সম্প্রতি রুমে থাকতে ইডেন কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি তামান্না জেসমিন রিভার টাকা দাবি নিয়ে দুই ছাত্রীকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করার অডিও ফাঁস হয়েছিল। এবার সেই ছাত্রীদের আটকে রেখে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। ইডেন কলেজের একটি সূত্র জানায়, আটকে রাখা অবস্থায় ওই দুই ছাত্রীর কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য হুমকি দিয়েছেন রিভা। আগের ঘটনা অডিও ভাইরাল করার স্বীকারোক্তি চান তিনি। তা না হলে বিবস্ত্র করে ভিডিও ভাইরাল করার হুমকি দেন।
মঙ্গলবার সকালের দিকে সাড়ে ছয় ঘণ্টা মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের পর অবশেষে ‘মিথ্যা স্বীকারোক্তি’ দিতে বাধ্য হন ওই দুই ছাত্রী। ইডেন কলেজের রাজিয়া বেগম ছাত্রীনিবাসের একটি কক্ষে এ নির্যাতন করে স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়। পরে হলের প্রাধ্যক্ষ নারগিস রুমা গিয়ে ওই দুই ছাত্রীকে উদ্ধার করেন। ভুক্তভোগী দুই শিক্ষার্থীর নাম রুপা ও মিথিলা।
বিকেলে ফাঁস হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, কলেজ শাখা ছাত্রলীগের কয়েকজন নেত্রী এবং শিক্ষক ভুক্তভোগী দুই ছাত্রীকে ঘটনা খুলে বলার জন্য নানাভাবে আশ্বস্ত করছেন।
ভিডিওতে একজন ভুক্তভোগীকে বলতে দেখা যায়, ছাত্রলীগ সভাপতি তাঁদের আটকে রেখে ‘এক পায়ে পাড়া দিমু, আরেক পায়ে টাইনা ছিঁড়ে ফেলব’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদ মিথ্যা এই মর্মে স্বীকারোক্তি দিতে বলেন। ওই ঘটনার অডিও রেকর্ড করতে নির্দেশ দিয়েছেন শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি সুমনা মীম—এমন স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করেন। স্বীকারোক্তি না দিলে বিবস্ত্র করে ভিডিও করে ভাইরাল করে দেওয়ার হুমকি দেন রিভা। তখন দুই ছাত্রী রিভার লিখে দেওয়া স্বীকারোক্তি পড়তে বাধ্য হন। সেটি রিভা এবং অন্যরা রেকর্ড করেন।
ভুক্তভোগী ওই ছাত্রী বলেন, রাজনৈতিক নানা কর্মসূচিতে যোগ দিতে বাধ্য করেন রিভা। অসুস্থ থাকলেও ছাড় দেন না তিনি। দীর্ঘদিন ধরেই এই নিপীড়ন চলছিল। কিন্তু সেদিন প্রমাণ রাখার জন্য তিনি অডিও রেকর্ড করেন। ছাত্রলীগের সহসভাপতি সুমনা মীম তাঁকে কখনো এ ব্যাপারে নির্দেশনা বা পরামর্শ দেননি।
ইডেন কলেজের একটি সূত্র জানায়, রিভার রুম থেকেই মেয়েদের উদ্ধার করে নিয়ে যান অধ্যক্ষ ও প্রাধ্যক্ষ। সেখানে নিয়েও তাদের শাসানো হয়। রিভা সেখানে গিয়ে তাদের রাতের মধ্যে হল থেকে বের করে দেওয়ার জন্য অধ্যক্ষকে বলেন।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের আটকে রাখার বর্ণনার কিছু ভিডিও ক্লিপ আমাদের হাতে এসেছে। সেখানে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘আজকে সকাল ১১টা থেকে সাড়ে ৫টা পর্যন্ত আমাকে রিভা আপুর রুমে রাখছে। রাইখা আমারে এটা বলছে, মানে অনেক হুমকি দিছে, অনেক গালাগালি করছে, যাতে এটা (অডিও ফাঁস) কে করাইছে আমি বলি। কিন্তু আমি তো বলি নাই। কিন্তু (ছাত্রলীগ নেত্রী সুমনা মিম) মিম আপু কোনোদিন আমাদের বলেও নাই রেকর্ডের কথা। মিম আপু আমারে কোনো দিন বলে নাই যে এগুলো রেকর্ড করে আনবা। কিন্তু আমি বাধ্য হয়েই ওইদিন রেকর্ড করেছিলাম। কারণ প্রতিদিন প্রোগ্রামে যাওয়ার জন্য উনি অনেক ইয়ে করতো। অসুস্থ থাকলেও প্রোগ্রামে যাওয়ার জন্য অনেক ধরনের কথা বলত। ওইদিন আমি গেছি, তারপর রেকর্ড কইরা আনছি যাতে আবার যদি নেক্সটে কিছু হয় তাহলে আমি এগুলা বলতে পারি, ম্যামদের জানাইতে পারি। তারপর আজকে আমাকে বলছে যে, তুই কীভাবে ইডেন কলেজ থেকে পাস করে বের হস আমি দেখমু। যদি স্বীকার করোস যে সুমনা মিম তোদের দিয়া এগুলা করাইছে তাহলে তোদের ছেড়ে দেবো। তারপর আমি স্বীকার করতে চাই নাই, কারণ আমি মিম আপু আমারে বা আমাদের কাউকেই কোনো দিন বলে নাই যে রেকর্ড করবি। তারপরে আমাকে হুমকি দিছে আর একটা কাগজে লিখে দিছিলো, সেটা আমি পড়েছি রেকর্ড করছে ওনারা। আমি ওই লেখাটা পড়ার পরেই ওনারা রেকর্ড করছে। আর ওটা রেকর্ড করে পরে বলছে যে, তোদের উলঙ্গ করে ভিডিও করে ভাইরাল করে দেবো। তাই আমি ভয়ে মিম আপুর বিরুদ্ধে মিথ্যা কথা বলতে বাধ্য হয়েছি। মিম আপু এগুলা করায় নাই বা আমাদের কোনোদিন বলেও নাই।’
বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ঘটনার সত্যতা জানতে চাইলে তখন তা নিশ্চিত করেন রাজিয়া বেগম হলের প্রাধ্যক্ষ নার্গিস রুমা। তিনি বলেন, আমরা এসেছি। ঘটনার তদন্ত করবো। পরে তাকে একাধিকবার কল দিলেও আর সাড়া পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে ইডেন কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক সুপ্রিয়া সাহাকে ফোন দিলেও তার কোনো সাড়া মেলেনি।
অভিযোগের বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর তামান্না জেসমিন রিভা বিভিন্ন গনমাধ্যমে ফোন দিয়ে উল্লিখিত সময়ে ঘটনাস্থলেই তার না থাকার দাবি করেন। তিনি বলেন, একটা মহল আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে নিউজ করাতে চাইছে। আমি কাকে নাকি নির্যাতন করেছি এমন বর্ণনা নিয়ে তারা এটা করাতে চাইছে। আমি সকাল থেকে ক্যাম্পাসের নিচে আমাদের প্রোগ্রাম নিয়ে সবাইর সঙ্গে ছিলাম। সন্ধ্যার পরে পার্টি অফিসে গেছি।
অভিযোগকারী শিক্ষার্থীর বর্ণনার ভিডিও ক্লিপ হাতে আসার পর তামান্না জেসমিন রিভাকে একাধিকবার কল ও এসএমএস পাঠালেও তার সাড়া মেলেনি।