ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
মঙ্গলবার ২৫ আগস্ট ২০২৬ ১০ ভাদ্র ১৪৩৩
হাসিনার ‘মেগাফোন’ বন্ধ হলেই কি গলবে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বরফ?
নতুন সময় ডেস্ক
প্রকাশ: Tuesday, 25 August, 2026, 4:37 PM

হাসিনার ‘মেগাফোন’ বন্ধ হলেই কি গলবে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বরফ?

হাসিনার ‘মেগাফোন’ বন্ধ হলেই কি গলবে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বরফ?

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক নতুন করে স্বাভাবিক করার উদ্যোগে আবারও দেখা দিয়েছে অচলাবস্থা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে দুই দেশ নীরবে আলোচনা করছিল। কিন্তু ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সেই উদ্যোগে বড় ধাক্কা লাগে।

গত ৫ আগস্ট ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। তিনি, তার ছেলে এবং আওয়ামী লীগের নেতারা ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সমালোচনা করেন। এরপরই ঢাকার পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়।

বাংলাদেশ বলেছে, ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ দেওয়ায় তারা ‘ক্ষুব্ধ’। ঢাকা আগে থেকেই নয়াদিল্লিকে সতর্ক করেছিল, ভারতের ভূখণ্ড থেকে এমন কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করা উচিত নয়, যা দুই দেশের সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রত্যর্পণ নয়, মূল সমস্যা ‘মেগাফোন’
বাংলাদেশের সাবেক কূটনীতিক ও নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সাবেক প্রেস মিনিস্টার ফয়সাল মাহমুদের মতে, হাসিনার প্রত্যর্পণ ও তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। তার মতে, বর্তমান অচলাবস্থার কেন্দ্রবিন্দু মূলত শেখ হাসিনাকে ভারতে থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া, তথা ‘মেগাফোন’ সুবিধা। প্রত্যর্পণের বিষয়টি অনেক বেশি জটিল এবং সময়সাপেক্ষ।

বাংলাদেশ সরকারও বিষয়টি জানে। তাই তারেক রহমানের ভারত সফর কিংবা দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সমস্যা হাসিনার প্রত্যর্পণ নয়। বরং ভারতের মাটি থেকে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার বিষয়টিই বড় হয়ে উঠেছে।এই উদ্বেগ অবশ্য নতুন নয়।

২০২৫ সালের ৪ এপ্রিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বৈঠকে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসও শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ‘উসকানিমূলক’ বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত রাখার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

ঢাকার বার্তা, সম্পর্ক ছিন্ন করতে চায় না বাংলাদেশ
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, ভারতকে নিয়ে ঢাকার লক্ষ্য হলো আস্থা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলা। তবে তার বক্তব্য, ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করতে দেওয়া মেনে নেওয়া হবে না।

তিনি বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেছে। ভারতকেও সেই পরিবর্তিত বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হবে।

হুমায়ুন কবির আল-জাজিরাকে বলেন, যারা আমাদের লোকজনকে হত্যা করেছে, সেই সন্ত্রাসীদের তাদের নিজেদের ভূমি থেকে কথা বলার এবং বাংলাদেশে সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এটি মেনে নেওয়া যায় না।তিনি বলেন, ঢাকা চায় ভারত যেন শেখ হাসিনাসহ শরীফ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত বাংলাদেশিদেরও ফেরত পাঠায়।তবে হাসিনা ইস্যুর কারণে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকুক, সেটিও চায় না ঢাকা।

হুমায়ুন কবিরের ভাষায়, দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হওয়া প্রয়োজন। তবে সেটি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সময়ে হতে হবে। এটি আগামী সপ্তাহে হতে পারে, দুই সপ্তাহ পরে হতে পারে, আবার দুই মাস পরও হতে পারে।সম্প্রতি ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে তারেক রহমানকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি নিয়ে একটি নোটিশ প্রকাশের পর তা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রত্যাহার করা হয়। এ ঘটনায় সফর নিয়ে নতুন করে জল্পনা তৈরি হয়েছে।

শেখ হাসিনাকে কি ফেরত দেবে ভারত?
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নটি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও ভারতের জন্য এটি একটি জটিল আইনি বিষয়।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান দমনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনাকে তার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে শেখ হাসিনা ওই বিচারপ্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

বাংলাদেশ ২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় কূটনৈতিক নোটের মাধ্যমে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ হাসিনাকে ফেরত চায়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে তার মৃত্যুদণ্ডের পরও সেই অনুরোধ পুনর্ব্যক্ত করে ঢাকা।

এরপর ভারত জানায়, বিষয়টি ‘পরীক্ষাধীন’ রয়েছে। ১১ আগস্ট ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আবারও জানায়, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী পরীক্ষা করা হচ্ছে।ভারত বলেছে, অগ্রগতি হলে বাংলাদেশকে জানানো হবে।

ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেছেন, প্রত্যর্পণের জন্য দুই দেশের চুক্তির বিধান ও ভারতের আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। চুক্তিতে প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যানের কিছু সুযোগও রয়েছে।

