ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
মঙ্গলবার ৩০ জুন ২০২৬ ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩
আন্দোলন দমনে সক্রিয় ছিলেন ইনু, দিয়েছেন উসকানি: রায়ে ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Tuesday, 30 June, 2026, 8:30 PM

আন্দোলন দমনে সক্রিয় ছিলেন ইনু, দিয়েছেন উসকানি: রায়ে ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ

আন্দোলন দমনে সক্রিয় ছিলেন ইনু, দিয়েছেন উসকানি: রায়ে ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ

জুলাই আন্দোলন দমনে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু শুধু নির্লিপ্ত দর্শক ছিলেন না; বরং ‘বেআইনি দমন-পীড়নে’ সক্রিয় অংশগ্রহণ ও উসকানি দিয়েছিলেন বলে রায়ের পর্যবেক্ষণে তুলে ধরেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

জুলাই অভ্যুত্থান দমন করতে নির্যাতন, ষড়যন্ত্র ও প্ররোচনার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মঙ্গলবার দুপুরে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-২ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে মামলার একমাত্র আসামি ইনুর বিরুদ্ধে আনা আটটি অভিযোগের মধ্যে তিনটিতে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।

এর মধ্যে তিন নম্বর অভিযোগে রাজনৈতিক নিপীড়ন ও নির্যাতনের দায়ে ১০ বছর, ছয় নম্বর অভিযোগে ‘অপরাধের ষড়যন্ত্র ও প্ররোচনার’ দায়ে ১০ বছর এবং এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয় ইনুকে।

এছাড়া সাত নম্বর অভিযোগে অপরাধের ষড়যন্ত্রের দায়ে আরও ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকার অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। তবে অপরাধের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত না হওয়ায় এক, দুই, চার, পাঁচ ও আট নম্বর অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয় তাকে।

ট্রাইব্যুনাল বলেছে, আসামির ওপর আরোপিত সব সাজা যুগপৎ চলতে থাকবে। অর্থাৎ সব মিলিয়ে ইনুকে ১০ বছরই কারাভোগ করতে হবে।

রায়ের পর্যবেক্ষণে জুলাই আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ক্ষয়ক্ষতি তুলে ধরে ট্রাইব্যুনাল বলে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যাতাত্ত্বিক বিষয়ে সরকারি গেজেটে ৮৪৬ জন নিহত এবং ১৩ হাজারের অধিক ব্যক্তি আহত হওয়ার তালিকা রয়েছে। এ স্বল্প সময়ের মধ্যে এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং সহস্রাধিক মানুষের গুরুতর আহত ও অঙ্গহানির মত নৃশংস ঘটনা ঘটেছে। এই নির্মম সত্য ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিষয়ে কোনো দ্বিমত বা বিরোধের অবকাশ নেই।

আসামির অপরাধের ধরন প্রসঙ্গে ট্রাইব্যুনাল পর্যবেক্ষণে বলেছে, সরাসরি ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকলেও অপরাধের পেছনে তার মূল ভূমিকা ছিল ষড়যন্ত্র করা, প্ররোচনা দেওয়া এবং সংঘটনে সহায়তা করা। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ইনুর আড়িপাতা ফোনালাপ, গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্য এবং তৎকালীন ১৪ দলীয় জোটের সিদ্ধান্তসমূহকে এই মামলার প্রধান আইনি ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

ফাঁস হওয়া ফোনালাপের সত্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আদালত বলছে, প্রসিকিউশন আইনগতভাবে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) থেকে এই ফোনালাপের অডিও সংগ্রহ করে সিআইডির ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষার মাধ্যমে এর প্রামাণ্য চেইন অব কাস্টডি অক্ষুণ্ণ রেখেছে। আসামিপক্ষ জেরা করার সময় এর সত্যতাকে চ্যালেঞ্জ না করায় আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে আলামতটি সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য ও প্রমাণিত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ইনুর প্রথম ফোনালাপ বিশ্লেষণ করে ট্রাইব্যুনাল বলেছে, এই কথোপকথন থেকে সুস্পষ্ট যে, হাসানুল হক ইনু কোনো নির্লিপ্ত রাজনৈতিক দর্শক ছিলেন না বরং আন্দোলনকারীদের ওপর সুনির্দিষ্ট কার্যপ্রণালী, কৌশলগত ও সাংগঠনিক বলপ্রয়োগের মাধ্যমে দমন-পীড়ন চালিয়ে তা নস্যাৎ করার বিষয়ে সক্রিয়ভাবে আলোচনা করছিলেন।

ফোনালাপে অভিযুক্ত ব্যক্তি উত্তরা, বাড্ডা, গুলশান ও যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীদের ছবি দেখে তালিকা প্রস্তুত করে রাতের বেলা তুলে নেওয়ার পরামর্শ দেন এবং ঢাকায় অনুরূপ ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেন। সরকারের নেওয়া সহিংস সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত সঠিক বলে অভিহিত করেছিলেন ইনু।

ট্রাইব্যুনাল মনে করে, রাজনৈতিক নেতা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর আসামির জোর দেওয়ার বিষয়টি প্রমাণ করে যে, এটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোনো বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপ ছিল না। বরং মানবতাবিরোধী অপরাধের উদ্দেশ্যে গঠিত একটি পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় সমন্বিত উদ্যোগ।

দ্বিতীয় ফোনালাপের বিষয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, এটি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক আলোচনা ছিল না বরং আসামি সক্রিয়ভাবে গণবিদ্রোহ দমন ও প্রতিপক্ষকে নিষ্ক্রিয় করার কৌশল প্রণয়নে যুক্ত ছিলেন। দেশে কারফিউ জারি, সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন এবং রাষ্ট্রীয় প্রচারণার গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে তার বিস্তারিত জ্ঞান ছিল।

শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনালাপে ইনু চাপটা থাকতেই হবে’ এবং ‘ঘর থেকে বের হলেই গ্রেপ্তার করা হবে বলে কঠোর কারফিউর যে পরামর্শ দেন, তা নিয়ে ট্রাইব্যুনালের মত, “এটি ছিল কঠোরতম উপায়ে জনগণকে জমায়েত হতে বিরত রাখার উসকানি।

ইনু ও তৎকালীন সরকারের মধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনে অভিন্ন অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র বিদ্যমান ছিল মন্তব্য করে আদালত বলেছে, ফোনালাপে ইনু প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, তাদের দলীয় নেটওয়ার্ক প্রস্তুত আছে এবং এক লাখ লোক নিয়ে ঢাকা দখল করবেন। ‘আমাদের নেটওয়ার্ক, আমাদের হোমওয়ার্ক করতে হবে’ জাতীয় শব্দচয়ন প্রমাণ করে যে, তাদের মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা ছিল।

আন্দোলন দমনে মিথ্যা বয়ান ছড়ানোর বিষয়টিকে অত্যন্ত বিপজ্জনক আখ্যা দিয়ে আদালত বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি বারবার আন্দোলনকারীদের জঙ্গি, সাম্প্রদায়িক শক্তি এবং রাষ্ট্রবিরোধী ধ্বংসাত্মক উপাদান হিসেবে আখ্যায়িত করে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নকে জায়েজ করার চেষ্টা করেছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে বলেছিলেন, আমরা এখন এই কার্ডটি খেলব। ট্রাইব্যুনালের মতে, প্রতিপক্ষকে সন্ত্রাসী হিসেবে উপস্থাপন করার এই পরিকল্পিত প্রচারণা মূলত আন্দোলনকারীদের ওপর চরম নৃশংসতা চালানোর ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল।

রায়ের শেষাংশে ট্রাইব্যুনাল বলেছে, এক, দুই, চার, পাঁচ ও আট নম্বর চার্জের অপরাধ সংঘটনে আসামির প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা প্রসিকিউশন সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পারেনি। তবে তিন, ছয় ও সাত নম্বর চার্জে আদালত নিশ্চিত হয়েছেন যে, তিনি কোনো সাধারণ দর্শক ছিলেন না।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন অনুযায়ী, এই রায়ের বিরুদ্ধে এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ পাবেন জাসদ সভাপতি।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status