|
বিদ্রোহীর সমাধি পাশে বিপ্লবী
রেজাবুদ্দৌলা চৌধুরী
|
![]() বিদ্রোহীর সমাধি পাশে বিপ্লবী ওসমান হাদির রাজনৈতিক ভূমিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে সাধারণ মানুষের ভাষায় রূপ দেওয়া। জুলাইয়ের চেতনা' কেবল ক্ষমতার পালাবদলের আকাঙ্ক্ষা নয়, এটি অপমানিত নাগরিকত্ব পুনরুদ্ধার, ভয়মুক্ত মতপ্রকাশ এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পর্ক পুনর্গঠনের দাবি। ওসমান হাদি এই বিমূর্ত ধারণাকে বক্তৃতা ও রাজনৈতিক অবস্থানের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে নামিয়ে এনেছিলেন। তার বক্তব্যে রাষ্ট্র কোনো দূরবর্তী ক্ষমতার কাঠামো নয়, রাষ্ট্র নাগরিকের সম্মিলিত অধিকার। তিনি জুলাইকে ব্যাখ্যা করেন প্রতিশোধের রাজনীতি হিসেবে নয়, বরং জবাবদিহির রাজনীতি হিসেবে; সহিংসতার অনুমোদন হিসেবে নয়, বরং আইনের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হিসেবে। এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই তার ভাষা তরুণদের পাশাপাশি শ্রমজীবী, নিম্ন-মধ্যবিত্ত এবং রাজনীতিতে দীর্ঘদিন অবহেলিত মানুষের মধ্যেও গ্রহণযোগ্যতা পায়। জুলাইয়ের চেতনা তার কাছে কোনো একদিনের বিস্ফোরণ নয়, এটি একটি চলমান রাজনৈতিক নৈতিকতা – যার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে আবার নাগরিকের মুখোমুখি দাঁড় করানো সম্ভব। বাংলাদেশভিত্তিক রাজনীতির একটি মৌলিক স্তম্ভ হলো সাংস্কৃতিক আগ্রাসন প্রতিহত করা- যার অর্থ অন্য সংস্কৃতিকে অস্বীকার করা নয়, বরং নিজস্ব সাংস্কৃ তিক আত্মপরিচয়কে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সুরক্ষিত রাখা। ভাষা, ইতিহাস, গণসংগীত, পোশাক, গণমাধ্যম এবং জনপরিসরের নান্দনিকতা— এসবই কেবল সংস্কৃতির উপাদান নয়, বরং রাজনৈতিক চেতনার বাহক। ওসমান হাদির বক্তব্যে এই বিষয়টি প্রায়ই স্পষ্ট ছিল: রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব তখনই অর্থবহ হয়, যখন সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ থাকে। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন সাধারণত সামরিক বা প্রকাশ্য দখলের মাধ্যমে আসে না; এটি আসে কনটেন্ট, বাজার, অভ্যাস এবং মানসিক অনুকরণের মধ্য দিয়ে। রাষ্ট্র যদি এসব ক্ষেত্রে নীতিগতভাবে নিরপেক্ষ বা নিষ্ক্রিয় থাকে, তবে জাতীয় রাজনীতিও ধীরে ধীরে অন্যের ভাষায় কথা বলতে শুরু করে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশি রাজনীতির দায়িত্ব কেবল ক্ষমতা পরিচালনা নয়, বরং এমন একটি সাংস্কৃতিক পরিসর রক্ষা করা- যেখানে নাগরিকরা নিজেদের ইতিহাস, ভাষা ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রকে কল্পনা করতে পারে। সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় রক্ষা তাই সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ নয়; এটি রাজনৈতিক স্বাধীনতার পূর্বশর্ত। ওসমান হাদির রাজনীতি স্পষ্টভাবেই জাতীয়তাবাদী ছিল এবং তা ছিল সুসংগঠিত। তিনি সার্বভৌমত্বকে মর্যাদার প্রশ্ন হিসেবে দেখতেন। তার বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে, দেশের ভেতরের গণতান্ত্রিক ভিত্তি দুর্বল হলে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিজস্ব সিদ্ধান্তে থাকে না, অন্যের শর্তে নির্ধারিত হয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব নিয়ে তিনি ও তার সমর্থকেরা প্রকাশ্য সমালোচনা করেছেন- বিশেষ করে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর তার ভারতে অবস্থানের প্রেক্ষাপটে। ওসমান হাদির বক্তব্য যে জায়গায় মানুষের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করেছিল, তা হলো এই বাস্তবতা— বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অনেক সময় শর্তসাপেক্ষ ও আঞ্চলিক শক্তির চাপের মধ্যে আবদ্ধ বলে মনে হয়। ওসমান হাদির বক্তব্যে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক চিন্তাধারা উঠে আসত কেবল দলীয় পরিচয়ের