ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
বৃহস্পতিবার ২৭ আগস্ট ২০২৬ ১২ ভাদ্র ১৪৩৩
নেপালের ভয়াবহ বন্যা: হিমবাহ ধসেই কি বিপর্যয়ের শুরু?
নতুন সময় ডেস্ক
প্রকাশ: Thursday, 27 August, 2026, 12:09 PM
সর্বশেষ আপডেট: Thursday, 27 August, 2026, 12:18 PM

নেপালের ভয়াবহ বন্যা: হিমবাহ ধসেই কি বিপর্যয়ের শুরু?

নেপালের ভয়াবহ বন্যা: হিমবাহ ধসেই কি বিপর্যয়ের শুরু?

নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে বুধবারের প্রাণঘাতী আকস্মিক বন্যার শুরু হয়ে থাকতে পারে হিমবাহের নিচের একটি বড় অংশ ভেঙে কয়েকশ মিটার নিচে উপত্যকার মাটিতে আছড়ে পড়ার মধ্য দিয়ে।

প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে হিমবাহটি কেন ভেঙে পড়ল, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

রয়টার্স লিখেছে, নেপালের কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে একটি ভূমিকম্পকে হিমবাহ ধসের কারণ বলে মনে করলেও পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস ভিন্ন তথ্য দিয়েছে।

বুধবারের এই দুর্যোগে নিহতের সংখ্যা ইতোমধ্যে ১৬৫ জনে পৌঁছেছে। এই সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে নেপাল ও তিব্বতের কর্মকর্তাদের ধারণা।

নেপাল সরকার জানিয়েছে, দেড় হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন, তাদের মধ্যে আটশ জনের মত বিদেশি পর্যটক রয়েছেন।

কীভাবে ঘটতে পারে এই বন্যা?

রয়টার্স প্ল্যানেট ল্যাবসের তোলা দুর্যোগের আগের ও পরের স্যাটেলাইট ছবি পর্যালোচনা করেছে। এতে দেখা যায়, আগে সবুজে ঢাকা পাহাড়ের একটি বড় অংশ এখন বাদামি রঙের ধ্বংসাবশেষ ও কাদায় চাপা পড়েছে।

ভারতের সিকিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল ভূতত্ত্বের বিশেষজ্ঞ বিক্রম গুপ্ত বলেন, “হিমবাহের সামনের অংশের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ভেঙে পড়েছিল—এটি নিশ্চিত। এর সঙ্গে সম্ভবত বিপুল পরিমাণ পাথর ও কাদা যুক্ত হয়েছিল বা ধসের সঙ্গে সেগুলোও নেমে এসেছিল।”

কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারির সহযোগী অধ্যাপক ও ভূবিজ্ঞানী ড্যান শুগারও স্যাটেলাইট ছবিতে বড় ধরনের হিমবাহ ধসের ইঙ্গিত দেখেছেন।

তার মতে, দুর্যোগের আগের ২৪ ঘণ্টায় বিপুল পরিমাণ তুষার গলে থাকতে পারে।

শুগার বলেন, “উপত্যকার কিছু হিমবাহকে গতকাল তুষারে ঢাকা দেখা গেছে, আর আজ সেগুলো মূলত খালি বরফে পরিণত হয়েছে। অন্যভাবে বললে—যদিও আমি এখনো কোনো আবহাওয়া কেন্দ্রের তথ্য দেখিনি—সম্ভবত আবহাওয়া উষ্ণ ছিল।”

প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে শুগার বলেন, প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় হিমবাহের নিচের অংশ ভেঙে পড়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচের উপত্যকার মাটিতে আছড়ে পড়েছে।

তবে শুধু প্রাকৃতিক কারণই নয়, ওই এলাকায় নির্মাণকাজও ধসের ঘটনায় ভূমিকা রেখেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

শুগার বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন এতে কোনো ভূমিকা রেখেছে কি না, তা নিঃসন্দেহে আমরা অদূর ভবিষ্যতে খতিয়ে দেখব।”

ভূমিকম্পের কী কারণ?

