|
মিয়ানমারে যুদ্ধ: রোহিঙ্গা ও রাখাইনদের কাছে ওপার থেকে যে খবর আসছে
নতুন সময় ডেস্ক
|
![]() মিয়ানমারে যুদ্ধ: রোহিঙ্গা ও রাখাইনদের কাছে ওপার থেকে যে খবর আসছে বুধ ও বৃহস্পতিবার দুদিনই মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্যের বিভিন্ন অংশে গোলাবর্ষণ করেছে। এর শব্দ সীমান্তে এপার থেকে বেশ স্পষ্টভাবেই শোনা গেছে। ফলে আবারও সেখানে মিয়ানমারের বিবাদমান গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে বলে ধারণা করছেন এপারের বাসিন্দারা। বিশেষ করে উপকূলজুড়ে বিশাল শরণার্থী ক্যাম্পে বসবাসকারী লাখ লাখ রোহিঙ্গা এ ঘটনায় উদ্বিগ্ন। কারণ, তাদের অনেকের আত্মীয়-স্বজন এখনও রাখাইনের বিভিন্ন গ্রামে বসবাস করছেন। নতুন করে সংঘর্ষের মধ্যে তারা কী পরিস্থিতির মধ্যে আছেন সেটা জানতে অনেক রোহিঙ্গাই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কক্সবাজার ও বান্দরবানের বিভিন্ন এলাকায় বসবাসকারী রাখাইনদের অনেকের আত্মীয়-স্বজনও রাখাইন রাজ্যে বসবাস করছেন। ওপারের স্বজনদের সঙ্গে এপারের বাসিন্দাদের নিয়মিতই যোগাযোগ হয়। বৃহস্পতিবার রাত থেকে তারাও স্বজনদের খোঁজ-খবর নেওয়ার চেষ্টা করছেন। রোহিঙ্গা ও রাখাইনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা তাদের স্বজনদের মাধ্যমে নতুন করে বিমান হামলার খবর পাচ্ছে; এবং এ নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। অপরদিকে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষা বাহিনী-বিজিবিও মিয়ানমারের ভেতরে যুদ্ধ-পরিস্থিতির কারণে সীমান্তে নজরদারি বাড়িয়েছে। তাদের আশঙ্কা, এ ধরনের পরিস্থিতিতে বাস্তুচ্যুত হয়ে রোহিঙ্গারা অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালাতে পারে। রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমারের এই যুদ্ধ পরিস্থিতির খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও আসছে। বিমান হামলায় হতাহতের খবর আরাকান রোহিঙ্গা ফুটবল ফেডারেশনের (এআরএফএফ) সভাপতি মুজিবুর রহমান একসময় মংডু টাউনশিপের নাকাকা-৫ এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্যাতন আর যুদ্ধের মুখে বাস্তুচ্যুত হয়ে বেশ কয়েক বছর আগে নাফ নদী পাড়ি দিয়ে তিনি বাংলাদেশে চলে আসেন। এখন তার ঠিকানা এখানকার একটি রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প। তবে ওপারের স্বজন, প্রতিবেশী ও বন্ধুদের সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে। মুজিবুর রহমান জানান, বৃহস্পতিবার রাতে এপার থেকে ভারী বিস্ফোরণের শব্দ শোনার পর তিনি ওপারে কথা বলেছেন। তাদের ভাষ্য, বুধবার মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিমান হামলায় বুথিডং টাউনশিপের ওয়াচিলা গ্রাম এবং মংডু টাউনশিপের নাকাকা-৫ গ্রামে এক শিশুসহ কয়েকজন রোহিঙ্গা আহত হয়েছেন। ওপারের লোকজনদের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ হয় মুজিবুর রহমানের। তিনি বলেন, বুধবার বিকাল প্রায় ৩টা ৪৫ মিনিটে একটি সামরিক হেলিকপ্টার ওয়াচিলা গ্রামের কাছে তিনটি বোমা ছোড়ে। পরে রাত প্রায় ১০টা ১০ মিনিটে নাকাকা-৫ গ্রামে আরও দুটি বিমান হামলা হয়। মুজিবুর রহমান এক কিশোরীর ছবি দেখিয়ে বলেন, মিয়ানমার জান্তা বাহিনীর বিমান হামলায় রাখাইন রাজ্যের বুথিডং টাউনশিপের ওয়াচিলা গ্রামে ১৩ বছর বয়সী এই রোহিঙ্গা কিশোর গুরুতর আহত হয়েছে। এ ছাড়া বুধবার সকালে বিমান হামলায় আহত হয় কিশোর মো. সাইয়েদউল্লাহ (১৩)। হামলার পর তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবারও বেশ কয়েকটি জায়গায় হামলা হয়েছে বলে