|
ঈদকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে ঢাকাই সিনেমার ব্যবসা, সংকটে সারা বছরের চলচ্চিত্র বাজার
সায়ীদ আবদুল মালিক
|
![]() ঈদকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে ঢাকাই সিনেমার ব্যবসা, সংকটে সারা বছরের চলচ্চিত্র বাজার গত বছর দুই ঈদ মিলিয়ে ১৬টি সিনেমা মুক্তি পেয়েছিল। অথচ এবার শুধু রোজার ঈদেই মুক্তি পেয়েছিল রেকর্ড ১৬টি সিনেমা। চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে চালু সিনেমা হলের সংখ্যা প্রায় ৫০টি। তবে ঈদ উপলে বন্ধ থাকা কিছু হল চালু করা হয়, যার সংখ্যা সর্বোচ্চ দেড়’শ থেকে দুই’শ হতে পারে। তবুও এত সংখ্যক ছবির জন্য পর্যাপ্ত হল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সভাপতি আওলাদ হোসেন উজ্জ্বল বলেন, ঈদ হলো চলচ্চিত্র ব্যবসার প্রধান মৌসুম। তাই এই সময় সবাই ছবি মুক্তি দিতে চান। কিন্তু হলসংখ্যার সীমাবদ্ধতার কারণে সব প্রযোজক লাভের মুখ দেখতে পারেন না। প্রদর্শকরাও তির মুখে পড়েন। তিনি জানান, ঢাকাই চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ১৯৯২ সালের রমজানের ঈদে সর্বোচ্চ ১৩টি ছবি মুক্তি পেয়েছিল। সে সময় দেশে সহস্রাধিক সিনেমা হল ছিল এবং মুক্তিপ্রাপ্ত অধিকাংশ ছবিই ছিল মানসম্মত। ফলে সব ছবিই ব্যবসায়িক সফলতা পেয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি ভিন্ন। সিনেমা হলের সংখ্যা নেমে এসেছে অর্ধশতের কোটায়, আর দর্শকপ্রিয় মানসম্মত ছবির সংখ্যাও সীমিত। প্রদর্শকদের অভিযোগ, বড় বাজেটের ছবিগুলো প্রায় আগেভাগেই ঘোষণা দিয়ে রাখে যে সেগুলো ঈদে মুক্তি পাবে। ফলে অন্য ছবিগুলোর জন্য হল পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে জনপ্রিয় চিত্রনায়ক শাকিব খানের ছবি অধিকাংশ হল দখল করে নেয়। কারণ তার ছবিগুলোকে তুলনামূলকভাবে ব্যবসাসফল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আওলাদ হোসেন উজ্জ্বল বলেন, শাকিব খানের একটি ছবি অনেক সময় দেড়শ’র মতো হল পেয়ে যায়। তখন অন্য ছবিগুলো কয়টি হল পাবে এবং কীভাবে বিনিয়োগের টাকা তুলবে, এটাই বড় প্রশ্ন। চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির প্রধান উপদেষ্টা সুদীপ্ত কুমার দাস বলেন, শুধু ঈদকে কেন্দ্র করে ছবি মুক্তির প্রবণতা চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য দীর্ঘমেয়াদে তিকর। তার ভাষায়, বছরের বাকি প্রায় ১০ মাস ছবির অভাবে অনেক সিনেমা হল কার্যত বন্ধ থাকে। কিন্তু হলের খরচ তো থেমে থাকে না। নির্মাতারা যদি সারা বছর নিয়মিত ছবি মুক্তি দেন, তাহলে প্রযোজক, প্রদর্শক ও দর্শক—সবাই উপকৃত হবেন। প্রদর্শকদের প্রশ্ন, বছরের কেবল দুই ঈদে সিনেমা মুক্তি বাড়লেই কি ঢাকাই চলচ্চিত্রের সুদিন ফিরে আসে? তাদের মতে, বছরের অধিকাংশ সময় যদি হলগুলো নতুন ছবির সংকটে থাকে, তাহলে শিল্পের সামগ্রিক উন্নতি হয়েছে বলা কঠিন। চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সিনিয়র কর্মকর্তা মিয়া আলাউদ্দীন বলেন, ঈদের সময় ছবি মুক্তির েেত্র বিশেষ কোনো সীমাবদ্ধতা না থাকায় অনেক প্রযোজক একসঙ্গে আবেদন করেন। তিনি বলেন, সাধারণ সময়ে সপ্তাহে দুইটির বেশি ছবি মুক্তির নিয়ম নেই। কিন্তু ঈদে এ নিয়ম শিথিল থাকে। ফলে একসঙ্গে অনেক ছবি মুক্তির চাপ তৈরি হয়। প্রদর্শকদের দাবি, ঈদে মুক্তির জন্য জমা পড়া অনেক ছবির মান নিয়েও প্রশ্ন থাকে। কিন্তু নানা তদবির ও প্রতিযোগিতার কারণে হল মালিকরা অনেক সময় বিপাকে পড়েন। এতে দর্শক টানতে ব্যর্থ হলে প্রযোজক ও প্রদর্শক উভয়েই আর্থিক তির মুখে পড়েন। অন্যদিকে মাল্টিপ্লেক্স কর্তৃপও বলছে, তাদের স্ক্রিনসংখ্যা সীমিত হওয়ায় সব ছবি প্রদর্শন করা সম্ভব হয় না। স্টার সিনেপ্লেক্সের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ঈদের সময় এত বেশি ছবি মুক্তির আবেদন আসে যে আমাদের হিমশিম খেতে হয়। আমরা মূলত মানসম্মত ছবিকেই অগ্রাধিকার দিই। কারণ মাল্টিপ্লেক্সের দর্শক ও সাধারণ হলের দর্শকের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তিনি আরও বলেন, সাধারণ মানের ছবি মাল্টিপ্লেক্সে চালালে দর্শক সেগুলো গ্রহণ করেন না। আবার সাধারণ দর্শকদের বড় একটি অংশ বেশি দামের টিকিট কিনে মাল্টিপ্লেক্সে ছবি দেখতে আগ্রহী নন। লায়ন সিনেমা হলের কর্ণধার মির্জা খালেক বলেন, নির্মাতাদের মানসিকতা এখন অনেকটাই উৎসবকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, বছরের বাকি সময়ে পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ছবি না থাকলে সিনেমা হল টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু ঈদনির্ভর মুক্তির সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে সারা বছর পরিকল্পিতভাবে মানসম্মত সিনেমা মুক্তি দিতে পারলেই ঢাকাই চলচ্চিত্র শিল্পে স্থায়ী গতি ফিরে আসতে পারে।
|
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
