|
ইডেন মহিলা কলেজ: দেড় শতাব্দীর ইতিহাস, রূপান্তর ও নারী জাগরণের গল্প
আলিফা আরা মীম, ইডেন মহিলা কলেজ প্রতিনিধি
|
![]() ইডেন মহিলা কলেজ: দেড় শতাব্দীর ইতিহাস, রূপান্তর ও নারী জাগরণের গল্প নারী শিক্ষার প্রসারের উদ্যোগ থেকেই ১৮৭৩ সালে 'শুভস্বাধিনী সেবা' নামক সংঘের নারীহিত চিন্তা থেকে স্বল্পসংখ্যক বিদ্যার্থী নিয়ে ঢাকার ফরাশগঞ্জে যাত্রা শুরু হয় একটি ক্ষুদ্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের। শিক্ষাহিতৈষী Miss Mary Corpenter সেই গৃহ-বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করে, একটি স্কুল স্থাপনের পক্ষে রিপোর্ট প্রকাশ করেন। ব্রাহ্ম সমাজের প্রতিনিধি শ্রী নবকান্ত আনন্দ মোহন দাসের প্রতিষ্ঠিত বালিকা বিদ্যালয় একত্রিত হয়ে পরবর্তীতে 'ঢাকা ফিমেল' স্কুল নামে আত্মপ্রকাশ করে। ১৮৭৮ সালে তৎকালীন গভর্নর স্যার অ্যাশলে ইডেনের নামানুসারে প্রতিষ্ঠানটির নতুন নামকরণ করা হয় ইডেন গার্লস স্কুল। ১৮৭৮ সালে সেপ্টেম্বর মাসে ‘ইডেন গার্লস স্কুল’ সরকারি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়। ১৮৯৬-৯৭ সালে এর ছাত্রী সংখ্যা ছিল মাত্র ১৩০ জন। ১৯০৭-১৯১২ সনের রিপোর্ট অনুযায়ী Province of Easter Bengal and Assam Gi এর মধ্যে ইডেন স্কুলকে Excellent High School হিসেবে অভিহিত করা হয়। তখন স্কুলের কার্যক্রম পরিচালিত হতো লক্ষীবাজারের একটি বাসায়। ১৮৯৭ সালে ভায়াবহ ভূমিকম্পে বাসাটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রথমে উকিল শ্রী ঈশ্বরচন্দ্রের বাসায় ও পরে সদরঘাটে পর্তুগিজ কুঠি বাড়িতে এটি স্থানান্তরিত হয়। সে সময়ে স্কুলটি ইন্টারমিডিয়েট শ্রেণিতে উন্নীত করা হয় এবং ইডেন গার্লস হাই স্কুল অ্যান্ড ইন্টারমিডিয়েট কলেজ নামে নামকরণ করা হয়। ১৯৪৫ সালে পুনর্বার স্কুলটি স্থানান্তরিত হয় আবদুল গণি রোডের বর্তমান সচিবালয়ে। সচিবালয়ের নাম আজো ইডেন বিল্ডিং। ১৯৪৭ সালে স্কুলটি কার্জন হলে কিছুদিন রেখে তারপর কামরুন্নেসা স্কুল টিকাটুলীতে অবস্থান করে। ১৯৪৮ সালে ইডেন স্কুল ও কলেজের শাখাসমূহ ও কামরুন্নেসা স্কুল অ্যান্ড কলেজের শাখা যুক্ত হয়ে ইডেন গার্লস কলেজ রূপে ৭নং বকশীবাজারে অবস্থান নেয়। অবশেষে এ প্রতিষ্ঠান ১৯৬২ সনে আজিমপুরে ১৮ একর জমিতে স্থায়ী ঠিকানা লাভ করে। ইডেন মহিলা কলেজের নারী শিক্ষার্থীরা ছিলেন এক জাগরণী ব্যক্তিত্বের অধিকারী; যারা কিনা সমাজ- সংস্কৃতি-সাহিত্য-রাজনীতির জগতের এক অনন্য ভূমিকা পালন করেন। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, শিক্ষার আন্দোলন ছাড়াও দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে এসেছে ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষার্থীরা। ইডেনের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে সে সকল শিক্ষার্থীদের নাম। তাদের মধ্যে রয়েছেন- প্রতিলতা ওয়াদ্দেদার, নীলা নাগ, কমলা সেন, হেলেনা দত্ত, মতিয়া চৌধুরী, সুফিয়া করিম, মাফরুফা চৌধুরী, খোদেজা খাতুন, ড. সনজিদা খাতুন, ফাহমিদা খাতুন, ফেরদৌসী রহমান, রুশন জামিল, লায়লা হাসান, ফেরদৌসী মজুমদার, রাণী হামিদ, ডলি জহুর প্রমুখ সহ আরো অনেকেই। যাদের সাথে ইডেনের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। বর্তমানে ইডেন মহিলা কলেজে প্রায় ২৪ হাজার শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়াশোনা করছেন। ইডেন কলেজ মোট ৪টি অনুষদে বিভক্ত আছে। কলা অনুষদ, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, বিজ্ঞান অনুষদ এবং ব্যবসায় প্রসাশন অনুষদ। ইডেন মহিলা কলেজ মোট বিভাগ রয়েছে ২৩ টি। তার মধ্যে:- কলা অনুষদে রয়েছে ৬টি ; সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে ৪টি; বিজ্ঞান অনুষদে ৯টি এবং ব্যবসায় প্রসাশন অনুষদে ৪টি। এ ছাড়াও ইডেন মহিলা কলেজে মোট ৬টি প্রশাসনিক ও একাডেমিক ভবন রয়েছে। এর মধ্যে ১০৩টি শ্রেণিকক্ষ, ২৮টি ল্যাবরেটরি, ১টি গ্রন্থাগার, ১টি অডিটোরিয়াম ও ২টি কম্পিউটার ল্যাব। ইডেন মহিলা কলেজে ছাত্রীনিবাস রয়েছে মোট ৬টি। তার মধ্যে: ১. হযরত খোদেজা খাতুন ছাত্রীনিবাস ২. জেবুন্নেছা ছাত্রীনিবাস ৩.