙ্গে পরিচালনা করতে হয় এবং কীভাবে জীবনে সঠিক ভারসাম্য ধরে রাখতে হয়। ফলাফল হিসেবে দেখা যায়, তারা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিণত, সক্রিয় ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। যে তরুণ প্রকৌশল নিয়ে পড়ছে, সে যখন পরিবেশ-সংরক্ষণে মাঠে কাজ করে, তখন প্রকৃতির সংকট তার কাছে নতুনভাবে উন্মোচিত হয়। সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র সমাজসেবায় যুক্ত হয়ে মানুষের বাস্তব জীবন বুঝতে শেখে। ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষার্থী কোনো সামাজিক প্রকল্প পরিচালনা করে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত হয়। অর্থাৎ, তাত্ত্বিক জ্ঞানের সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতা যোগ হয়ে তাদের ভাবনা ও সিদ্ধান্ত আরও পরিণত, যুক্তিসংগত ও সমাজমুখী হয়ে ওঠে। জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ, বর্জ্য-সংকট, দারিদ্র্য, বৈষম্য, নারী-পুরুষ সমতা, মানসিক স্বাস্থ্য, আমাদের সমাজে চ্যালেঞ্জের তালিকা দীর্ঘ। তবে এসব সমস্যার মোকাবিলায় সবচেয়ে সক্রিয় শক্তি হলো তরুণ প্রজন্ম। একটি চারা রোপণ হয়ত সামান্য কাজ মনে হতে পারে, কিন্তু হাজারো তরুণ যদি একযোগে হাজারো চারা রোপণ করে, তা গড়ে তোলে সবুজ ও সুস্থ ভবিষ্যতের ভিত্তি। একজন তরুণ যদি বাড়ির উঠোনে বর্জ্য পরিষ্কার করতে শেখায়, তা থেকেই শুরু হতে পারে পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতার সামাজিক আন্দোলন। একজন স্বেচ্ছাসেবক যদি একটি শিশুকে পড়াতে সাহায্য করে, সেখান থেকেই জন্ম নিতে পারে আলোকিত জীবনের নতুন ধারা। এই কারণেই বছরের প্রতিপাদ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কোনো কাজই ছোট নয়। মানুষের কল্যাণে করা প্রতিটি ক্ষুদ্র প্রয়াসই গড়ে তোলে বৃহত্তর পরিবর্তনের চাবিকাঠি। আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবক দিবস আজ, তরুণদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে, আপনার ভেতরের আলো প্রকাশ করুন এবং সমাজের অন্ধকার দূর করার পথে এগিয়ে আসুন। কারণ আপনার এক ছোট অবদানও হতে পারে আগামী দিনের বড় পরিবর্তনের প্রথম সোপান। লেখক : নাজমুল হাসান (পিআরএস, উডব্যাজার) রোভার স্কাউট লিডার ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এয়ার রোভার স্কাউট গ্রুপ, ঢাকা। মোবাইলঃ ০১৮২৯৫৫১১৬৮ ই- nazmul33-3424@diu.edu.bd |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
