|
মশা দিয়েই মশা নিধন
বাংলাদেশে ডেঙ্গু মোকাবিলার পথ দেখাতে পারে সিঙ্গাপুরের আজব যে কৌশল
নতুন সময় ডেস্ক
|
![]() বাংলাদেশে ডেঙ্গু মোকাবিলার পথ দেখাতে পারে সিঙ্গাপুরের আজব যে কৌশল ১০ বছর পর আজ সিঙ্গাপুরে জাতীয় কৌশলের অংশ হিসেবে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ওলবাশিয়া মশা প্রজনন ও পরিবেশে অবমুক্ত করা হচ্ছে। রোগ প্রতিরোধে আরও বেশি মশা ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে অদ্ভুত মনে হতে পারে। তবে ‘প্রজেক্ট ওলবাশিয়া’ নীরবে নিজের কার্যকারিতা প্রমাণ করে দেখিয়েছে। ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই স্বাধীনতার আগে থেকেই সিঙ্গাপুরে ডেঙ্গুর প্রকোপ ছিল ভয়াবহ। সত্তরের দশকে দেশটিতে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ছিল চরম মাত্রায়। চারদিকে দ্রুত নগরায়ণ ও ঘনবসতির কারণে এডিস মশা জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে। রোগে আক্রান্ত হয়ে অসংখ্য মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হতেন। প্রাণহানিও ঘটছিল নিয়মিত। তৎকালীন সরকার ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রথাগত নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। তারা ড্রেন পরিষ্কার, কীটনাশক স্প্রে ও ফগার মেশিন ব্যবহার করে মশা তাড়ানোর চেষ্টা চালায়। কিন্তু দেখা গেল, ফগার মেশিন দিয়ে সাময়িকভাবে মশা তাড়ানো গেলেও দীর্ঘমেয়াদে কোনো লাভ হচ্ছে না। মশা এক পাড়া থেকে অন্য পাড়ায় চলে যেত এবং কয়েকদিন পর আবার ফিরে আসত। তার ওপর, রাসায়নিক কীটনাশকের বিরুদ্ধে এডিস মশা একসময় প্রতিরোধী হয়ে ওঠে। ফলে প্রথাগত পদ্ধতিতে ডেঙ্গু দমন করা সিঙ্গাপুরের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে। ল্যাবরেটরির মশা যেভাবে হলো হাতিয়ার ঐতিহ্যগত পদ্ধতিতে ব্যর্থ হয়ে সিঙ্গাপুরের বিজ্ঞানীরা একদম ভিন্নধর্মী ও পরিবেশবান্ধব এক পথ বেছে নেন। তারা মশা দিয়েই মশা মারার এক অভিনব জীবতাত্ত্বিক কৌশল বের করেন। বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেন, ওলবাশিয়া নামে এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া রয়েছে, যা বিশ্বের অনেক কীটের শরীরে প্রাকৃতিকভাবেই থাকে। তবে ডেঙ্গুর মূল বাহক ‘এডিস ইজিপ্টি’ মশার শরীরে এই ব্যাকটেরিয়া থাকে না। বিজ্ঞানীরা ল্যাবরেটরিতে কোটি কোটি পুরুষ এডিস মশার শরীরে কৃত্রিমভাবে এই ওলবাশিয়া ব্যাকটেরিয়া পুশ করেন। এই ব্যাকটেরিয়াযুক্ত পুরুষ মশাগুলো নিয়মিত বিরতিতে সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন আবাসিক এলাকার প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়া শুরু হয়। ওলবাশিয়া-আক্রান্ত এই পুরুষ মশা কামড়াতে পারে না এবং এরা কোনো রোগ ছড়ায় না। প্রকৃতিতে ঘুরে বেড়ানো সাধারণ বন্য স্ত্রী মশার সঙ্গে যখন এই ল্যাবরেটরির পুরুষ মশার মিলন ঘটে, তখন এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। এদের মিলনে যে ডিম উৎপাদিত হয়, তা থেকে আর কোনো বাচ্চার জন্ম হয় না। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘সাইটোপ্লাজমিক ইনকমপ্যাটিবিলিটি’। এর ফলে মশার বংশবৃদ্ধি সম্পূর্ণ থমকে যায় এবং ধীরে ধীরে এডিস মশার সংখ্যা প্রকৃতি থেকে বিলীন হতে শুরু করে। ১০ বছরের অবিরাম গবেষণা ও সাফল্য ২০২০ সালে সিঙ্গাপুরে রেকর্ড ৩৫ হাজার ৩১৫ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন এবং ৩২ জন মারা যান। তবে ২০২৫ সালে চার হাজারেরও মতো আক্রান্ত এবং মাত্র চারজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। সম্প্রতি চিকিৎসা সাময়িকী নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব এলাকায় ওলবাশিয়া-এডিস মশা ছাড়া হয়েছিল, সেখানে এডিস মশার বংশবৃদ্ধি ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। ফলে ওই এলাকার বাসিন্দাদের ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমেছে ৭২ শতাংশ। এমনকি পার্শ্ববর্তী যেসব এলাকায় এই মশা ছাড়া হয়নি, সেখানেও ডেঙ্গুর ঝুঁকি ৪৫ শতাংশ কমেছে। ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ সিঙ্গাপুরের অর্ধেকেরও বেশি পরিবারকে এ প্রকল্পের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। শুধু বিজ্ঞানই যথেষ্ট নয় শুধু জীববিজ্ঞানই সিঙ্গাপুরের এই সাফল্যের একমাত্র কারণ নয়। আসল পরীক্ষা ছিল সিঙ্গাপুরের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এবং বহুতল ভবনের নগর পরিবেশে এটি নিরাপদে প্রয়োগ করা। প্রথম দিকের পরীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, মশা সব তলার বাসিন্দাদের সুরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত উঁচুতে উড়তে পারত না। আশপাশের এলাকা থেকেও মশা চলে আসত। এই চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠতে ড্রোন এবং বহুতল ভবনে মশা অবমুক্তকরণের মতো নতুন প্রযুক্তি ও কৌশল উদ্ভাবন করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের মতো দেশগুলোও এই প্রযুক্তি পরীক্ষা করেছে। তবে তারা মূলত ছোট পরিসরে এবং শহরতলির পরিবেশে এটি করেছে। সিঙ্গাপুরই প্রথম দেশ, যারা এই প্রযুক্তিকে বহুতল ও ঘনবসতিপূর্ণ ক্রান্তীয় পরিবেশে একটি বৃহৎ আকারের সফল জাতীয় কর্মসূচিতে রূপান্তর করেছে। জনগণের আস্থাই মূল ভিত্তি সাধারণ মানুষের আস্থা ছাড়া কোনো জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি সফল হতে পারে না। মশাকে সাধারণত সবাই উপদ্রব হিসেবেই দেখে। তাই আরও মশা ছেড়ে দেওয়া কীভাবে ডেঙ্গু কমাবে—তা বিশ্বাস করা সাধারণ মানুষের জন্য সহজ ছিল না। এজন্য আবাসিক এলাকার মাঠ পর্যায়ের পরীক্ষার পাশাপাশি প্রচারণায় জোর দেওয়া হয়। এটি কেবল এককালীন প্রচার ছিল না, বরং একটি চলমান প্রক্রিয়া ছিল। বাসিন্দাদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে, ওলবাশিয়া মশাগুলো কেবলই পুরুষ মশা, যা মানুষকে কামড়ায় না। একই সঙ্গে, তাদের সাধারণ মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু রাখার অনুরোধ করা হয়। এই প্রযুক্তির সাফল্যের পেছনে শুধু বিজ্ঞান নয়, সমাজের প্রতিটি মানুষের সচেতন অংশগ্রহণ বড় ভূমিকা রেখেছে। প্রকল্পটি তড়িঘড়ি করে পুরো দেশে চালু না করে ধাপে ধাপে এগোনো হয়েছিল। ফলে এর নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা পরীক্ষা করার এবং মানুষের আস্থা অর্জনের পর্যাপ্ত সময় পাওয়া গেছে। এলাকার ডেঙ্গুর প্রকোপ কমতে থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই প্রকল্পের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। সমন্বিত প্রচেষ্টা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বীকৃতি প্রতি সপ্তাহে লাখ লাখ মশা তৈরি করতে সিঙ্গাপুরের জাতীয় পরিবেশ সংস্থার কীটতত্ত্ববিদ ও প্রকৌশলীদের স্বয়ংক্রিয় প্রজনন ব্যবস্থা এবং মশার লিঙ্গ নির্ধারণের মতো আধুনিক সিস্টেম তৈরি করতে হয়েছে। এই কাজে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের গবেষক ও প্রতিষ্ঠান যুক্ত ছিল। যেমন—মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটি ওলবাশিয়া-এডিস মশার মূল স্ট্রেইন সরবরাহ করেছিল। পাশাপাশি গুগল এশিয়া প্যাসিফিকের ডিবাগ এবং অরিনো টেকনোলজির সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে মশা উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো হয়। তথ্যবিজ্ঞানী, মডেলিং বিশেষজ্ঞ এবং মহামারি বিশেষজ্ঞরা বিপুল পরিমাণ ডেটা বিশ্লেষণ করে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল নির্ধারণ করেন। গবেষণায় ওলবাশিয়ার এই পদ্ধতি নিরাপদ ও কার্যকর প্রমাণিত হওয়ায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও সিঙ্গাপুরে এর ব্যবহারের অনুমোদন ও সমর্থন দিয়েছে। কী শিখতে পারে বাংলাদেশ সিঙ্গাপুরের প্রজেক্ট ওলবাশিয়া থেকে বাংলাদেশের মতো ডেঙ্গুপ্রবণ দেশের অনেক কিছু শেখার আছে। বাংলাদেশের জলবায়ু এবং ঘনবসতিপূর্ণ শহরের প্রেক্ষাপটে সিঙ্গাপুরের এই অভিজ্ঞতা অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে: প্রাচীন পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার: বাংলাদেশে এখনো মূলত ফগার মেশিন দিয়ে অ্যাডাল্টিসাইড (পূর্ণাঙ্গ মশা মারার ওষুধ) বা লার্ভিসাইড ছেটানোর প্রাচীন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা দেখায় যে, শুধু ওষুধ ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব। বাংলাদেশকে এখন ওলবাশিয়া ব্যাকটেরিয়া বা স্টেরাইল ইনসেক্ট টেকনিকের মতো পরিবেশবান্ধব জীববৈজ্ঞানিক মশা নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তিতে নজর দিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক গবেষণা: সিঙ্গাপুর রাতারাতি সফল হয়নি, তারা প্রায় এক দশক ধরে মশার আচরণ এবং এর জেনেটিক্স নিয়ে গবেষণা করেছে। বাংলাদেশেও ডেঙ্গুর ধরন, এডিস মশার কামড়ানোর সময় পরিবর্তন এবং কীটনাশক প্রতিরোধী ক্ষমতার ওপর স্থানীয়ভাবে দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক গবেষণা জোরদার করা প্রয়োজন। কঠোর আইনের প্রয়োগ ও জবাবদিহিতা: সিঙ্গাপুরে মশার লার্ভা পাওয়া গেলে গৃহকর্তা বা নির্মাণাধীন ভবনের মালিককে বিশাল অংকের জরিমানা এবং কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। বাংলাদেশেও আইন আছে, তবে তার প্রয়োগ ঢিলেঢালা। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে আইনি প্রয়োগ এবং জরিমানা ব্যবস্থা আরও কঠোর ও নিয়মিত করা জরুরি। বছরব্যাপী সমন্বিত কর্মসূচি: বাংলাদেশে সাধারণত বর্ষা মৌসুম শুরু হলে বা ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লে মশা নিধনে তোড়জোড় শুরু হয়। কিন্তু সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল এনভায়রনমেন্ট এজেন্সি বছরের ৩৬৫ দিনই সমানভাবে মশা পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালায়। বাংলাদেশকে এই মৌসুমি প্রবণতা থেকে বের হয়ে বছরব্যাপী সমন্বিত মশা নিধন কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। নিবিড় জনসচেতনতা ও তথ্য প্রচার: সিঙ্গাপুরের নাগরিকরা ল্যাবরেটরির মশা ছড়ানোর উদ্যোগে আতঙ্কিত না হয়ে সরকারকে সহযোগিতা করেছে, কারণ সরকার আগে থেকেই তাদের সচেতন করেছিল। বাংলাদেশে যে কোনো নতুন প্রযুক্তি বা উদ্যোগ সফল করতে হলে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে এবং সঠিক ও স্বচ্ছ তথ্য দিয়ে তাদের আস্থা অর্জন করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি: সিঙ্গাপুরের মতো একটি একক ও শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সংস্থা পুরো দেশের পরিবেশ ও মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তদারকি করে। বাংলাদেশে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মধ্যে প্রায়ই সমন্বয়ের অভাব দেখা যায়। মশা ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে একটি স্বাধীন, একক ও ক্ষমতাসম্পন্ন কেন্দ্রীয় সেল বা টাস্কফোর্স গঠন করা এখন সময়ের দাবি। সিঙ্গাপুরের প্রজেক্ট ওলবাশিয়া হলো একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশলের অংশ। এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় প্রভাব কেবল মশা বা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি দেখিয়েছে কীভাবে একটি বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনা নিখুঁত জাতীয় বাস্তবতায় রূপ দেওয়া যায়। সূত্র: সিএনএ, এনইএ, দ্য ল্যানসেট, দ্য স্ট্রেইট টাইমস
|
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
