|
‘ককপিট‘ কী ও কেন?
মাসরুর আরেফিন
|
![]() ‘ককপিট‘ কী ও কেন? ‘ককপিট‘ আপনার দালালির নতুন রুপ। মানে আগে ছিলো ‘আগষ্ট আবছায়া‘; এখন ‘ককপিট‘। মানে, আগে শেখ হাসিনার পিতা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে উপন্যাস লিখেছিলেন, আর এখন দিন-বদলের হাওয়ায় ভেসে লিখছেন তাঁর কন্যার পতনের কাহিনী। এ প্রসঙ্গে আমার কথা: শেখ হাসিনা আমলে লেখা ওই ‘আগস্ট আবছায়া‘ শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগ নিয়ে কোনো লেখা ছিল না। ওটাকে ঠিক বঙ্গবন্ধু নিয়ে কোনো লেখাও বলা যাবে না। এত বড়ো বইয়ের মাত্র ৪৫টা পৃষ্ঠা ছিল ১৯৭৫ ট্র্যাজেডি। আর (অন্য কিছু কমেন্টের উত্তরে বলছি)—শেখ হাসিনার কাছে বইটা বেচবার কোনো ব্যাকুলতা আমার ছিল না। ‘আগস্ট আবছায়া‘ শেখ হাসিনার ‘উন্নয়ন‘ নিয়ে লেখা কোনো বই না যে তা থাকাটা যৌক্তিক হতো। তবে বঙ্গবন্ধু-কন্যা হিসেবে তাঁর প্রতি আমার যে অবাক মুগ্ধতা ছিল না, তা না। বঙ্গবন্ধু আমার কাছে অনেক বিরাট এক মানুষ এবং তিনি তা-ই থাকবেন চিরকাল। কিন্তু আমাদের ব্যাংকিং সেক্টরে বীভৎস লুট শুরু হলে তাঁর কন্যার প্রতি মুগ্ধতা ব্যক্তিগত অপছন্দে রূপ নিতে শুরু করে। আমার হিসেবে এই বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনাই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সকল চেতনা, আমাদের বাঙালি থাকবার সকল গর্ব, হানাদার পাকিস্তানিদেরকে সত্য রূপে চিনবার সকল আনন্দ—সবটাতে পানি ঢেলে এ দেশের ব্যাংকিং সিস্টেমের অনেক টাকা পকেটে নিয়ে চলে গেছেন। তাহলে কী ছিল 'আগস্ট আবছায়া'? ১৯৭৫ ট্র্যাজেডিকে উপন্যাসের পিভট (pivot) বানিয়ে ওটা টোটালি ছিল মানব সভ্যতায় সহিংসতার ভূমিকা নিয়ে লেখা এক দার্শনিক ঘরানার আখ্যান। আর তাঁর নির্মম হত্যাকাণ্ড নিয়ে বা সেটা ঘিরে কোনো উপন্যাস লেখা যাবে না কেন? আর লিখলেই তা দালালি হবে কেন? ফ্যাসিবাদের ধরলাম পতন হয়েছে। তো, আজও তো ওই হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে সাহিত্য করা জায়েজ। ‘ককপিট‘-ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে কোনো বর্তমান কারও দালালি না। এটা জুলাই অভ্যুত্থানের কিছুই না। আর স্বৈরাচার চলে গেছে, তা বিশ্বাস করবার মতো গবেট আমি না। আমি জানি রাষ্ট্রযন্ত্রগুলো স্বভাবগতভাবেই দমনমূলক। তাদের মূল কাজ মুক্তি দেওয়া না; মূল কাজ আমাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলা আর শাসন প্রতিষ্ঠা করা। এক শাসন থেকে অন্য শাসনে যাবার পার্থক্য কখনোই এমন হয় না যে, নতুন শাসনে দমনপীড়ন মুছে যায়। কোনো নতুন সরকার স্রেফ আগে সরকারের চাইতে ভালো শেখে যে, দমনকে কী করে দরকষাকষি ও ছদ্মবেশী ভদ্র চেহারা ও লেনদেনের মাধ্যমে পরিচালনা করতে হয়। এটা দেশ থেকে দেশে গণতান্ত্রিক হতে চাওয়ার প্রাসাদ-কৌশল। অর্থাৎ আইন নরম করো, জনসম্মতির আওয়াজ তোলো আর প্রসিডিউরাল কিছু সংযম দেখাও, যাতে-যাতে-যাতে বলপ্রয়োগের ধার কিছুটা মসৃণ হয়। ওটুকুই। অর্থাৎ, এই সিস্টেমে দমন কোনোদিন বিলুপ্ত হয় না। মানে, আমরা দেশ থেকে দেশে দমনপীড়নের স্রেফ ক্যালিব্রেশনই দেখি। এ অর্থে, রাষ্ট্র কাঠামোগতভাবেই স্বৈরতান্ত্রিক, আর রাষ্ট্রের সবচাইতে কোমল রূপের মধ্যেও ফ্যাসিবাদের একখানা সংযত ও গৃহপালিত সংস্করণ আপনি খুঁজে পাবেনই পাবেন। তো, নো ওয়ে, ‘ককপিট‘ ফ্যাসিজমের অবসান নিয়ে কোনো লেখা না। শেখ হাসিনার সুশাসন বা দুঃশাসন নিয়েও এটা কোনো লেখা না। যারা এতে শেখ হাসিনার শাসন কি অপশাসন