‘আল হারামাইন’ বিশ্বজুড়ে এই সুগন্ধিতে মুগ্ধ মানুষ। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বে মানে মধ্যপ্রাচ্যে এর সুবাস ছাড়া চলেই না। কিন্তু জানেন কি এই আতর ও পারফিউম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার একজন বাংলাদেশি! আর সুগন্ধি তৈরির কাঁচামাল আগর গাছের বাগান সিলেটে! হ্যাঁ, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, সৌদি আরব, কাতারসহ ৬৫টি দেশে আল হারামাইনের খুশবু খুঁজতে খুব একটা সময় লাগবে না। বিশ্বের সবচেয়ে দামি পারফিউম ও আতর এটি। যার দাম সর্বনিম্ন হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত। এর কারখানা সংযুক্ত আরব আমিরাতের আজমান প্রদেশে। যেখানে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে টাইগারদের ব্যাট-বল হাতে সুবাস ভক্ত-সমর্থকদের মন ভরিয়ে দেয়ার কথা। কিন্তু হচ্ছেটা কই! অবশ্য তারা না পারলেও বাংলাদেশের আল হারামাইন তার ঘ্রাণের জাদুতে ১৯৭০ থেকে এখন পর্যন্ত প্রাণ জুড়িয়ে রেখেছে।
বিশ্বকাপ কভার করতে এসে দুবাইয়ে এই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার সিলেটের সন্তান মাহতাবুর রহমানের আমন্ত্রণে যাওয়া হয় বিখ্যাত সেই কারখানায়। তবে টাইগারদের টানা হারে এই পরিদর্শনের আগে সবারই মন খারাপ। বিশেষ করে কারখানার বাংলাদেশি কর্মীদের মুখে একটাই প্রশ্ন কেন এমন খেলছে বাংলাদেশ! মাহতাবুল রহমানও জানালেন তিনি আর খেলা দেখবেন না। তিনি বলেন, ‘যেভাবে বাংলাদেশের পিছু নিয়েছে হার, আর খেলা দেখে কি হবে!’
আরব আমিরাতের বাণিজ্যিক নগরী আজমানের অবস্থান। সেখানেই বাংলাদেশের সুনাম আর সুবাস ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে দুই লাখ বর্গফুটের আল হারামাইনের কারখানা। ভেতরে ঢুকতেই আতর আর নানা রকম দামি পারফিউমের সুগন্ধ ছড়ালো নাকে। গোটা কারখানাজুড়ে কাজে ব্যস্ত বাংলাদেশসহ ভিন্ন ভিন্ন দেশের নাগরিকরা। বিশাল এক কর্মযোগ্য চলছে সুগন্ধি নিয়ে। হাতে আর সয়ংক্রিয় মেশিনে ভরা হচ্ছে নানা রকম পারফিউম আর আতরের বোতল। যদিও এই আল হারামাইন যাত্রা শুরু হয়েছিল সৌদি আরব থেকে। মাহতাবুল রহমানের পিতা সেখানে ছোট্ট পরিসরেই আতরের কারখানা শুরু করেন। পরে ১৯৭০ এ পিতার অবর্তমানে আরব আমিরাতে এসে এই সুগন্ধি ব্যবসার প্রসার ঘটান। তিনি বলেন, ‘সৌদি আরবে আমার বাবা প্রথম এই ব্যবসা চালু করেন। আপনাদের জানিয়ে রাখছি মক্কা ও মদিনাকে একত্রে বলা আল হারামাইন। সেখান থেকেই এই নাম। ১৯৮০ দিকে দুবাইয়ের আমি এই প্রতিষ্ঠানের প্রসার শুরু করি। ১৯৯১ এ কুয়েত যুদ্ধের সময় আমি আজমানে কারখানা স্থাপনের অনুমতি পাই। তবে আমি দুবাইয়ের যে শেখ তাকে বললে যেন আমার নামেই জায়গাটা তিনি কিনে নেয়ার অনুমতি দেন। তিনি আমার কথায় রাহি হয়ে এখানকার পৌরসভাকে জায়গাটি আমার নামে করে দেয়ার জন্য আদেশ দেন।’
অন্যদিকে আল হারামাইনের আতর কেন এত সমাদৃত তা জানান প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। তিনি বলেন, ‘দেখেন আমরা (বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানের মানুষ) কিন্তু নিয়মিত আতর বা সুগন্ধি ব্যবহার করি না। কিন্তু সৌদি আরব থেকে শুরু করে আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ এগুলো প্রতিদিন ব্যবহার করে। কাজে বের হওয়ার সময় সেটি সকাল-রাত যখনই হোক তারা সুগন্ধি গায়ে মাখে। ঘরে ঘরে ধূপ বা উদ এখানে ব্যবহার হয় প্রতিদিন।’ জানা গেল এই আতর আসলে তৈরি হয় আগর গাছের ছাল দিয়ে। যার বড় একটি বাগান রয়েছে সিলেটের বড়লেখাতে। এ ছাড়াও এই আগর গাছ পাওয়া যায় ইন্দোনেশিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশে। মূলত এই গাছের ছাল সংগ্রহ করে নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সেটি শুকিয়ে শেষ পর্যায়ে মেশিনে এর থেকে তেল বের করা হয়। আর তা দিয়েই তৈরি হয় পৃথিবীর সবচেয়ে দামি আতর।
আল হারামাইন কারখানাতে বাংলাদেশি শ্রমিকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এক কথায় এখানে দেশীয় কর্মসংস্থানের দারুণ সুযোগ। তবে আরব আমিরাতের শ্রম আইন অনুসারেই তারা তেমন ভোগ করে। যা সব দেশের শ্রমিকদের জন্য প্রযোজ্য। কারখানা দেখতে গিয়েও শুনতে হয় টাইগারদের নৈপুণ্য প্রসঙ্গে। বাংলাদেশ থেকে আসা ক্রীড়া সাংবাদিক শুনেই তাদের প্রশ্নের বান শুধু মাহমুদুল্লাহদের হার নিয়ে। বিশেষ করে তারা যেন বিশ্বাসই করতে পারছেন না এমন ভাবেও হারতে পারে টাইগাররা!