হাসনা বেগম ছাত্রীনিবাস ৪.রাজিয়া বেগম ছাত্রীনিবাস ৫. হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ) ছাত্রীনিবাস ৬. হযরত রাবেয়া বসরী (রহ.) ছাত্রীনিবাস (এটি বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব ছাত্রীনিবাস নামকে পরিবর্তন করে রাখা হয়। জুলাই বিপ্লবের পর ২০২৪ এর আগস্টে কিছু শিক্ষার্থীরা প্রথমে এটিকে প্রীতিলতা ছাত্রীনিবাস নাম দিয়ে থাকলেও পরবর্তীতে ভিন্নমত থাকায় হযরত রাবেয়া বসরী নামটি চূড়ান্ত করা হয়। বর্তমানে এই ছাত্রীনিবাসের গেট নতুন নামানুসারে নির্মাণের কাজ চলছে।) ইডেন মহিলা কলেজের প্রতিটি ছাত্রীনিবাসে রয়েছে তাদের নিজস্ব ক্যান্টিন, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় শাক-সবজি, ফলমূল, অন্যান্য সামগ্রী থেকে শুরু করে তিন বেলার খাবার পর্যন্ত পেয়ে থাকেন। তবে খাবারের মানকে ঘিরে রয়েছে নানা মতভেদ ও অভিযোগ। কিছু হলের খাবারে পোকামাকড় ও পঁচা-বাসি খাবার বিক্রির তথ্য এসেছে। রান্নাঘরের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন। সবুজ প্রাণবন্ত এই ক্যাম্পাটি বর্তমানে তাদের একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অধীনে। ১৯৯২ সালে যখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয় তখন ইডেন মহিলা কলেজকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৯২ সাল থেকে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত এটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ছিলো। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ নির্দেশনায় তড়িঘড়ি করে ২০১৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সরকারি ৭টি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়। তার মধ্যে ইডেন মহিলা কলেজ ও একটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্তির পর নানা অনিয়ম, প্রসাশনিক জটিলতার জন্য শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দাবি নিয়ে রাজপথে উপস্থিত হন। দীর্ঘ সংগ্রামের ফলে ২০২৫ সালের ২৭শে জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জরুরি সভায় সাত কলেজের অধিভুক্তি বাতিলের চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনের ফলে ২০২৫ সালের ১৮ই নভেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয় যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তি বাতিল করে সাত কলেজকে একীভূত করে 'ঢাকা সেন্ট্রাল বিশ্ববিদ্যালয়' নামে একটি নতুন স্বতন্ত্র পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। পরবর্তীতে আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে ২০২৬ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতির বিশেষ অধ্যাদেশের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের ৫৭তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এটি বাংলাদেশের ৫ম স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। সময়ের পালাবদলে সবকিছুর পরিবর্তন হয়েছে, তবে নারী শিক্ষার্থীর প্রাচীন বিদ্যাপীঠ ইডেন মহিলা কলেজ আজোও তার ঐশ্বর্য্য, রুপ, ঐতিহ্য ও মানের উপর দন্ডয়মান আছে।
|
| « পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ » |
কুকসুর গঠনতন্ত্র অনুমোদন ও দ্রুত নির্বাচনের দাবিতে স্মারকলিপি
ভূরুঙ্গামারীতে ব্র্যাকের যৌথ স্বাস্থ্যসেবা ক্যাম্প, বিনা মূল্যে মিলেছে নানা সেবা
জাতীয় যুব দিবসে গণকণ্ঠের আলোচনা ও সম্মাননা স্মারক প্রদান
কালীগঞ্জে এসআরবির সাতক্ষীরা ক্যাম্পের সদস্যদের অভিযানে ১০০ বোতল উইনকেরেক্স সহ দুই মাদক ব্যাবসায়ি আটক
