দৈনিক সময়ের আলোর সিনিয়র রিপোর্টার হাবীব রহমানের ‘রহস্যজনক’ মৃত্যুর ঘটনায় সন্দেহভাজন ১৭ জনকে নজরদারিতে রেখেছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। হাবীব রহমানের মৃত্যুর ২০ দিন পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই পুলিশের তদন্তে। মৃত্যুরও কোনো কারণ বা ‘রহস্য’ উদঘাটন করতে পারেনি তারা। এমনকি ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পাওয়া যায়নি। তবে মামলার নতুন তদন্তকারী কর্মকর্তা হাতিরঝিল থানার এসআই শরীফুল ইসলাম সোমবার সময়ের আলোকে বলেন, ১৭ জনকে তারা নজরদারিতে রেখেছেন। মামলার তদন্তের স্বার্থে কারও নাম প্রকাশ করেননি তিনি।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঘটনার ওই রাতে হাবীব রহমান কোথায় ছিলেন, তার সঙ্গে কে ছিলেন এবং হাবীবের সঙ্গে তাদের কোনো দ্বন্দ্ব ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ১৭ জনের তালিকা পেয়েছে তদন্তকারীরা। তাদের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। এমনকি তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। এখন ময়নাতদন্ত রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছে তদন্তকারীরা। গতকাল পর্যন্ত ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পুলিশকে দিতে পারেনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। গতকাল ফরেনসিক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মাকসুদ সময়ের আলোকে বলেন, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট প্রায় সম্পন্ন। অল্প সময়ের মধ্যেই পুলিশের কাছে রিপোর্ট প্রদান করা হবে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, হাবীব রহমানের রক্তাক্ত দেহ যেখানে পরে ছিল সেখানে আরও একটি মোটরসাইকেলে দুজন লোক ছিল। তারা ওই মোটরসাইকেল ও দুই আরোহীকে শনাক্ত করার চেষ্টা করছে। ওই সূত্র আরও জানায়, প্রত্যেক্ষদর্শীদের বর্ণনায় তারা জানতে পেরেছেন, মোটরসাইকেলের দুই আরোহীর বয়স ২৫ থেকে ৩০ বছর। সিসি ক্যামেরার ফুটেজে বেলচা হাতে যাদের দেখা গেছে তাদের সঙ্গে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
হাবীব রহমানের ‘রহস্যজনক’ মৃত্যুর ঘটনায় ১৫ দিন পর মামলার প্রথম তদন্তকারী কর্মকর্তা হাতিরঝিল থানার এসআই মাসুদ খলিফাকে বদলি করা হয়েছে ডিএমপির মতিঝিল থানায়। ওই ১৫ দিনে মামলার কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেননি তিনি। এমনকি মামলার বাদী আবু তাহের তারু ও নিহত হাবীব রহমানের স্ত্রীর সঙ্গেও কোনো যোগাযোগ করেননি। হাবীব রহমানের পরিবার ও সাংবাদিক নেতারা সন্দেহ প্রকাশ করে আসছেন তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হাতিরঝিল থানার এসআই শরীফুল ইসলাম গতকাল সময়ের আলোকে বলেন, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর মূল রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হবে। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে যদি হত্যাকাণ্ডের কোনো আলামত পাওয়া যায় তাহলে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হবে। তিনি বলেন, আমরা বেলচা পার্টিকে শনাক্ত করার চেষ্টা করছি। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
হাবীব রহমানের ‘রহস্যজনক’ মৃত্যুর ঘটনায় ইতোমধ্যে সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি চত্বরে মানববন্ধন করেছে কুমিল্লা সাংবাদিক ফোরাম, ঢাকা। মানববন্ধনে সাংবাদিক নেতারা বলেন, হাবীব রহমানের মৃত্যুকে ঘিরে নানা প্রশ্ন ও সন্দেহ দেখা দিয়েছে। এটা নিছক দুর্ঘটনা নয়, হাবীব রহমানকে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হতে পারে। দ্রুত তদন্ত করে তার মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করার দাবি জানিয়েছেন সাংবাদিক নেতারা।
এ ছাড়াও হাবীব রহমানের অকালমৃত্যুতে শোকসভার আয়োজন করে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) সভায় সাংবাদিক নেতারা হাবীব রহমানের মৃত্যু রহস্যজনক বলে দাবি করা হয়। শোক সভায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল হানিফ বলেন, হাবীব রহমানের মৃত্যুতে বিভিন্ন মহলের প্রশ্ন ওঠায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও ডিএমপি কমিশনার মুহা. শফিকুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলে মামলাটি সুষ্ঠু তদন্তের জন্য কথা বলবেন বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
উল্লেখ্য, গত ১৮ জানুয়ারি গভীর রাতে রাজধানীর হাতিরঝিল সিদ্দিক মাস্টারের ঢাল নামক এলাকায় হাবীব রহমানের রহস্যজনক মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় পুলিশের ধারণা হাবীব রহমানের মৃত্যু দুর্ঘটনার কারণে হয়েছে। ঘটনার পর হাতিরঝিলে বিভিন্ন সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে ঘটনাস্থলে ফুটেজটি অকার্যকর দেখা যায়। অপর কয়েকটি ফুটেজে ঘটনাস্থল থেকে তিন যুবককে বেলচা হাতে হেঁটে যাওয়ার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করা হলে অনেকেই এটি হত্যাকাণ্ড বলে মন্তব্য করেছেন।