ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
সোমবার ২৯ জুন ২০২৬ ১৫ আষাঢ় ১৪৩৩
৮ হাজার কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেন: দুদকের জালে ইবিএলের শওকত আলীর পরিবার
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Tuesday, 16 September, 2025, 9:26 PM

৮ হাজার কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেন: দুদকের জালে ইবিএলের শওকত আলীর পরিবার

৮ হাজার কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেন: দুদকের জালে ইবিএলের শওকত আলীর পরিবার

ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের (ইবিএল) চেয়ারম্যান মো. শওকত আলী চৌধুরী ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে বিপুল অঙ্কের সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে শওকত আলী ও তার পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন শেল কোম্পানি ও ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে প্রায় ৮ হাজার ৪০৭ কোটি টাকার লেনদেন করেছেন, যার অধিকাংশই বিদেশে পাচারের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে বলে ধারণা করছে তদন্ত সংস্থাটি।

দুদকের মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ বিভাগ এই অনুসন্ধান পরিচালনা করছে। সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর দুদক প্রধান কার্যালয়ে কমিশনারদের বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই অনুসন্ধান অনুমোদন দেওয়া হয়।

আইনজীবী কামরুল ইসলাম ২০২৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর এবং ৮ অক্টোবর দুদকে দুটি পৃথক চিঠি পাঠিয়ে অভিযোগ করেন যে, ইবিএল চেয়ারম্যান মো. শওকত আলী চৌধুরী তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে জাহাজ ভাঙা ব্যবসা ও শিপিং ট্রেডিংয়ের আড়ালে বিদেশে অর্থ পাচার করেছেন। অভিযোগে বলা হয়, তারা ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস, দুবাই, সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাজ্যে একাধিক শেল কোম্পানি গঠন করে অর্থ স্থানান্তর করেছেন।

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে শওকত আলী, তার স্ত্রী তাসমিয়া আমবারিন, মেয়ে জারা নামরিন, ও ছেলে জারান শওকত আলী চৌধুরী—এই চারজন দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে ১৮৭টি হিসাব পরিচালনা করেছেন। এসব হিসাবের মাধ্যমে ৮,৪০৭ কোটি টাকা জমা ও ৮,২৪৭ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, শওকত আলী ইবিএলে ১৫ শতাংশ শেয়ারধারী, যা ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১০ শতাংশ সীমা অতিক্রম করে। এই অতিরিক্ত ৫ শতাংশ শেয়ার তিনি নিজের নামে নয়, বরং শেল কোম্পানির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করছেন।

দুদক সূত্র জানিয়েছে, এই শেয়ারগুলোর মালিকানা যাচাই করতে বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএফআইইউ যৌথভাবে তদন্ত করছে।

তদন্তে জানা গেছে, অভিযোগ দাখিলের পরপরই শওকত আলী ও তার পরিবারের সদস্যরা বিদেশে তাদের কিছু সম্পদ বিক্রির চেষ্টা শুরু করেন। এর মধ্যে দুবাইয়ের লানসি আইল্যান্ডে ৩০০ কোটি টাকার বিলাসবহুল ভিলা বিক্রির প্রচেষ্টা ছিল সবচেয়ে আলোচিত। দুদক মনে করছে, এটি ছিল অর্থ পাচারের প্রমাণ গোপন করার কৌশল।

শওকত আলীর মালিকানাধীন এসএন করপোরেশন লিমিটেড নামে একটি শিপিং কোম্পানির বিদেশি লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) বিশ্লেষণে বেশ কিছু অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। বেশ কয়েকটি এলসি ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে নিবন্ধিত শেল কোম্পানির নামে খোলা হয়, যেগুলোর ঠিকানা ও নিবন্ধন তথ্য প্রায় এক। এই দ্বীপ রাষ্ট্রটি আন্তর্জাতিকভাবে অর্থ পাচারের ‘হটস্পট’ হিসেবে পরিচিত।

বিএফআইইউ-এর খসড়া প্রতিবেদনে বলা হয়, শওকত আলীর ঢাকা ব্যাংকের এক ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে গত ১৩ বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। একই সময়ে ইবিএলের কোম্পানি সচিব তার নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে ১২৫ বার নগদ অর্থ উত্তোলন করেছেন, যার অনেকগুলোর কোনো ব্যবসায়িক যৌক্তিকতা নেই।
অন্যদিকে, তার ছেলে জারান শওকত আলী চৌধুরী, যিনি নিজেকে “বেকার” হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন, তার নামে থাকা অ্যাকাউন্ট থেকে কোটি কোটি টাকা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ ও বিদেশে স্থানান্তরের তথ্য পাওয়া গেছে।

মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জুলাই শওকত আলী ও তার পরিবারের সব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। বর্তমানে দুদক এই অভিযোগের ভিত্তিতে প্রাথমিক অনুসন্ধান চালাচ্ছে, এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহের জন্য ব্যাংকগুলোকে নোটিশ পাঠানো হয়েছে।

দুদকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, তদন্তে প্রাথমিকভাবে দেখা গেছে, তাদের কিছু লেনদেন আন্তর্জাতিক অর্থপাচারের মানদণ্ড অনুযায়ী সন্দেহজনক। বিস্তারিত যাচাই-বাছাইয়ের পর আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করা হবে।

বিষয়টি নিয়ে শওকত আলী চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে ইবিএলের এক মুখপাত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের আর্থিক বিষয়গুলো স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে সম্পন্ন হয়। ব্যক্তিগত লেনদেনের দায় ব্যাংকের নয়।

অর্থনীতি ও দুর্নীতিবিরোধী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘটনায় ব্যাংকিং খাতের ওপর নতুন করে প্রশ্ন উঠবে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ড. হুমায়ুন কবির বলেন, একজন ব্যাংক চেয়ারম্যানের পরিবারের বিরুদ্ধে এমন বিশাল অঙ্কের মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ ব্যাংক খাতের সুশাসনের জন্য বিপজ্জনক সংকেত। এটি শুধু দুদকের নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির সঙ্গেও সম্পর্কিত।

তিনি আরও বলেন, দুদক যদি সঠিকভাবে এই তদন্ত শেষ করে, তবে এটি হবে একটি নজিরবিহীন পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে ব্যাংক পরিচালক ও বড় করপোরেট গ্রুপগুলোর জবাবদিহিতা আরও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status