নেপালের কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে বলেছিলেন, দুর্যোগের কয়েক মিনিট আগে ওই এলাকায় একটি ভূমিকম্প হয়েছিল। সেই ভূমিকম্প হিমবাহের বরফ ও পাথরের ধস নামিয়ে বন্যা সৃষ্টি করতে পারে বলে তাদের ধারণা হয়েছিল।

তবে পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানায়, দুর্যোগের সময় রেকর্ড হওয়া ৪ দশমিক ৪ মাত্রার যে ভূমিকম্পের কথা প্রাথমিকভাবে বলা হয়েছিল, সেটি আসলে হিমবাহের পাথর ও বরফ ধসে পড়া এবং ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ থেকে সৃষ্ট ভূকম্পনজনিত শক্তি।

নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নেপাল-চীন সীমান্তের একটি পারাপার কেন্দ্র থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে লেন্দে নদীতে এই ‘হিমবাহ-সম্পৃক্ত বন্যা’ হয়েছে। এর পেছনে একটি ভূমিধসের কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

ওই কর্তৃপক্ষের ভূতত্ত্ববিদ প্রকাশ পোখারেল প্ল্যানেট ল্যাবসের ছবি পর্যালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, নেপালের অংশে বরফ ও পাথরের ধস থেকেই আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্ক আছে?

রয়টার্স লিখেছে, হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহগুলো দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। জাতিসংঘ ২০২৩ সালে জানিয়েছিল, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে নেপালের তুষারাবৃত পাহাড়গুলো মাত্র ৩০ বছরের কিছু বেশি সময়ে তাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে।

জাতিসংঘ সে সময় বলেছিল, ভারত ও চীনের মাঝখানে অবস্থিত নেপালে গত এক দশকে হিমবাহ গলার হার আগের দশকের তুলনায় ৬৫ শতাংশ বেড়েছে।

তবে এবারের ঘটনাটি সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘটেছে কি না, সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন হিমবাহ কেন ভেঙে পড়ল, সেই কারণ নির্ধারণে আরও তথ্য ও বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

শুধু বন্যা নয়, নামছে ধসও

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, নেপালের প্রায় ৫০ হাজার জনসংখ্যার পাহাড়ি জেলা রাসুওয়ার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প রয়েছে। হিমবাহ ধসের সঙ্গে সৃষ্ট বন্যায় এসব অবকাঠামোও ঝুঁকিতে পড়েছে।

আঞ্চলিক পর্যায়ে দুর্যোগের প্রবণতাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে বন্যা, ভূমিধস, তুষারধস ও খরার ঘটনা ক্রমেই বেশি ঘন ঘন এবং আরও তীব্র হচ্ছে বলে জানিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (আইসিআইএমওডি)।

সংস্থাটি বুধবার জানিয়েছে, এবারের আকস্মিক বন্যায় পানি, পলি ও বড় বড় পাথরের শক্তিশালী স্রোত ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর মধ্য দিয়ে নেমে গেছে।

নদীর ভাটিতে গালছি এলাকায় মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে পানির উচ্চতা সর্বোচ্চ ৯ মিটার বা প্রায় ৩০ ফুট বেড়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

এ ঘটনা কেন এত ভয়াবহ?

হিমবাহের বরফের সঙ্গে পাথর ও পলি যুক্ত হয়ে নিচের দিকে নেমে এলে তার ধ্বংসক্ষমতা সাধারণ বন্যার চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।

পাহাড়ি ঢালে উচ্চতা থেকে দ্রুত নেমে আসা এমন স্রোত পথের ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামো ভাসিয়ে বা চাপা দিয়ে দিতে পারে।

নেপালের এবারের ঘটনায় স্যাটেলাইট ছবিতে ধসের বিস্তৃত চিহ্ন দেখা গেলেও ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ পানি, বরফ, পাথর ও পলি একসঙ্গে নিচে নেমে এল, তা নিয়ে অনুসন্ধান এখনো চলছে।

তাই আপাতত সবচেয়ে জোরালো ব্যাখ্যা হল, হিমবাহের নিচের বড় একটি অংশ ভেঙে পড়ে উপত্যকায় আছড়ে পড়েছিল। সেই ধসের সঙ্গে বরফ, পাথর ও পলি যুক্ত হয়ে লেন্দে নদীতে প্রবল স্রোত তৈরি করে। পরে সেটিই ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় রূপ নেয়।

তবে হিমবাহ ধসের মূল কারণ কী ছিল—ভূমিকম্প, উষ্ণতা, নির্মাণকাজ, জলবায়ু পরিবর্তন, নাকি এসবের কোনো সমন্বয়—তা এখনো নিশ্চিত নয়।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status