সূত্রে নয়, বরং একটি সুস্পষ্ট রাষ্ট্রদর্শনের প্রতিনিধিত্ব হিসেবে। তিনি জিয়াউর রহমানকে যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রকে পুনর্গঠনের প্রচেষ্টার প্রতিচ্ছবি হিসেবে এবং খালেদা জিয়াকে নির্বাচনি বৈধতা, আপসহীন নেতৃত্বের ও কর্তৃত্ববাদবিরোধী অবস্থানের প্রতিনিধিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করতেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি নিজেকে ইতিহাসবিচ্ছিন্ন কোনো চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করেননি। বরং তিনি জুলাই অভ্যুত্থানের প্রজন্মকে পূর্ববর্তী জাতীয়তাবাদী ধারার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেন। আমার মতে, এটি কোনো রাজনৈতিক কৌশলের প্রদর্শন নয়, বরং তরুণদের শক্তি ও পুরোনো জাতীয়তাবাদী ধারার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির প্রয়াস। শত হুমকি সত্ত্বেও ওসমান হাদি রাজনীতি থেকে সরে যাননি। তার বক্তব্যে বা অবস্থানে আত্মরক্ষার হিসাব কখনো প্রাধান্য পায়নি। তিনি জানতেন, দৃশ্যমান রাজনীতি ঝুঁকিমুক্ত নয়- বিশেষত এমন এক সময়ে, যখন ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস চলছে এবং সহিংসতা পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি। তবুও তার ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা ছিল দৃঢ়। তিনি বিশ্বাস করতেন, সঠিক বিচার প্রতিষ্ঠিত হলে ব্যক্তিগত ত্যাগ অর্থহীন নয়। নিজের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়লেও তিনি ভয় পাননি, কারণ তার দৃষ্টিতে রাজনীতি ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার দায়িত্ব। হাদির এই অবস্থান তাকে কোনো আত্মঘাতী নায়ক বানায় না; বরং এটি স্মরণ করিয়ে দেয়, গণতন্ত্র টিকে থাকে তাদের মাধ্যমেই, যারা জানে- ন্যায়বিচার ছাড়া ব্যক্তিগত নিরাপত্তার নিশ্চয়তা শেষ পর্যন্ত অর্থহীন। জুলাইয়ের অভ্যুত্থান এই প্রত্যাশা তৈরি করে যে রাজনৈতিক সহিংসতা আর সহনীয় হবে না। হাদির হত্যাকাণ্ড সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। নির্বাচনি পরিবেশে যদি একজন দৃশ্যমান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে হত্যা করা যায় এবং অভিযুক্তরা দ্রুত পালাতে সক্ষম হয়, তাহলে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে ন্যায়বিচার হতে হবে নিরপেক্ষ, দ্রুত এবং দৃশ্যমান। এ রকম কিছু হলেই মানুষ বিশ্বাস করবে- ক্ষমতা বদলেছে, চরিত্র নয়। ওসমান হাদির জীবন রাজনীতিকর্মীদের জন্য কয়েকটি স্পষ্ট শিক্ষা রেখে যায়। প্রথমত, রাজনীতিতে দৃশ্যমানতা যত বাড়ে, ঝুঁকিও তত বাড়ে এবং সেই ঝুঁকি ব্যক্তিগত সাহস দিয়ে নয়, সংগঠিত নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি দিয়ে মোকাবিলা করতে হয়। হাদি জনপ্রিয় বক্তা ছিলেন, কিন্তু রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর দুর্বলতা তাকে সুরক্ষা দিতে পারেনি। দ্বিতীয়ত, রাজনীতিতে আদর্শের সঙ্গে বাস্তবতার সংযোগ জরুরি। রাজপথের ভাষা যখন নির্বাচনি রাজনীতিতে প্রবেশ করে, তখন কৌশল, আইনি সচেতনতা ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। হাদির উত্থান দেখিয়েছে কীভাবে একটি আন্দোলনের কণ্ঠ জনগণের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা পায়; তার মৃত্যু দেখিয়েছে, সেই কণ্ঠ রক্ষায় কাঠামোগত প্রস্তুতি না থাকলে কী মূল্য দিতে হয়। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক সাহস কখনো একক গুণ নয়- এটি টিকে থাকে সমষ্টিগত দায়িত্ববোধের ওপর। ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে আন্দোলন গড়ে উঠলে ব্যক্তি আক্রান্ত হলে আন্দোলনও বিপন্ন হয়। হাদির জীবন তাই ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মীদের স্মরণ করিয়ে দেয়: নৈতিকতা ও সাহসের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান গড়াই দীর্ঘমেয়াদে রাজনীতির সবচেয়ে কঠিন, কিন্তু সবচেয়ে জরুরি কাজ। জুলাইয়ের চেতনা যদি সত্যিই গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার সূচনা হয়ে থাকে, তবে সেই অভিযাত্রার গন্তব্য হিসেবে নির্বাচন অনিবার্য। রাজপথের অভ্যুত্থান ক্ষমতার বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে, কিন্তু সেই বৈধতাকে পুনর্গঠনের একমাত্র সাংবিধানিক পথ হলো জনগণের রায়ে নির্বাচিত সরকার। ইতিহাস দেখিয়েছে, অনির্দিষ্টকালীন অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা বা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কখনোই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে না; বরং তা নতুন ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরি করে, যেগুলো আবার জবাবদিহির বাইরে চলে যায়। জুলাইয়ের শিক্ষা তাই স্পষ্ট পরিবর্তনের নৈতিক দাবি টিকে থাকে তখনই, যখন তা নির্বাচনের মাধ্যমে জনসমর্থনে রূপ নেয়। নির্বাচন কোনো দল বা গোষ্ঠীর অনুকম্পা নয়; এটি নাগরিকের অধিকার এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এই বাস্তবতা অস্বীকার করলে জুলাইয়ের চেতনা বিপ্লবী আবেগে আটকে যাবে, গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় পৌঁছাতে পারবে না। ওসমান হাদির মৃত্যুর পর যে বিষয়টি বিশেষভাবে চোখে পড়েছে, তা হলো রাজনৈতিক বিভাজনের উর্ধ্বে উঠে সর্বদলীয় ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর শোকপ্রকাশ। আদর্শগত ভিন্নতা সত্ত্বেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন এবং সাংস্কৃতিক পরিসরের প্রতিনিধিরা তার মৃত্যুতে প্রকাশ্য সমবেদনা জানিয়েছেন। এই প্রতিক্রিয়া কোনো আনুষ্ঠানিকতা মাত্র নয়, বরং এটি জুলাইয়ের চেতনার একটি বাস্তব প্রতিফলন— যেখানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষও সহিংস মৃত্যুকে ন্যায়সঙ্গত বা স্বাভাবিক বলে মেনে নেয় না। শোকসভা, বিবৃতি ও সাংস্কৃতিক শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে একটি স্পষ্ট বার্তা উঠে এসেছে, মতের লড়াই হতে পারে, কিন্তু হত্যার মাধ্যমে রাজনীতি চালানো গ্রহণযোগ্য নয়। এই সর্বদলীয় শোকপ্রকাশ সাধারণ মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করেছে, কারণ এটি দেখিয়েছে যে বিভক্ত রাজনীতির মধ্যেও একটি ন্যূনতম নৈতিক ঐক্য এখনো বিদ্যমান। জুলাইয়ের অভ্যুত্থান যদি কোনো শিক্ষা দিয়ে থাকে, তবে সেটি হলো— রাজনৈতিক পরিবর্তনের ভাষা হতে হবে মানবিক এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে অবস্থান হতে হবে সম্মিলিত। শরিফ ওসমান হাদির সমাধিস্থল কেবল একটি কবরের অবস্থান নয়- এটি একটি প্রতীক। বিদ্রোহী কবির পাশে এক বিপ্লবীর শায়িত হওয়া যেন ইতিহাসেরই একটি নীরব স্বীকৃতি। কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহ যেমন ভাষা ও চেতনায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, হাদির রাজনীতি তেমনি বাস্তব ক্ষমতার কাঠামোর সামনে ন্যায়বিচারের দাবি তুলে ধরেছিল। তার জানাজায় শত সহস্র মানুষের উপস্থিতি কোনো সংগঠিত প্রদর্শনী নয়, বরং স্বতঃস্ফূর্ত শোক ও সম্মানের বহিঃপ্রকাশ। এই জনসমাগম প্রমাণ করে, তিনি কেবল একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের মুখ ছিলেন না তিনি সাধারণ মানুষের আশা, ক্ষোভ ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করতেন। ইতিহাস অনেককে ভুলে যায়, কিন্তু যাদের বিদায়েও মানুষ রাজপথে নেমে আসে, তাদের নাম কেবল সমাধিফলকে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিদ্রোহীর পাশে বিপ্লবীর ঘুমিয়ে পড়া তাই যথার্থ— কারণ দুজনেই নিজেদের সময়ের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন এবং সেই কথাই শেষ পর্যন্ত মানুষ মনে রাখে। লেখক: সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠক। সাবেক তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপি
|
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
