সীমান্তে সতর্কবার্তা, পালাতে পারবেন না সেলিম চেয়ারম্যান
সেলিম খান। একসময় চাঁদপুর থেকে কর্মের সন্ধানে আসেন ঢাকায়। প্রথম দিকে করতেন হকারি। কিছুদিন চালিয়েছেন রিকশা। এরপর ফিরে যান নিজ এলাকায়। গত এক যুগে চাঁদপুরের বিভিন্ন নদী ড্রেজিং ও বালুমহালের ব্যবসার মাধ্যমে রাতারাতি হাজার কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। হয়েছেন চাঁদপুরের লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান।
পদ্মা ও মেঘনা নদী থেকে বালু উত্তোলন এবং প্রতারণার মাধ্যমে প্রায় ৩৭ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সেলিম খানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন।
সোমবার দুপুরে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এ মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। মামলার বাদী অনুসন্ধান কর্মকর্তা দুদকের প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আতাউর রহমান।
দুদক বলছে, তদন্ত কর্মকর্তা প্রয়োজন মনে করলে শুধু গ্রেপ্তার কেন, যেকোনো বিধি প্রয়োগ করতে পারেন। এখন প্রশ্ন উঠেছে তাহলে কী গ্রেপ্তার হচ্ছেন আলোচিত এই চেয়ারম্যান?
এদিকে গেল কয়েকদিন ধরে গা ঢাকা দিয়ে আছেন ‘বালুখেকো’ খ্যাত চেয়ারম্যান সেলিম খান। নিজের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনও বন্ধ রেখেছেন। রবিবার দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শেষে মামলার কথা জানালে তাকে আর প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে না। অন্যদিকে তার ওপর গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রেখেছে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা। প্রতিনিয়ত সেলিমের পরিবারের ওপরও নজরদারি করা হচ্ছে। তিনি যাতে কোনোভাবে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে না পারেন, সে ব্যাপারে সীমান্তে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
মামলার এজাহারে বলা হয়, দুদকের অনুসন্ধানে সেলিম খানের নামে ৩৬ কোটি ৯৩ লাখ ৬০ হাজার টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাটসহ সম্পদের দালিলিক মূল্য অনুযায়ী মোট সম্পদের হিসাব করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তিনি সম্পদের দাম কম উল্লেখ করে দলিল রেজিস্ট্রি করেছেন। প্রকৃত ও বাজারমূল্য অনুযায়ী তার নামের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মোট মূল্য শতকোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
দুদক বলছে, চাঁদপুরের একাধিক নদীতে শতাধিক ড্রেজিং মেশিন দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করতেন সেলিম খান। এতে সরকারকে দেননি রাজস্ব, নেননি অনুমতি। গত প্রায় একযুগে শুধু বালু উত্তোলন করেই আয় করেছেন তিন হাজার কোটি টাকা। তাছাড়া স্থানীয়দের জমি দখল, চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি অধিগ্রহণে জালিয়াতি, সরকারের পক্ষ থেকে ভূমিহীন ও গৃহহীনদের ঘর দেওয়া বাবদ অর্থ নিয়েছেন। অবৈধ উপায়ে গড়েছেন বিপুল অর্থ-সম্পদ।
স্থানীয়রা বলছেন, একসময় সেলিমের পারিবারিক অবস্থা তেমন স্বচ্ছল ছিল না। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগে জেলা বিএনপির প্রভাবশালীদের সঙ্গে ওঠাবসা করতেন। তার আগে সেলিম জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। চাঁদপুরের সদর উপজেলার ১০নং লক্ষীপুর মডেল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সেলিম খানকে সবাই চেনেন ‘বালুখেকো সেলিম’ নামে।
সেলিম খান প্রথম আলোচনায় আসেন ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের সময়। ওই অভিযানে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের সঙ্গে ক্যাসিনো ব্যবসায় তার সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি সামনে আসে। এছাড়া ক্যাসিনোকাণ্ডে জড়িতদের তালিকাতেও উঠে আসে তার নাম।