স্বজনদের বরাতে দাবি করেছেন মুজিবুর। তিনি হামলার কয়েকটি ছবিও দেখিয়েছেন। তবে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এসব ছবি ও তথ্য নিজস্ব মাধ্যমে যাচাই করতে পারেনি। প্রায় একই ধরনের কথা বলেছেন রাখাইন রাজ্যে থাকা এক রোহিঙ্গা যুবক। তবে তিনি নিরাপত্তার খাতিরে পরিচয় ও বসবাসের স্থান বলতে চাননি। তার ভাষ্য, বুধবার মিয়ানমারের সামরিক বিমান হামলা চালিয়েছিল। তবে জায়গাটি তিনি যেখানে অবস্থান করছেন তার থেকে কিছুটা দূরে। বৃহস্পতিবারের হামলার ব্যাপারে জানতে চাইলে ওই রোহিঙ্গা যুবক দাবি করেন, “প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি, দুপুর ২টার দিকে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা আরাকানের মংডু টাউনশিপের কিয়েইন চাউং গ্রাম ও আশপাশের এলাকায় বিমান হামলা চালিয়েছে।” তার পরিচিত স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ-রাখাইন সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত কিয়েইন চাউং গ্রাম এবং সীমান্তরক্ষী পুলিশ সাব-ডিভিশন-৭ (নাকাকা-৭) সদরদপ্তরের আশপাশে একাধিক বিমান থেকে ১০টিরও বেশি বোমা ফেলা হয়েছে।” তবে এ হামলায় ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারেননি। কিয়েইন চাউং গ্রামটি উত্তর মংডু টাউনশিপের তাউংপিও লেতওয়ে জংশনের কাছে অবস্থিত একটি বড় ও ঘনবসতিপূর্ণ জনপদ। ওই রোহিঙ্গা যুবক বলেন, “গতকাল ভারি বৃষ্টির কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা হামলার আগে যুদ্ধবিমানের শব্দ শুনতে পাননি। পরপর দুটি বোমা বিস্ফোরিত হওয়ার পর পুরো গ্রাম কেঁপে ওঠে।” ২৪ জুনও মংডু শহরে দুটি বড় বোমা নিক্ষেপ করা হয় বলে দাবি করেন তিনি। এদিকে উখিয়ার একটি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের নেতা মো. জুবায়েরের দাবি, রাখাইনে কয়েক দিন ধরে বিমান হামলায় বহু ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে এবং কয়েক হাজার রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। শরণার্থী ক্যাম্পের বেশ কয়েকজন সাধারণ বাসিন্দা ও মাঝির (রোহিঙ্গা নেতা) সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাখাইনের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মিয়ানমার সেনাবাহিনী আর আরাকান আর্মিই শুধু অংশীদার নয়, সেখানে রোহিঙ্গা বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীরও তৎপরতা রয়েছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন-আরএসও, আরাকান রোহিঙ্গা সলভেশন আর্মি-আরসা, নবী হোসেনের বাহিনীর তৎপরতা বেশি। ক্যাম্পের বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আরকান আর্মি ও মিয়ানমারের সেনাবাহিনী দুটি পক্ষের সঙ্গেই দ্বন্দ্ব রয়েছে এসব রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর। রোহিঙ্গা নেতা জুবায়ের ওপারে থাকা তার স্বজনদের বরাতে দাবি করেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনী যখন আরাকান আর্মিকে লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালাচ্ছিল, তখন স্থলপথে আরাকান আর্মির সঙ্গে তিনটি রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘর্ষ হয়। তাতে পরিস্থিতি আরও জটিল ও অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। যুদ্ধের তীব্রতা বাড়লে আরো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জুবায়ের। স্কুল এলাকায় বোমা হামলার খবর বান্দরবান শহরে বসবাস করা একটি রাখাইন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। এই পরিবারটির আত্মীয়-স্বজন রাখাইন রাজ্যে আছে। স্বজনদের