সুনামগঞ্জ শহরে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি, টেলিযোগাযোগ স্বাভাবিক
নতুন সময় প্রতিনিধি
প্রকাশ: Sunday, 19 June, 2022, 10:57 PM
সুনামগঞ্জ শহরে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি, টেলিযোগাযোগ স্বাভাবিক
বৃষ্টিপাত না হওয়ায় সুনামগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির দিকে। রবিবার (১৯ জুন) সকাল থেকেই শহরের বিভিন্ন এলাকায় জমে থাকা পানি নামতে শুরু করেছে। এর ফলে লোকজন বাড়ির বাইরে বের হওয়া শুরু করেছে। খুলেছে দোকানপাট। কেউ হাঁটুসমান পানি ডিঙিয়ে, কেউ বা নৌকায় চড়ে প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। প্রায় ৬০ ঘণ্টা পর বিকাল ৫টার দিকে টেলিযোগাযোগ স্বাভাবিক হয়েছে।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, সুনামগঞ্জ পৌর এলাকার হাসন নগর, ষোলঘর, বিলপাড়, নতুন পড়া, মরাটিলাসহ বিভিন্ন এলাকার পানি কমে এসেছে। দুপুরের দিকে আকাশে সূর্য উঠতে দেখা গেছে। তবে বন্যা পরিস্থিতির খানিকটা উন্নতি হলেও খাদ্যসামগ্রী ও সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সন্ধ্যা ৬টার দিকে এই গণমাধ্যমকে ফোন করে জানান, সুনামগঞ্জ সার্কিট হাউজে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু আছে, সেখানে প্রশাসনের কর্মকর্তারা কাজ করছেন। গণমাধ্যমকর্মীরাও তাদের মোবাইলফোন চার্জ করতে পেরেছেন সার্কিটে হাউজে। এর আগে পর্যন্ত টেলিযোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকায় বন্যা পরিস্থিতির সার্বিক খবরাখবর সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো নিরূপণ করা যায়নি। তবে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ত্রাণ বিতরণ করছে। সুনামগঞ্জ সদরে বন্যার্তদের উদ্ধার করতে নিয়োজিত আছে সেনাবাহিনী।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ জানিয়েছে, বন্যার কারণে অনেক মিটার ও এমডিবি বক্স ডুবে থাকায় নিরাপত্তার স্বার্থে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করা হচ্ছে না। বিভিন্ন এলাকার মিটার পরিদর্শন করা হচ্ছে, পানি নেমে গেলে সোমবার বিকালে বিদ্যুৎ চালু করা হতে পারে।
শহরের এসপি বাংলো এলাকা থেকে আজিজুস সামাদ জানান, বিকালে মোবাইল ফোনে নেটওয়ার্ক এসেছে। তবে বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইল চার্জ করা যাচ্ছে না। অনেকেই বিভিন্ন দোকানে ব্যাটারি বা জেনারেটরের মাধ্যমে মোবাইল চার্জ করিয়ে নিয়ে স্বজনদের সাথে যোগাযোগ করতে পেরেছেন। এদিকে বাসায় খাবার ও সুপেয় পানির সংকট দেখা দিয়েছে। গতকাল বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে পান করলেও সেটি শেষ হয়ে গেছে। আজ বৃষ্টি হয়নি।
এর আগে গত বুধবার (১৫ জুন) ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিপাতে সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বৃহস্পতিবার (১৬ জুন) রাতে পানির উচ্চতা বাড়ায় থাকায় একে একে প্লাবিত হতে থাকে সুনামগঞ্জ পৌর শহরের ঘরবাড়ি। বহু ঘরবাড়িতে বুকসমান পানিতে আটকে পড়েন মানুষ। বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটার সাথে সাথে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বিদ্যুৎ সংযোগ। দুর্ঘটনা এড়াতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয় বিদ্যুৎ বিভাগ। বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইল অপারেটরগুলোর টাওয়ারও বিকল হয়ে পড়ে। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ৪টা নেটওয়ার্ক না থাকায় সারাদেশ থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে সুনামগঞ্জ। পানি উপচে তলিয়ে যায় সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক। ফলে সড়কপথেও সুনামগঞ্জে যোগাযোগ স্থাপনের পথ বন্ধ হয়ে যায়।
ওই সময় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ও দেশের বাইরে থেকে সুনামগঞ্জের বাসিন্দারা জানান, শুক্রবার (১৭ জুন) ভোর থেকেই তারা তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। যে নম্বরেই কল করা হচ্ছে সেটিই বন্ধ দেখাচ্ছে। ঘণ্টাখানেক আগেও যার মোবাইলে ৮০ ভাগ চার্জ ছিল, সেই মোবাইলফোন নম্বরটিও অচল দেখাচ্ছে। এ অবস্থায় স্বজনদের নিরাপত্তা নিয়ে তারা ভীষণ দুশ্চিন্তা ও শঙ্কায় পড়েন। টানা বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। তবে শনিবার (১৮ জুন) বৃষ্টি কম হওয়ায় ধীরে ধীরে পানি কমতে শুরু করে।
কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ু বিষয়ক গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ জানান, সিলেটে বা সীমান্তে যে পরিমাণ বৃষ্টি হবে, সে তুলনায় অধিক পরিমাণে পানি সরে যাবে। এতে করে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হবে। আগামীকাল সোমবার (২০ জুন) বন্যা পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রোগ্রামের সমন্বয়ক ও শিক্ষক মুহাম্মদ ফেরদৌস বলেন, ‘দুর্যোগের বেশকিছু স্তর থাকে। পানি সরে গেলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে। যেহেতু সুনামগঞ্জ একেবারেই যোগাযোগবিচ্ছিন্ন ছিল, তাই এখন খাদ্যসামগ্রীর সংকট দেখা দেবে। এখন বিভিন্ন সংগঠন ও সংস্থার পক্ষ থেকে বিভিন্ন এলাকায় যথাসম্ভব সুপেয় পানি ও শুকনো খাবার সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে।’
এদিকে সুনামগঞ্জে বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণের জন্য কাজ করছে মনুষ্যত্ব ফাউন্ডেশন নামের একটি সামাজিক সংগঠন। সংগঠনটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আল-মাহমুদ রাহী জানান, আমরা দলবল নিয়ে অনেক জায়গা ঘুরে খাবার সংগ্রহের চেষ্টা করছি। বাজারে খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে। সাধারণ মানুষের পক্ষে খাবার সংগ্রহ করা সহজ নয়। আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি। এছাড়া বাইরে থেকে যদি কোনো সংগঠন ত্রাণ নিয়ে আসে, তাদের থাকার ব্যবস্থাসহ কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সবধরনের সহায়তা করতেও তৈরি আছে মনুষ্যত্ব ফাউন্ডেশন।
স্বেচ্ছাসেবক আম্মার আহমেদ জানান, সুনামগঞ্জ সদরের সাবেক ইউএনও ইয়াসমিন নাহার রুমা ও দক্ষিণ সুনামগঞ্জের সাবেক ইউএনও জেবুন নাহার শাম্মীর সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়েছে। প্রশাসনের এই দুই কর্মকর্তা ব্যক্তিগত উদ্যোগে খাদ্যসহায়তা পাঠাচ্ছেন। এছাড়া বিভিন্ন সংগঠন মাঠে আছে। বন্যার পানি অনেকটাই কমে এসেছে।
গতকাল শনিবার (১৮ জুন) ফেসবুক লাইভে সুনামগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতি বর্ণনা করেন সাংবাদিক দেওয়ান গিয়াস চৌধুরী। একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের নিজস্ব প্রতিবেদক হিসেবে কর্মরত এই সাংবাদিক বলেন, বন্যার পানির চেয়েও এখন বড় সংকট খাদ্যের ঘাটতি। দোকানে খাবার নেই। ঢাকায় বা অন্যান্য স্থানে থাকা সকলকে এই বিষয়ে ফেসবুকে লেখালেখির অনুরোধ জানান তিনি। খাদ্যসংকট মোকাবেলায় সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের কথা বলেন। ব্যাপক পরিমাণে সুপেয় পানি, শুকনো খাবার ও পানি বিশুদ্ধকরণ বড়ির প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
এদিকে গত বৃহস্পতিবার (১৬ জুন) রাতে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার সময়ে ফেসবুক মেসেঞ্জারে 'ফ্লাড ২০২২ ইনফরমেশন' গ্রুপ তৈরি করেন সুনামগঞ্জের বাইরে থাকা তরুণরা। সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা, পুলিশ ও প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ, সাংবাদিকদের সঙ্গে সংযোগের চেষ্টার পাশাপাশি তারা বন্যার্তদের একটি ডাটাবেজ তৈরি করেছেন। এখন ত্রাণ বিতরণের জন্য অর্থ সংগ্রহ চলছে। গ্রুপের মডারেটর রবিন আহমেদ বলেন, উদ্ধারকারী কোনো সংগঠন বা ত্রাণ নিয়ে স্বেচ্ছাসেবীরা এই মুহূর্তে সুনামগঞ্জে গেলেও কর্মপরিকল্পনা সাজাতে তাদের বেগ পেতে হবে। আমরা বিভিন্ন এলাকার বন্যার্ত বা বিপদগ্রস্ত এবং খাদ্যের ঘাটতিতে থাকা লোকজনের একটা ডাটাবেজ তৈরি করেছি। কেউ আমাদের সঙ্গে ০১৬১৯৯৫৯৭২২ নম্বরে যোগাযোগ করলে আমরা সেই ডাটাবেজ সরবরাহ করব। এছাড়া যোগাযোগ করে যে কেউ রকেট, বিকাশ বা নগদের মাধ্যমে সাহায্য পাঠালে আমরা তা বন্যার্ত পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছে দেবো।
গ্রুপের সদস্য তাপসী দে প্রাপ্তি জানান, সুনামগঞ্জের কালীপুরে ভীষণভাবে দুর্ভোগে পড়া অন্তত ২০টি পরিবারের জন্য সাধ্যমতো চিড়া, মুড়ি, গুড়, মোমবাতি, লাইটার ও মেয়েদের স্যানিটারি ন্যাপকিন কেনা হচ্ছে। আরও অর্থসহায়তা পাওয়া গেলে বেশিসংখ্যক পরিবারকে সাহায্য করা সম্ভব হবে। ইতোমধ্যেই কিছু টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় জানিয়েছে, বন্যাকবলিতদের উদ্ধারের পাশাপাশি খাদ্যসামগ্রী বিতরণ চলছে। ৪ লক্ষ মেট্রিক টন চাল ও অন্যান্য শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। সব আশ্রয় কেন্দ্রে রান্না করা খাবার দেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন ও সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র নাদের বখত মাঠে রয়েছেন। তারা বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শনের পাশাপাশি ত্রাণ নিয়ে ছুটে যাচ্ছেন। রবিবার সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট পীর ফজলুর রহমানও ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম শুরু করেছেন। এরবাইরে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কাজ করছে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদেরও এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে সুনামগঞ্জবাসী।