প্রতি কিলোমিটার রাস্তার চেয়ে ৬০ লাখ টাকা খরচ বেশি ড্রেন নির্মাণে
নতুন সময় প্রতিনিধি
প্রকাশ: Wednesday, 23 September, 2020, 2:46 PM
প্রতি কিলোমিটার রাস্তার চেয়ে ৬০ লাখ টাকা খরচ বেশি ড্রেন নির্মাণে
উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর খরচ সমীক্ষা ছাড়াই প্রাক্কলন করা হচ্ছে, যার কারণে ব্যয়ের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পৌরসভার প্রতি কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ খরচের চেয়ে রাস্তার ড্রেন নির্মাণ খরচ অনেক বেশি। এক কিলোমিটার রাস্তা করতে বরগুনার পৌরগুলোতে ৯০ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। আর রাস্তার পাশে ড্রেন নির্মাণে খরচ কিলোমিটারে দেড় কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে।
ঢাকা শহরে সমাপ্ত একটি প্রকল্পে ড্রেন নির্মাণে গড় ব্যয় কিলোমিটারে ৫২ লাখ টাকা। অন্য দিকে প্রকল্পের টাকায় রোলার কিনে সেই রোলার দিয়ে রাস্তার কাজ করবে ঠিকাদার, যাতে আপত্তি তুলেছে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ।
স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, বরগুনা জেলার চারটি পৌরসভার অবকাঠামো নির্মাণ করার জন্য ১২০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে। বরগুনা, আমতলি, পাথরঘাটা ও বেতাগী এই চারটি পৌরসভা। অনুমোদনের পর তিন বছর দুই মাস লাগবে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে। প্রকল্পের আওতায় কাজগুলো হলো, ৩৫ কিলামিটার সড়ক নির্মাণ (বিসি), ১৮ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ (আরসিসি)।
২৪ মিটার কালভার্ট নির্মাণ, ১৮ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণ, চারটি কবরস্থান উন্নয়ন, তিনটি শ্মাশনঘাট উন্নয়ন, পাঁচটি লেক উন্নয়ন, সড়ক বাতি স্থাপন, একটি স্মৃতি কমপ্লেক্স উন্নয়ন।
প্রকল্পের ব্যয় বিভাজনে দেখা যায়, ৩৫ কিলামিটার সড়ক নির্মাণ (বিসি) করতে খরচ ধরা হয়েছে ৩১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এখানে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হচ্ছে ৯০ লাখ টাকা। আর ১৮ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ (আরসিসি) করতে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এখানে কিলোমিটারে ব্যয় হবে এক কোটি ৩০ লাখ টাকা। ১৮ কিলোমিটার রাস্তার সাথে ড্রেন নির্মাণ করতে ব্যয় হবে ২৭ কোটি টাকা।
এখানে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হচ্ছে এক কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা বিটুমিন রাস্তার চেয়ে ৬০ লাখ টাকা এবং আরসিসি রাস্তার চেয়ে ২০ লাখ টাকা খরচ বেশি হচ্ছে ড্রেন নির্মাণে। চারটি কবরস্থান উন্নয়নে দুই কোটি ৮০ লাখ টাকা, তিনটি শ্মাশনঘাট উন্নয়নে এক কোটি ৮০ লাখ টাকা, পাঁচটি লেক উন্নয়নে সাড়ে ১০ কোটি টাকা এবং সড়ক বাতি স্থাপনে সাত কোটি টাকা খরচ ধরা হয়েছে। ২০ লাখ টাকা দরে সাতটি পাবলিক টয়লেট উন্নয়নে খরচ হবে এক কোটি ৪০ লাখ টাকা। এসব ব্যয় নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের প্রশ্ন।
প্রকল্পে কাজের জন চারটি রোড রোলার কেনা হবে, যার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে তিন কোটি ৬০ লাখ টাকা। কমিশন বলছে, এসব সরঞ্জামাদি সাধারণত ঠিকাদার কর্তৃক সরবরাহের মাধ্যম পূর্ত কাজ সম্পন্ন করা হয়ে থাকে।
আইএমইডির এক প্রতিবেদনে তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা, নর্দমা ও ফুটপাথ উন্নয়ন প্রকল্পের চেয়ে ড্রেন নির্মাণে খরচ ফেনী পৌরসভাতে দ্বিগুণেরও বেশি। ঢাকা দক্ষিণে নর্দমা বা ড্রেন নির্মাণে ৬৭ দশমিক ৫৬ কিলোমিটারে খরচ হয় ৪১ কোটি ২৭ লাখ ৮২ হাজার টাকা। এখানে প্রতি কিলোমিটারে খরচ হয়েছে ৫৯ লাখ ৮৯ হাজার টাকা। ঢাকা উত্তরে ৪৬ দশমিক ০২২ কিলোমিটারে ২১ কোটি ২২ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
এখানে কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছে ৪৬ লাখ ১২ হাজার টাকা। সেনাবাহিনী যে অংশ করেছে তাতে ৩৭ দশমিক ১১৫ কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছে। যেখানে প্রতি কিলোমিটারে খরচ ছিল ৫৩ লাখ দুই হাজার টাকা। আর স্থানীয় সসরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলডিইডি) ১৬ দশমিক ১৬৯ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণ করেছে ছয় কোটি ৮৭ লাখ ৫৯ হাজার টাকা ব্যয়ে। এখানে কিলোমিটারে খরচ হয়েছে ৪২ লাখ ৫২ হাজার টাকা।
বলা হচ্ছে, নগর এলাকার পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাবে নবাগত এবং বসবাসরত নগরবাসীর নাগরিক সুবিধা প্রদান করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এরূপ পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে গিয়ে সরকারপ্রধান নগরের সার্বিক ছোট ছোট শহরকে পৌরসভা হিসেবে ঘোষণা করেছে। এই প্রক্রিয়াটি চলমান আছে।
ফলে আজ পর্যন্ত ঘোষিত পৌরসভার সংখ্যা হলো ৩২৮টি। এসব পৌরসভা মূলত পৌরবাসীর সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নেতৃতত্বে পরিচালিত হচ্ছে। তথাপিও অপর্র্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা এবং তার চেয়েও অপর্যাপ্ত সম্পদের কারণে নগরবাসীর ন্যূনতম অবকাঠামো চাহিদা অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে।
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ বলছে, সমীক্ষা না করার কারণে খরচের অঙ্ক নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পৌর উদ্যান উন্নয়ন বাবদ সাড়ে চার কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়; কিন্তু এখানে পৌর উদ্যানের পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি, যা উল্লেখ করা প্রয়োজন। উদ্যান, লেক, কবরস্থান, শ্মশানঘাট অঙ্গন প্রস্তাব করা হলেও পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি।
সড়ক উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে; কিন্তু তার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ উল্লেখ নেই। এসব কাজের জন্য এক কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে পরামর্শক নিয়োগের কথা প্রস্তাব করা হয়েছে। সাত কোটি টাকা ব্যয়ে কী পরিমাণ বাতি স্থাপন করা হবে সেটি স্পষ্ট করা হয়নি ডিপিপিতে।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, এই ব্যয়ের যৌক্তিক কোনো ব্যাখ্যা আমি পাচ্ছি না। এতটা হেরফেরের কোনো যৌক্তিকতা পাচ্ছি না। তবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কোনো ব্যাখ্যা থাকলে সেটি আমার কাছে নেই। সমীক্ষা ছাড়া প্রকল্পের প্রাক্কলনে অবশ্যই হেরফের হবে।