ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
মঙ্গলবার ৩০ জুন ২০২৬ ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩
জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় অর্থ সংকট, তহবিলেও দুর্নীতির ছায়া
সায়ীদ আবদুল মালিক
প্রকাশ: Tuesday, 30 June, 2026, 2:08 PM

জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় অর্থ সংকট, তহবিলেও দুর্নীতির ছায়া

জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় অর্থ সংকট, তহবিলেও দুর্নীতির ছায়া

বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান ০.৪৮ শতাংশেরও কম। তবু ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্যের কারণে বিশ্বে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। ঘূর্ণিঝড়, দাবদাহ, আকস্মিক বন্যা, নদীভাঙন ও উপকূলীয় লবণাক্ততার মতো দুর্যোগ দেশের অর্থনীতি, কৃষি ও জনজীবনে ক্রমেই বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বছরে প্রায় ১২.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন হলেও আন্তর্জাতিক ও জাতীয় উৎস মিলিয়ে পাওয়া যাচ্ছে চাহিদার মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ।

বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলার লড়াই এখন দ্বিমুখী সংকটে পড়েছে। একদিকে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও উপকূলীয় জনপদ ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়ছে; অন্যদিকে সীমিত জলবায়ু তহবিলের বড় অংশই দুর্নীতি ও অনিয়মে অপচয় হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক জলবায়ু কূটনীতিতে বাংলাদেশের নেতৃত্ব ধরে রাখতে হলে অভ্যন্তরীণ তহবিল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে নতুন ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন ২.৪২ শতাংশে নেমে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বর্ষা ও লবণাক্ততার কারণে আমন, বোরো ও আউশ—তিনটি প্রধান ধান মৌসুমই হুমকির মুখে।

বর্তমানে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রায় ১০ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর কৃষিজমি মাঝারি থেকে তীব্র লবণাক্ততায় আক্রান্ত। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে উপকূলের প্রায় ১৭ শতাংশ এলাকা পানির নিচে চলে যেতে পারে এবং প্রায় দুই কোটি মানুষ জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে বোরো ধানে চিটা হওয়ার হার বাড়ছে। হাওরাঞ্চলে অকাল বন্যা এবং সেচ ব্যয় বৃদ্ধিও কৃষিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ড. জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে একই মৌসুমে কৃষকদের খরা ও বন্যা—উভয় সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত জলবায়ু-সহিষ্ণু ফসলের জাত মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণ জরুরি।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবিতে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন এখনও প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উৎস থেকে বছরে গড়ে মাত্র ৮৬ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার জলবায়ু অর্থায়ন পেয়েছে বাংলাদেশ। আর ২০২৩-২০৫০ মেয়াদের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (ন্যাশনাল অ্যাডাপ্টেশন প্ল্যান) বাস্তবায়নে প্রয়োজন প্রায় ২৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

এমন পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ জলবায়ু তহবিল ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতির চিত্র উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ‘বাংলাদেশে জলবায়ু অর্থায়নে সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০১০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ডের ৮৯১টি প্রকল্পে বরাদ্দকৃত অর্থের ৫৪ শতাংশের বেশি, প্রায় ২ হাজার ১১০ কোটি টাকা, বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অপচয় বা আত্মসাতের শিকার হয়েছে। প্রকল্প অনুমোদন, ঠিকাদার নিয়োগ এবং বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপেও রাজনৈতিক প্রভাব ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠে এসেছে। এছাড়া ৬১ দশমিক ৬ শতাংশ প্রকল্পের মেয়াদ অযৌক্তিকভাবে বাড়ানো হয়েছে, ফলে চার বছরের প্রকল্প শেষ হতে কোথাও কোথাও ১৪ বছর পর্যন্ত সময় লেগেছে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সীমিত সম্পদের মধ্যেও জলবায়ু তহবিলের বড় অংশ রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্বল জবাবদিহির কারণে অপচয় হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তার মতে, ট্রাস্ট ফান্ডকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।

পানি বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের জলবায়ু কূটনীতি শক্তিশালী হলেও মাঠপর্যায়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের গতি সন্তোষজনক নয়। তিনি উপকূলীয় অবকাঠামোকে জলবায়ু-সহিষ্ণু করে গড়ে তোলা এবং বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ বাস্তবায়নে গতি আনার ওপর গুরুত্ব দেন।

অন্যদিকে কৃষিবিজ্ঞানী ড. মো. শাহজাহান কবীর বলেন, লবণাক্ততা ও খরা-সহিষ্ণু ধানের নতুন জাত উদ্ভাবিত হলেও তা দ্রুত কৃষকের কাছে পৌঁছানো প্রয়োজন। অভিযোজন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো না গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে চালের উৎপাদন ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক অর্থায়নের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও কার্যকর প্রকল্প বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যথায় জলবায়ু ঝুঁকির পাশাপাশি অর্থায়নের সংকটও আরও গভীর হবে।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status