কাছ থেকে তারা নিয়মিত তথ্য পান। ওই পরিবারের একজন সদস্য রাখাইন রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে বলছিলেন, বুধবার সকালের দিকে রাখাইন রাজ্যে বুচিডং টাইনশিপ এলাকায় জান্তা বাহিনী বিমান হামলা চালায়। এরপর আবার বিকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত মংডু এলাকাতেও দুটি যুদ্ধ বিমান দিয়ে হামলা চালানো হয়। “মংডু এলাকায় জান্তা বাহিনীর বিমান থেকে ২৭টি বোমা ফেলে। এ ছাড়া ছোট আরও অসংখ্য বোমা ফেলে। সেখানে আমাদের আত্মীয়-স্বজনরাও পালিয়ে থাকায় এ ঘটনায় ঠিক কতজন হতাহত হয়েছে বলা যাচ্ছে না। তবে অনেক নিহত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। “এর আগে ২৭ জুন মংডু শহর থেকে এক মাইল দূরে একটা প্রাইমারি স্কুল এলাকায় বড় দুটো বোমা ফেলা হয়। এতে কয়েকজন রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ আহত হয়েছে শুনলাম। কিছু মারাও যেতে পারে।” রাখাইন পরিবারটি জানায়, টেকনাফ-উখিয়ার ওপারেই মিয়ানমারে মংডু টাউনশিপ এলাকা। সেখান থেকে বুচিডং টাউনশিপ এলাকা যেতে লাগে আরও দেড় থেকে দুই ঘণ্টা লাগে। মংডুর টাউনশিপ এলাকায় কোনো বড় কোনো হামলা হলে টেকনাফ-উখিয়া থেকেও বোমার শব্দ শোনা যায়। কিন্তু বুচিডং এলাকায় কোনো ঘটনা ঘটলে শোনা যায় না। বান্দরবান শহরে আরেকটি রাখাইন পরিবারের সঙ্গে কথা হলে তারাও মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিমান হামলার কথা বলেন। তারা আত্মীয়-স্বজনদের মাধ্যমে তিন রোহিঙ্গা নিহতের খবর পেয়েছেন বলেও দাবি করেন। ওই পরিবারের একজন সদস্য বলেন, “রোহিঙ্গা ও রাখাইন মিলে হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। ভয়ে সবাই যে যার মত করে জঙ্গলে নিরাপদে আশ্রয়ে চলে গেছে। আর কোনো যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।” অনুপ্রবেশের শঙ্কায় তৎপর বিজিবি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান বিমান হামলার শব্দ বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী টেকনাফ থেকেও শোনা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিজিবি রামু সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, “বিমান হামলা শুরু হওয়ার পর সীমান্ত এলাকার মানুষ আতঙ্কে রয়েছেন। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, রাখাইনে বড় ধরনের হামলা হলে অনেক রোহিঙ্গা নাফ নদী পার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করে। এ কারণে বিজিবি সীমান্তে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে, যাতে কোনো অনুপ্রবেশের ঘটনা না ঘটে। “নরমালি বিমান হামলা হলে ওখানকার লোকজন আতঙ্কে থাকে। তখন অনেক রোহিঙ্গাই নদী পার হয়ে বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করে। সেই হিসাবে আমরা সতর্ক অবস্থায় আছি।” বিজিবি অধিনায়ক বলেন, “হামলার ঘটনা বুধবার বিকাল থেকে শুরু হয়ে সন্ধ্যার পরও চলছিল। টেকনাফ থেকেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। “বেশ বড় ধরনের বোমা হামলা হয়েছে বলে আমরা বিভিন্ন সূত্রে শুনেছি।” পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং সীমান্তে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে বলেও জানান বিজিবির এই কর্মকর্তা। টেকনাফ-২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হানিফুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, সীমান্ত পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। নাফ নদী ও সীমান্ত এলাকায় টহল ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
