যুক্তরাষ্ট্র থেকে অ্যাপাচি ও ক্ষেপণাস্ত্র কিনছে বাংলাদেশ
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Tuesday, 5 November, 2019, 8:58 AM সর্বশেষ আপডেট: Tuesday, 5 November, 2019, 10:31 AM
যুক্তরাষ্ট্র থেকে অ্যাপাচি ও ক্ষেপণাস্ত্র কিনছে বাংলাদেশ
উন্নত অস্ত্র ক্রয় করতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা শুরু করেছে বাংলাদেশ। এটিকে চীনের জন্য বড় ধরনের আঘাত বলে মনে করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, ঐতিহ্যগতভাবে চীনই বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামের বৃহত্তম সরবরাহকারী।
বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীকে ২০৩০ সালের মধ্যে আধুনিক করার বৃহত্তর প্রয়াসের অংশ হিসেবে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে ক্রয় করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের দেয়া এক বিবৃতি হাতে এসেছে নিক্কেই এশিয়ান রিভিউ’র হাতে। তাতে বলা হয়েছে, আমরা বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর লক্ষ্য ২০৩০ সমর্থন করি। কারণ বাংলাদেশ তার সামরিক সরঞ্জামের আধুনিকায়ন করতে চায়।
বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে ভারত, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও দক্ষিণ কোরিয়া প্রধান অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহকারী হিসেবে রয়েছে।
তবে চীন হলো বাংলাদেশের বৃহত্তম সরঞ্জাম সরবরাহকারী। তবে ১৯৯০-এর দশক থেকে মার্কিন অস্ত্র সরবরাহ ধীরে ধীরে বাড়ছে। ২০১০ সাল থেকে ৯ বছরে তা বেড়ে হয়েছে ১১০ মিলিয়ন ডলারে। তবে চীনের কাছ থেকে ২০১০-এর দশকে কেনা ১.৯২ বিলিয়ন ডলারের হিসাবটি করলে তা কমই মনে হবে বলে জানিয়েছে স্টকহোক ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশ দুটি চুক্তি সই করার দিকে এগুতে থাকার প্রেক্ষাপটে চীনের সাথে থাকা দীর্ঘ দিনের সম্পর্কে পরিবর্তন আসতে পারে শিগগিরই। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যে দুটি চুক্তি হতে পারে সেগুলো হচ্ছে: একুইজিশন অ্যান্ড ক্রস সার্ভিসিং এগ্রিমেন্ট বা এসিএসএ এবং জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন এগ্রিমেন্ট বা জিএসওএমআইএ। দুই দেশের মধ্যে আরো ঘনিষ্ঠ সামরিক সহযোগিতার দীর্ঘ মেয়াদি লক্ষ্যে অংশ হিসেবে এসব চুক্তি হচ্ছে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, এসব চুক্তি আরো বড় দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা সহযোগিতার ভিত্তি রচনা করে বাংলাদেশ ও এই অঞ্চলের জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার আমাদের পারস্পরিক স্বার্থ নিশ্চিত করবে।
তিনি বলেন, একটি লাভ হবে এই যে এতে করে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম হস্তান্তরে আমাদের সামর্থ্য ব্যাপকভাবে বাড়াবে। ফলে এই অঞ্চলে আমাদের পারস্পরিক স্বার্থ ও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিতে সহায়তা করবে।
তিনি বলেন, এসব চুক্তি সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ইস্যুগুলোর পাশাপাশি মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ ত্রাণ, শান্তিরক্ষা, প্রতিরক্ষা বাণিজ্য, সামরিক সহযোগিতা ও সন্ত্রাস প্রতিরোধের মতো ক্ষেত্রগুলোতে বাংলাদেশের সাথে আমাদের অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণ করতে আমাদের আগ্রহের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ওই কর্মর্তা বলেন, এক থেকে দুই বছরের মধ্যে এসিএসএ এবং দুই থেকে চার বছরের মধ্যে জিএসওএমআইএ চুক্তি সই হতে পারে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ দুটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ও কিছু ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা কিনতে আগ্রহ দেখিয়েছে। তিনি এসবের মূল্য প্রকাশ করেননি।
বাংলাদেশ মনে করে, পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক পরিবেশের কারণে সামরিক বাহিনীকে আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইন্টার সার্ভিস পাবলিক রিলেশন্স ডিরেক্টরেটের পরিচালক আবদুল্লাহ ইবনে জায়েদ বলেন, নতুন যুগের সাথে তাল মেলানো প্রয়োজন আমাদের। তিনি বলেন, আমরা সামরিক বাহিনীকে আধুনিকায়ন না করলে পেশাদারিত্বের বিকাশ ঘটাতে পারব না।
যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ক্রয়ের ফলে চীন ক্ষুব্ধ হবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটি কাউকে খুশি করা বা কাউকে অখুশি করার জন্য গ্রহণ করা হয়নি। আমরা আগেও যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অস্ত্র কিনেছি। চীনের সাথেও আমাদের চুক্তি আছে।
জায়েদ বলেন, বাংলাদেশ মানের ব্যাপারে আপস না করেই আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে সবচেয়ে কম দামে সরঞ্জাম কেনে।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য সামরিক সহযোগিতা বাড়ছে। গত বছর উপকূলীয় এলাকায় টহল দেয়ার জন্য বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কাছে ৫টি টহলবোট বিক্রি করেছ যুক্তরাষ্ট্র ৫.৩ মিলিয়ন ডলারে।
তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রশিক্ষণ কোর্সে বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর ২৩৩ সদস্যকে পাঠানোর জন্য ৩.৩ মিলিয়ন ডলার দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
জিএসওএমআইএ হলো এমন এক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি, যার ফলে গোপন সামরিক গোয়েন্দা তথ্য আদানপ্রদান করা সম্ভব হবে। দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটিসহ ৭৬টি দেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের চুক্তি রয়েছে।
আর এসিএসএর লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্র ও এর অংশীদার দেশের বাহিনীর মধ্যে অভিন্ন ধরনের লজিস্টিক সাপোর্ট, সরবরাহ, সার্ভিস নিশ্চিত করা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এসিএসএর মাধ্যমে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজগুলো বার্ষিক প্রশিক্ষণ মহড়ায় অংশগ্রহণের সময় বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর কাছ থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারবে।
ভারত ও শ্রীলঙ্কাসহ শতাধিক দেশের সাথে এসিএসএ চুক্তি সই করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশের বিকাশমান অর্থনীতি ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে তার সামরিক শক্তি বাড়ানো প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক দেলাওয়ার হোসাইন বলেন, বঙ্গোপসাগরের গুরুত্ব হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ায় সামরিক সরঞ্জামের মান উন্নত করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের জন্য। তাছাড়া চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বিশ্বজুড়ে এই অঞ্চলের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে।
তিনি বলেন, এটি একটি বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক বাড়ানোর এটি একটি নতুন ক্ষেত্র।
গত বছর বাংলাদেশ সামরিক সরঞ্জাম কেনার জন্য ভারতের সাথে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছিল।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চুক্তির ফলে চীন কী প্রতিক্রিয়া দেখায়, তা দেখার বিষয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সহযোগী অধ্যাপক শেখ শামস মোরসালিন বলেন, বাংলাদেশ চায় ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে। এ কারণেই সে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী। নিক্কেই