২০১৯ সালে গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে চাঁদপুরে অভিযান চালায় দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম। সেখানে গৃহহীনদের কাছ থেকে প্রতিটি ঘর বরাদ্দ বাবদ ২০ হাজার টাকা করে ঘুষ নেয়ার প্রাথমিক সত্যতা পায় দুদক। সে বছরের ৩১ অক্টোবর কমিশন সেলিম খানের অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সেলিম খান, তার স্ত্রী শাহানা বেগম ও তাদের ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের সম্পদ বিবরণী দাখিল করার নির্দেশ দেয় দুদক। ওই তলবের প্রেক্ষিতে সেলিম খান দুদকে যে সম্পদ বিবরণী দাখিল করেন সেখানে তার মোট আয় দেখানো হয় ৬২ লাখ টাকা।
এদিকে গত ২৬ এপ্রিল দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক কে এম ইমরুল কায়েস সেলিম খানকে ৬০ দিনের জন্য বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। পরে পুনরায় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সময় বর্ধিত করা হয়েছে। বিভিন্ন অপরাধের কারণে চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগ তাকে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ থেকে আজীবনের জন্য বহিস্কার করে। যেকোনো সময় হারাতে পারেন চেয়ারম্যান পদটি।
আদালতের নির্দেশে গেল এপ্রিল থেকে চাঁদপুর নৌ-সীমানার পদ্মা ও মেঘনা নদীর ৭০ কিলোমিটার বা ৪৩ মাইল দীর্ঘ নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ হয়। তার আগ পর্যন্ত নদী থেকে অবৈধভাবে বালুখেকো সেলিম খান ৩০ কোটি ৪৮ লাখ ঘনফুটের বেশি বালু উত্তোলন করে নেন।
সূত্র বলছে, চাঁদপুরের বিভিন্ন নদীতে সেলিম খান শতাধিক ড্রেজিং মেশিন পরিচালনা করতেন। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকে তিনি নিজ ক্ষমতায় অনেকটা বৈধ করে তোলেন। বালু উত্তোলনে দেননি রাজস্ব, নেননি অনুমতি। গত ১০ বছরে শুধু বালু উত্তোলন করে তিনি আয় করেছেন তিন হাজার কোটি টাকা। আর পরিবেশ অধিদপ্তর ও মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তারা বলছেন, যেভাবে বালু উত্তোলন করা হয়েছে, তাতে চাঁদপুর শহর রক্ষা বাঁধের কয়েকটি স্থান দেবে গেছে। ভেঙে পড়ছে নদীর তীরও। তাছাড়া জাতীয় মাছ ইলিশের প্রজনন ব্যাপকভাবে ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
সেলিমের স্ত্রীর সম্পদের বিষয়ে দুদুকের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে সেলিমের সম্পদের অনুসন্ধান হয়েছে। অনুসন্ধান পরবর্তীতে অন্য কেউ যদি জড়িত থাকে তাদের নামও মামলায় আসবে।’
সেলিমের অবস্থান জানতে তার ছেলে চিত্রনায়ক শান্ত খান ফোন করা হলে তিনি এসব বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বলেন, ‘আমি এসব বিষয়ে কথা বলতে চাচ্ছি না। আমি সিনেমার মানুষ, সিনেমা নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে করতে পারেন।’
সেলিম খানের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে কল করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
দুদকের অনুসন্ধানে সেলিম খানের নামে পাওয়া সম্পদের মধ্যে স্থাবর সম্পদ ২৯ কোটি ৩৮ লাখ ৪১ হাজার টাকার। অস্থাবর সম্পদ ১ কোটি ২৮ লাখ ৩৬ হাজার টাকার। ৯টি চলচ্চিত্র নির্মাণে বিনিয়োগ করা হয়েছে ৬ কোটি ২৬ লাখ ৮২ হাজার টাকা। তার নামে একাধিক বহুতল বাড়ি, একাধিক গাড়ি, বিপুল পরিমাণ জমি, ফ্ল্যাট, আগ্নেয়াস্ত্র, স্বর্ণালংকার, ব্যাংকে জমানো বিপুল টাকার তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। তার সম্পদের মধ্যে রয়েছে- চাঁদপুর, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জে প্রায় ৪০টি দলিলে বিপুল পরিমাণ জমি, রাজধানীর কাকরাইলে সাততলা ভবন, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার ভূঁইগড় এলাকায় দশতলা ভবন, কাকরাইলের আজমিন টাওয়ারে চারটি ফ্ল্যাট, কাকরাইলের আরেকটি ভবনে ফ্ল্যাট। এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তার নামে ফ্ল্যাট রয়েছে।
সূত্র জানায়, চাঁদপুর সদরে তিনি একটি বাড়ি কিনেছেন ৫ কোটি টাকায়। লক্ষ্মীপুর মৌজায় প্রায় এক বিঘা জমিতে সিনেবাজ ফিল্মসিটি নামে দুইতলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এখানে সুইমিংপুলও করা হয়েছে। এতে খরচ হয়েছে ৩-৪ কোটি টাকা। চাঁদপুরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বাসভবনের সঙ্গে প্রায় দুই বিঘা জমিতে সিনেবাজ ফিল্মসিটি মার্কেট করা হয়েছে। রাজধানীর কাকরাইলের করিম ম্যানশনে তার শাপলা মিডিয়া হাউসের মাধ্যমে তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন।