|
কেউ একটু হেসে কথা বললেই মনে হয় সে আপনার প্রেমে পড়েছে?
নতুন সময় ডেস্ক
|
![]() কেউ একটু হেসে কথা বললেই মনে হয় সে আপনার প্রেমে পড়েছে? মনোবিজ্ঞানে এই প্রবণতার এক চরম রূপের নাম ‘ইরোটোম্যানিয়া’। এটি এমন এক মানসিক অবস্থা, যেখানে একজন ব্যক্তি বিশ্বাস করতে শুরু করেন—কেউ একজন তার প্রেমে পড়েছে, যদিও বাস্তবে তেমন কোনও সম্পর্ক বা ইঙ্গিত নেই। ‘ও যেভাবে তাকালো…’ রাজধানীর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী প্রায়ই ক্লাস শেষে এক সহপাঠীর সঙ্গে আড্ডা দিতেন। একসঙ্গে নোট শেয়ার, ক্যান্টিনে বসা, পরীক্ষার আগে পড়া বুঝিয়ে দেওয়া—এসব থেকেই তার মনে হতে শুরু করে, মেয়েটি তাকে অন্যদের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। ধীরে ধীরে তিনি ভাবতে শুরু করেন, ‘ও আসলে আমাকে পছন্দ করে, শুধু সরাসরি বলছে না।’ একদিন সাহস করে নিজের অনুভূতির কথা জানান তিনি। কিন্তু সহপাঠী স্পষ্টভাবে বলেন, তিনি তাকে কেবল বন্ধু হিসেবেই দেখেন। সেখানেই থেমে যাওয়ার বদলে ওই শিক্ষার্থী উল্টো বিশ্বাস করতে থাকেন—মেয়েটি হয়তো অস্বস্তি বা সামাজিক চাপে সত্যিটা অস্বীকার করছে। একই ধরনের অভিজ্ঞতা দেখা যায় কর্মক্ষেত্রেও। কোনও সহকর্মী নিয়মিত খোঁজ নিচ্ছেন, কাজের প্রশংসা করছেন বা হেসে কথা বলছেন—এসব আচরণকে কেউ কেউ ব্যক্তিগত আকর্ষণের সংকেত হিসেবে ধরে নিতে শুরু করেন। অথচ অনেক সময় সেটি কেবল সৌজন্য, বন্ধুত্ব বা স্বাভাবিক সামাজিক আচরণ ছাড়া আর কিছুই নয়। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই জায়গাটিই স্বাভাবিক আকর্ষণ আর বিভ্রমের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে। ভদ্রতা বনাম ‘সংকেত’ প্রতিদিনের জীবনে মানুষ অসংখ্য সামাজিক সংকেত আদান-প্রদান করে। কেউ হেসে কথা বলে, কেউ সহানুভূতি দেখায়, কেউ পেশাগত সৌজন্য বজায় রাখে। কিন্তু কিছু মানুষ এসব আচরণকে রোমান্টিক আগ্রহ হিসেবে ব্যাখ্যা করতে শুরু করেন। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, এর পেছনে থাকতে পারে— গভীর একাকিত্ব ; আত্মসম্মানের সংকট; দীর্ঘদিনের আবেগগত বঞ্চনা; কল্পনা ও বাস্তবের সীমারেখা দুর্বল হয়ে যাওয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও জটিল করে তুলেছে। একটি ‘রিঅ্যাক্ট’, স্টোরি দেখা, বা নিয়মিত অনলাইন উপস্থিতিকেও অনেকে ব্যক্তিগত আগ্রহের প্রমাণ হিসেবে ধরে নিতে শুরু করেন। যখন বিশ্বাসটা বাস্তবতাকে ছাড়িয়ে যায় ‘ইরোটোম্যানিয়া’তে আক্রান্ত ব্যক্তি প্রায়ই বিশ্বাস করেন— অপর ব্যক্তি তাকে গোপনে ভালোবাসেন, প্রকাশ্যে সম্পর্ক স্বীকার করতে পারছেন না।; প্রত্যাখ্যান আসলে ‘লুকানোর কৌশল’; বিভিন্ন কাকতালীয় ঘটনাও ভালোবাসার ইঙ্গিত। এই বিভ্রমের কারণে কেউ কেউ বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেন, অনুসরণ করেন, এমনকি আইনি জটিলতাতেও জড়িয়ে পড়েন। বিশ্বজুড়ে তারকাদের অনুসরণ ও হয়রানির বহু ঘটনার পেছনেও এই ধরনের মানসিক অবস্থা কাজ করেছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। মার্কিন গায়ক টেইলর সুইফট, অভিনেত্রী সেলেনা গোমেজ কিংবা বলিউড তারকা শাহরুখ খান—অনেক তারকাই অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ অনুসারীর মুখোমুখি হয়েছেন। ‘ক্রাশ’ আর মানসিক বিভ্রম এক জিনিস না মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একতরফা ভালো লাগা মানবিক। কারও প্রতি আকর্ষণ জন্মানোও স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন বাস্তবতা পরিষ্কার হওয়ার পরও বিশ্বাস বদলায় না। কেউ আপনাকে পছন্দ করতেই পারে। আবার নাও করতে পারে। কিন্তু কেবল সৌজন্য, সহানুভূতি কিংবা পেশাগত আচরণকে প্রেমের প্রমাণ ধরে নেওয়া—সম্পর্ক, কর্মক্ষেত্র এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা—সবকিছুর জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ডিজিটাল যুগে ভুল বোঝাবুঝির নতুন মানচিত্র আগে প্রেমের ইঙ্গিত খোঁজা হতো চিঠিতে, চোখের ভাষায় কিংবা অপেক্ষায়। এখন সেটা হয় ‘সিন’, ‘রিঅ্যাক্ট’, ‘ফলো ব্যাক’ আর অ্যালগরিদমের ভিড়ে। কেউ আপনার পোস্ট নিয়মিত দেখছে মানেই সে প্রেমে পড়েছে—এমন না। আবার কেউ সৌজন্য দেখাচ্ছে মানেই সম্পর্কের সম্ভাবনাও না। সব হাসির ভেতরে প্রেম থাকে না। কখনও কখনও সেটা কেবল সামাজিকতা। আর সেই সীমারেখা বুঝতে পারাটাই মানসিক পরিপক্বতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