কি জুলাইকে খুঁজবেন, তাঁরা দুঃখ পাবেন। ‘ককপিট‘ স্রেফ এক ব্যক্তি মানুষের জীবনের এক চরম মুহূর্তকে মোকাবিলা করবার কাহিনী। ‘ককপিট‘ একইসাথে সেক্সুয়াল নর্মস ও ট্যাবু বিষয়ের সঙ্গে লড়বার ‘দর্শনপীড়িত‘ এক টেক্সটও। হঠাৎ সেক্স কেন? প্রচ্ছদে ‘বিডিএসএম‘ সেক্সের ছবি কেন? ফ্যাসিজম সমাজের রুলস ও বেসিক নর্মস ভাঙে, জনগন ও সরকারের মধ্যেকার বেসিক চুক্তি ভাঙে, আর সব বিশ্বাসকে অগোছালো করে দেয়। অন্যদিকে, কী আজব যে, প্রথাগতভাবে সেক্সকে দেখবার চোখটা বন্ধ করলেই ভেঙে পড়ে সভ্যতার শাশ্বত রূপের গোছানো চেহারা। আমি বলছি না, পেইন ভালো জিনিস। কিন্তু ফ্যাসিজমের পুরোটাই পেইন, বাকিটা শাসকের পরিসংখ্যান। আমি বলছি না, ট্যাবু ভাঙাটাই ভালো। কিন্তু বলছি যে, ফ্যাসিজমের চেহারা শাসকের বাকি আওয়াজের সামনে বিশাল এক ‘অদৃশ্য‘, ট্যাবুর মতো।—অতএব ক্ষমতাকে দৃশ্যমান করে দেখানো যেতে পারে একবার। বাউন্ডারি ভেঙে ফেলে লিখে ক্ষমতাকে দৃশ্যমান করবার চেষ্টা করা যেতে পারে একবার। শাসক চায়, ক্ষমতা সবসময় স্বাভাবিকে ঢুকে নামহীন হয়ে পড়ুক। ‘ককপিট‘ সেই নামহীন ও কেড়ে নেওয়া ক্ষমতাকে নাম দেওয়ার চেষ্টা। ‘ককপিট‘-এর প্রচ্ছদ দেখায় ‘ফুল-ফেসড লেদার বন্ডেজ হুড‘ বা দাসত্বের ওই পোশাক গায়ে পরে আমরা দাস, অর্থাৎ শাসকের সামনে নিজের নিজেকে—আত্মাসহ—আমরা ভাঙতে সক্ষম। ‘ককপিট‘ ভাঙা আত্মার গড়া, ভাঙা ও পুনঃনির্মাণের কাহিনী। অর্থাৎ ব্যক্তির নতুন মোক্ষ, নতুন নির্গম, নতুন নর্মস, নতুন মার্কেট ও নতুন ডিসিপ্লিনের গল্প। এক কথায়, গত সরকারের গড়া সমাজ নিরীহ ধরনের প্রজা ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের এক সিস্টেম তৈরি করেছিল। 'ককপিট' জীবনের বিপদ ও চরম সংকট মুহূর্তের নিরিখে সেই ম্যানুফ্যাকচারিং প্রসেসে বাধা ঘটানোর আয়োজন। এসবই 'ককপিট'। ‘ককপিট‘—অবশ্যই প্লেনের ককপিট। কিন্তু ‘কক‘ মানে আবার পুরুষের প্রজনন যন্ত্রও। আর পিট মানে গর্ত, গহ্বর, যার ভেতরে ধরেন মোরগ বা কক গিয়ে ঢুকলো শিয়ালের ভয়ে, আর বন্দুকের ঘোড়া বা কক আছে যে-গর্তের পাহারায়। ‘ককপিট‘ মানুষের শারীরিক বন্দুকগুলোর পিট, মোরগের বাঁকানো মাথা, রাষ্ট্রযন্ত্রের হাইয়ের ফাঁক দিয়ে দেখা বিশাল রাষ্ট্রীয় মুখগহ্বর, বুলেভার্ডের শেষ প্রান্তে খাড়া ককড হয়ে থাকা কী যেন! সে ভুলের ককপিট (উড়ছে মনে হয়, কিন্তু রানওয়ে ছাড়েনি), সে ককপিট-সিন্ড্রোম (গিয়ার টানলেই ইতিহাস ঘুরে যাবে, এই বিশ্বাস)। ‘ককপিট‘ বলে ক্ষমতা সবসময় বড় জায়গা পছন্দ করে না বরং সে পছন্দ করে ককপিট—একখানা ছোট ঘর, যেখানে কয়েকজন মানুষ বোতাম টিপে মনে করছে তারা নিজেরাই আকাশ। কিন্তু যেহেতু সে আসলে মোরগের বাঁকানো মাথা, তাই সেখানে—ককপিটে—বসে থাকলেই নিয়ন্ত্রণ জন্মায় না, শুধু আত্মগরিমার আওয়াজই বাড়ে। ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর সিদ্ধান্তগুলো দেখছি প্রায়ই নেওয়া হচ্ছে এই ককপিট থেকেই। সেভাবে রাষ্ট্র বলতে চায় তোমাদের জীবনটা লিরিক্যাল। কিন্তু পাঁচই আগস্ট দেশে ফিরতে থাকা শেখ হাসিনার ওই ঘনিষ্ঠতম সহচর হঠাৎ বুঝলেন, জীবন লিরিক্যাল না, জীবন খটখটে এক গদ্য—সজারুর পিঠের মতো, শুকনো আর কাঁটাযুক্ত। হাসিমুখেই তাঁর মনে পড়লো বসের শাসনামলে অনেকগুলো দিন ফুল-ফেসড লেদার বন্ডেজ হুড পরে জীবনকে অর্থপূর্ণ করে চলবার কথা। লেখক: মাসরুর আরেফিন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিটি ব্যাংক। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