দেশের রাজনীতিও প্রভাব ফেলছে কূটনীতিতে
বাংলাদেশের রাজনীতির পর্যবেক্ষক ডেভিড বার্গম্যান মনে করেন, হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবি নিয়ে ঢাকার অবস্থানে একটি রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব রয়েছে।তার মতে, বাংলাদেশ হয়তো জানে ভারত দ্রুত শেখ হাসিনাকে ফেরত দেবে না। তবু দেশের জনমতের চাপ সামলাতে প্রত্যর্পণের দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরা হচ্ছে।

অন্যদিকে হাসিনা দেশে ফিরে এলে বাংলাদেশের জন্যও নতুন রাজনৈতিক ও আইনি সংকট তৈরি হতে পারে। কারণ দেশে ফিরিয়ে আনা হলে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে কীভাবে রাখা হবে, তার বিচার ও সম্ভাব্য দণ্ড কার্যকর করা হবে কি না—এসব প্রশ্ন সামনে আসবে। ফলে হাসিনার প্রত্যাবর্তন ঢাকার জন্যও সহজ সমাধান নয়।

শুধু হাসিনা নন, সম্পর্কের হিসাব আরও বড়
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের টানাপোড়েনকে শুধু শেখ হাসিনা ইস্যু দিয়ে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে না।জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শাহাব এনাম খান মনে করেন, ঢাকার বর্তমান অবস্থানকে সরাসরি ভারতবিরোধী হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।বাংলাদেশের জন্য ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা ও জনগণের যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ।

তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও আইনি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার বিষয়টি সামনে এসেছে। একই সঙ্গে, ভারতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে বাংলাদেশের জনমনে যে ধারণা তৈরি হয়েছে, সেটিও সরকারের অবস্থানকে প্রভাবিত করছে।বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে ভারত কতটা মানিয়ে নিতে পারছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তনের আরেকটি দিকও ভারতের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

ঢাকা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াচ্ছে। তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ছে। পাকিস্তানের সঙ্গেও নতুন করে যোগাযোগ জোরদার হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও কৌশলগত ক্ষেত্রে চীনের ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।তবে এসব সম্পর্ক ভারতের কৌশলগত গুরুত্ব কমিয়ে দেয়নি।

দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ শ্রীধারা দত্তের মতে, ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে বাংলাদেশ ও ভারত দীর্ঘ সময় পরস্পর থেকে দূরে থাকতে পারবে না।দুই দেশের মধ্যে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ স্থলসীমান্ত রয়েছে। বাংলাদেশ ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় যোগাযোগ, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক কৌশলের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের মধ্যে ৭০টির বেশি দ্বিপক্ষীয় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাও রয়েছে।

বাণিজ্য চলছে, বন্ধ হয়নি যোগাযোগ
রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও দুই দেশের ব্যবহারিক যোগাযোগ পুরোপুরি থেমে নেই।

চলতি মাসেই ভারতের কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রির একটি প্রতিনিধিদল ঢাকায় এসে সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেছে।দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যও বছরে ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি। ভারতীয় হাইকমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ভারতের রপ্তানির পরিমাণ ১০ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার।ফলে সম্পর্কের টানাপোড়েন থাকলেও বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার বাস্তবতা নেই।

ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর ভাষায়, ভূগোল এমন একটি বাস্তবতা, যা দুই দেশের নীতিনির্ধারকেরা উপেক্ষা করতে পারেন না। ভারত ও বাংলাদেশের স্বার্থ একে অপরের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত যে দীর্ঘদিন উচ্চপর্যায়ের সম্পর্ক স্থবির রাখা কঠিন।

তাহলে বরফ গলবে কীভাবে
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত ১৮ আগস্টও বলেছে, তারেক রহমানের জন্য ভারতের আমন্ত্রণ বহাল রয়েছে। একই সঙ্গে, নয়াদিল্লি বাংলাদেশের সঙ্গে ‘ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যতমুখী’ সম্পর্ক চাওয়ার কথা জানিয়েছে।

তবে দুই দেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কীভাবে এমন একটি সমঝোতার পরিবেশ তৈরি করা যায়, যাতে কেউ প্রকাশ্যে পিছু হটার অবস্থায় না পড়ে।ঢাকার কাছে গুরুত্বপূর্ণ শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে না দেওয়া।নয়াদিল্লির কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যর্পণ প্রশ্নটি আইনি প্রক্রিয়ায় সামলানো এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক ধরে রাখা।

তারেক রহমানের ভারত সফর সেই বৃহত্তর সমঝোতার প্রথম বড় পরীক্ষা হতে পারে।হাসিনাকে ঘিরে বিরোধ দ্রুত মিটবে কি না, তা এখনই বলা কঠিন। তবে বাংলাদেশ ও ভারতের ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত বাস্তবতা বলছে, দীর্ঘমেয়াদে দুই দেশের সম্পর্কের ‘রিসেট’ কোনো পক্ষের জন্যই এড়িয়ে যাওয়া সহজ হবে না।

সূত্র: আল-জাজিরা 

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status