|
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে একদিন
অনাবিল রোদ্দুরপঞ্চম শ্রেণি, নালন্দা উচ্চ বিদ্যালয়
|
![]() মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে একদিন সবাই জানতো দিনটা বিশেষ। কারণ আজ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে যাওয়া হবে। সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে আমাদের স্কুলের হলুদ বাস ছেড়ে দিলো মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উদ্দেশ্যে। দুটো বাস। একটায় পঞ্চম শ্রেণি যাবে, আরেকটা বাসে চতুর্থ শ্রেণি। বাসে আমরা পঞ্চম শ্রেণির সব বন্ধুরা গান গাইতে গাইতে একসময় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে পৌঁছে গেলাম। তার কিছুক্ষণ পরই চতুর্থ শ্রেণি এলো। গ্যালারির ধাপগুলো মাটি থেকে শুরু করে অনেক নিচে চলে গেছে। তার মানে মিলনায়তনটির অবস্থান আসলে মাটির নিচে। পৌঁছানোর পর জাদুঘরের মূল সিঁড়ি দিয়ে উঠেই সামনে দেখতে পেলাম একটি গোল আকৃতির জলাধার যার মাঝখানে আগুনের শিখা জ্বলছে। আমরা সবাই এ শিখাটির চারপাশে গোল হয়ে দাঁড়ালাম। এরপর শুরু হলো সমাবেশ। সমাবেশে আমরা দেশের গান- যেমন ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’, ‘মুক্তির মন্দির’ ইত্যাদি গাইলাম। সব শেষে জাতীয় সঙ্গীত করলাম। তারপর আমরা সিঁড়ি বেয়ে নিচতলায় এসে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের মিলনায়তনে গেলাম। মিলনায়তনটির গ্যালারির ধাপগুলো মাটি থেকে শুরু করে অনেক নিচে চলে গেছে। তার মানে মিলনায়তনটির অবস্থান আসলে মাটির নিচে। সেখানে আমরা যে তথ্যচিত্রটি দেখলাম তাতে রয়েছে মুজিবনগর সরকার কোথায় কীভাবে গঠিত হয়, যৌথবাহিনীর প্রধান কে, শরণার্থী শিবিরের করুণ চিত্র ইত্যাদি। আমরা একে একে গ্যালারিগুলো দেখা শুরু করলাম। গ্যালারি ১-এ রয়েছে ‘আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের সংগ্রাম’। এখানে ব্রিটিশ আমলের মূর্তি, মসলিন কাপড় ও ব্রিটিশ শাসনের বিভিন্ন ইতিহাসের নানা নিদর্শন রয়েছে। পলাশীর যুদ্ধ সম্পর্কে আঁকা ছবি ও বর্ণনা রয়েছে। দেশভাগ হয় ১৯৪৭ সালে, ব্রিটিশরা ভারতীয় উপমহাদেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার সময়। জন্ম নেয় দুই ভূখণ্ডের পাকিস্তান। তারপর ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জনগণ স্বাধীনতা লাভ করে। গ্যালারি ৩-এ রয়েছে ১৯৭১ সালে ব্যবহার করা একটি গাড়ি। তবে গাড়িটি কার সেটা জানা যায়নি। গ্যালারি ২-এ আছে ‘আমাদের অধিকার, আমদের ত্যাগ’, এ গ্যালারিতে তৎকালীন প্রাধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীসহ আরো অনেক ব্যক্তির পোশাক, টুপি ইত্যাদি জিনিস ছিলো যারা মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছেন। এরকম ৩০ লাখ মানুষ প্রাণ দিয়েছেন আমাদের স্বাধীনতা রক্ষা করার জন্য। এ গ্যালারিতে একটি জিপ গাড়িও রয়েছে যা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিরা ব্যবহার করেছে। এ দুটো গ্যালারি দেখার পর আমরা একটি কুইজ অনুষ্ঠানে অংশ নিই। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের মূল সিঁড়ি দিয়ে ওঠার পর বাম দিকে গেলেই একটি ফাঁকা জায়গা আছে। তার উপর একটি যুদ্ধবিমান ঝুলানো রয়েছে। সেই ফাঁকা জায়গাতেই আমরা কুইজ অনুষ্ঠান করেছি। কুইজে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত প্রশ্ন ছিলো। কুইজ শেষে আমরা জাদুঘরের মুক্তমঞ্চে দুপুরের খাবার খাই। গ্যালারি ৩-এ রয়েছে ‘আমাদের যুদ্ধ, আমাদের মিত্র’। এখানে রয়েছে ১৯৭১ সালে ব্যবহার করা একটি গাড়ি। তবে গাড়িটি কার সেটা জানা যায়নি। আরো রয়েছে মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহার করা একটি রেডিও ট্রান্সমিটার যা ব্যবহার করে বিশ্বের বিভিন্ন রেডিও স্টেশনের খবর শুনে উল্লেখযোগ্য খবরগুলো বাছাই করে তা বাংলাদেশ বেতারে প্রচার করা হতো। এছাড়া রয়েছে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর কিছু ছবি। কনসার্ট ফর বাংলাদেশের একটি রেকর্ডও রয়েছে। এ কনসার্ট ১৯৭১ সালে নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত হয়। এখানে অনেক শিল্পীরা বাংলাদেশের জন্য গান গেয়েছিলেন, যেমন জর্জ হ্যারিসন। কিছু শিল্পী বাজিয়েছিলেন বাদ্যযন্ত্র, যেমন রবিশঙ্কর সেতার বাজিয়েছিলেন। এ ভ্রমণটি আমাদের অনেকদিন মনে থাকবে। আমি মনে করি প্রতি বছরই এমন কোনো জায়গায় ভ্রমণ হওয়া উচিত। গ্যালারি ৪-এ রয়েছে ‘আমাদের জয়, আমাদের মূল্যবোধ’। এখানে নৌ-কমান্ডো শাহজাহান সিদ্দিকীর ব্যবহার করা নৌকা রাখা আছে। আছে তার পরিচয়পত্র এবং পোশাক। বিলোনিয়া নামে একটি জায়গার যুদ্ধের প্রস্তুতিমূলক মানচিত্র আছে। ৭.১২ এমএম সেমি-অটোমেটিক রাইফেলসহ আরো নানা ধরনের বন্দুক। প্যারাসুটও বাদ নেই। আছে বঙ্গবন্ধুর পাঞ্জাবি ও কোট। এ ভ্রমণটি আমাদের অনেকদিন মনে থাকবে। আমি মনে করি প্রতি বছরই এমন কোনো জায়গায় ভ্রমণ হওয়া উচিত যেখানে গেলে অনেক কিছু জানতে পারবো, আবার ভালোও লাগবে। বন্ধুরা, তোমরা যারা ঢাকার বাইরে থাকো অথবা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে যাওয়ার সুযোগ করে উঠতে পারছো না তোমারাও কিন্তু লিবারেশন ওয়ার মিউজিয়াম ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অনলাইনে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ঘুরে আসতে পারো আমাদের এ গৌরবময় অধ্যায়ের ইতিহাস জানার জন্য। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
