|
আগস্ট মাস কেন রাশিয়ার জন্য সুখকর নয়?
নতুন সময় ডেস্ক
|
![]() আগস্ট মাস কেন রাশিয়ার জন্য সুখকর নয়? রুশ ইতিহাসের পাতার দিকে তাকালে এই ভীতির যথার্থতা খুঁজে পাওয়া যায়। ৩৫ বছর আগে এই আগস্ট মাসেই সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভের বিরুদ্ধে একদল অনুগত কমিউনিস্ট শক্তিমত্তা দেখিয়ে ব্যর্থ অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেছিল। সেই ঘটনার ধাক্কাতেই শেষ পর্যন্ত তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছিল শক্তিশালী সোভিয়েত ইউনিয়ন। ঠিক তার সাত বছর পর ১৯৯৮ সালের আগস্টে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয় দেশটিকে। অভ্যন্তরীণ ঋণে দেউলিয়া হয়ে পড়ে রুশ সরকার এবং এক লহমায় ধসে যায় রুশ মুদ্রা রুবেলের মান। এর ঠিক পরের বছর, ১৯৯৯ সালের আগস্টে দাগেস্তান অঞ্চলে সশস্ত্র মিলিশিয়াদের অনুপ্রবেশের মাধ্যমে সূচনা হয় দ্বিতীয় চেচেন যুদ্ধের। এই যুদ্ধই রাজনৈতিকভাবে অখ্যাত, সাবেক কেজিবি কর্মকর্তা ভ্লাদিমির পুতিনকে ক্ষমতার শীর্ষ অলিন্দে পৌঁছে দিয়েছিল। ১৯৯৯ সালের বর্ষশেষের রাতে বরিস ইয়েলৎসিনের আচমকা ক্ষমতা হস্তান্তরের পর দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পান ভ্লাদিমির পুতিন। তবে শক্ত হাতের শাসক হয়েও তিনি ‘আগস্টের অভিশাপ’ থেকে মুক্ত থাকতে পারেননি। পুতিনের শাসনের একেবারে শুরুর দিকে, ২০০০ সালের আগস্টে ‘কুর্স্ক’ নামক পারমাণবিক সাবমেরিনটি ১১৮ জন নাবিকসহ সমুদ্রে তলিয়ে যায়, যা ছিল তার প্রশাসনের জন্য প্রথম বড় আঘাত। এর আট বছর পর, ২০০৮ সালের আগস্টে প্রতিবেশী দেশ জর্জিয়ার সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে রাশিয়া, যা পুতিনের আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতির নগ্ন রূপ বিশ্বমঞ্চে প্রকাশ করেছিল। চলতি বছরের গ্রীষ্মেও রাশিয়ার পরিস্থিতি বেশ উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। ইউক্রেন সীমান্তে রুশ বাহিনীর অগ্রগতি প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডের ভেতরের দৃশ্যচিত্র বেশ বিষাদময়। ইউক্রেনীয় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় রাশিয়ার তেল শোধনাগার এবং আমাজন-স্টাইলের বড় বড় ই-কমার্স লজিস্টিক সেন্টারগুলো আগুনে ছাই হয়ে ধোঁয়া ছড়াচ্ছে। জ্বালানি কেন্দ্রগুলোতে দীর্ঘ লাইন এবং পুনরায় নতুন করে সেনা তলবের গুজবে সাধারণ রুশ নাগরিকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। এমতাবস্থায় আবার প্রশ্ন উঠেছে, রাশিয়া কি তবে আরেকটি ‘ব্ল্যাক আগস্টের’ মুখোমুখি? নির্বাসিত রুশ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইলিয়া ভার্লামোভ সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনায় লিখেছেন যে, ইতিহাসজুড়ে আগস্টের এই বিপর্যয়গুলোকে অনেকে কাকতালীয় মনে করতেই পারেন। কিন্তু সাধারণ রাশিয়ানরা সবসময়ই এই মাসটিকে এক অজানা আতঙ্ক নিয়ে অপেক্ষা করে, বিশেষ করে যখন দেশটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে জর্জরিত। জ্বালানি সংকট, জিনিসপত্রের লাগামহীন দাম বৃদ্ধি, রুবেলের অব্যাহত অবমূল্যায়ন এবং আসন্ন নির্বাচনের চাপ সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে। এমনকি শীর্ষস্থানীয় এক রুশ অর্থনীতিবিদও সম্প্রতি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে, মস্কো এখন এক গভীর ‘সামাজিক সংকটের’ মুখোমুখি এবং বৈশ্বিক প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে পশ্চিমা সমর্থনপুষ্ট ইউক্রেনকে হারিয়ে জয়ী হওয়া রাশিয়ার জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্রেমলিনপন্থী হিসেবে পরিচিত পত্রিকা ‘মোস্কোভস্কি কমসোমোলেৎস’ পর্যন্ত এই আগস্টের আতঙ্ক নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যদিও তারা এর ব্যাখ্যায় জ্যোতিষশাস্ত্রের সাহায্য নিয়েছে। পত্রিকায় লেখা হয়েছে, চন্দ্রগ্রহণ এবং প্লাুটো গ্রহের অবস্থানের প্রভাবে সমাজে অস্থিরতা, দুশ্চিন্তা, রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং মানসিক ভারসাম্যহীনতার ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। চারপাশের এমন গুঞ্জন ও ডামাডোলের মধ্যেও প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বরাবরের মতো সব শান্ত ও স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। দেশীয় অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পের এক বৈঠকে তিনি ই-কমার্স জায়ান্ট ‘ওয়াইল্ডবেরিজ’-এর গুদামে ইউক্রেনীয় হামলার ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করলেও কোম্পানির নাম উচ্চারণ করা থেকে বিরত থাকেন। পরিস্থিতি হাল্কা করে পুতিন দাবি করেন, এসব হামলায় দীর্ঘমেয়াদে দেশের কোনো সংকটজনক ক্ষতি হবে না বা হতে পারে না। ক্ষতিগ্রস্ত লজিস্টিক সেন্টারগুলো সরকারি সহায়তায় দ্রুত পুনর্নির্মাণ করা হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন। তবে সাধারণ রাশিয়ানদের কাছে এটি এখন স্পষ্ট যে, যুদ্ধের আঁচ সরাসরি তাদের পকেটে এসে লাগতে শুরু করেছে। অন্যদিকে, ইউক্রেনও যুদ্ধের অভ্যন্তরীণ সংকট কাটিয়ে উঠতে লড়াই করছে। সম্প্রতি ইউক্রেনের অপসারিত প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাইখাইলো ফেদোরভ যুদ্ধের মধ্যেই নতুন জাতীয় নির্বাচনের দাবি তুলে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে সরাসরি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছেন। এর মাধ্যমে পুতিনের হাতে নতুন একটি রাজনৈতিক কার্ড তুলে দেওয়া হলো, কারণ তিনি দীর্ঘদিন ধরেই জেলেনস্কির প্রেসিডেন্ট পদের বৈধতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রশ্ন তুলে আসছেন। সূত্র: সিএনএন |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
