ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
শনিবার ২৭ জুন ২০২৬ ১২ আষাঢ় ১৪৩৩
‘আমাকে চেনার দরকার নেই, আমি তোমাদেরই লোক’
ফারাহ্ দীবা
প্রকাশ: Thursday, 31 October, 2019, 4:32 PM

‘আমাকে চেনার দরকার নেই, আমি তোমাদেরই লোক’

‘আমাকে চেনার দরকার নেই, আমি তোমাদেরই লোক’

লন্ডনে যাওয়ার পর প্রথমে উঠেছিলাম পপলারে, হাসবেন্ডের বন্ধুর ফ্ল্যাটে। সেইখানে ছিলাম প্রায় তিন মাস, পরে সায়মনের স্কুল ডকল্যান্ডে হওয়ায়, বাসা ভাড়া নিয়ে ডকল্যান্ডে চলে আসি, সেখান ছিলাম দেশে আসার আগ পর্যন্ত।

সেই সময়টার প্রথম দিকে লন্ডনের রাস্তা ঘাট, মার্কেট কিছুই চিনি না! রাস্তা হারিয়ে ফেলার ভয়ে, ঘর থেকেও বের হই না এমন অবস্থা! সায়মনের বাবা বললো, 'এভাবে ঘরে বসে থাকলেতো তোমার শেকড় গজিয়ে যাবে! ঘর থেকে বের হও, সামনে পার্ক আছে ছেলেটাকে নিয়ে বিকালে একটু বের হও, আমি কাজে চলে যাই, সারাদিনতো তোমাদের সময় দিতে পারছি না, রাস্তার ওপারেই ইন্ডিয়ান গ্রোসারি শপ আছে। দরকার পড়লে সেখান থেকে কেনাকাটা কর।' যাই হোক, আস্তে ধীরে ঘর থেকে বের হওয়া শুরু আর কি! ঘরের কাছের ইণ্ডিয়ান দোকান থেকেই মাঝে মধ্যে টুকটাক কেনাকাটা চলছে।

গ্রোসারি শপটায় যাওয়ার পথে বিশাল একটা ম্যাপেল গাছ। প্রায়ই দেখতাম গাছের নীচে কয়েকটি প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে খোশমেজাজে কিছু লোকজন আড্ডা দিচ্ছে। আমি এটাকে স্বাভাবিকই ভেবেছি। ভেবেছি, অবসর সময় তারা হয়তো এখানে বসে আড্ডা দিচ্ছেন। একদিন কেনাকাটা করে বাড়ি ফিরছি,

পেছন থেকে একজন লোক বললেন, 'এক্সকিউজ মি, তোমাকে তিনি ডাকছেন।'

আমি বললাম, কে ডাকছে?

লোকটা বললেন, 'ঐ যে গাছের নীচে প্লাস্টিকের চেয়ার বসে আছেন, সোনালি চুলের তিনি।'

আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, তাকেতো আমি চিনি না, আমাকে কেনো ডাকছেন?
লোকটা হেসে বললেল,' তোমার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে তুমি ভয় পেয়েছো, গিয়েই দেখো না, তিনি কি বলেন!'

ভাবলাম ঠিক আছে আগে গিয়ে শুনি তিনি কি বলেন। কাছে যেতেই তিনি আমার সাথে হ্যান্ডশেক করে বললেন, 'তোমার যদি তাড়া না থাকে তো একটু বোসো তোমার সাথে একটু গল্প করি।'

আমিতো মনে মনে বিরক্ত! ভাবছি, কত্তো বড় বজ্জাত বেটা, রাস্তায় একলা একটা মহিলা পেয়েছে, তাই এখন খাজুইরা গল্প করার ধান্দা করছে! বিদেশেও তবে আমাদের দেশের বজ্জাত লোকের মতো বজ্জাত আছে! গায়ে পড়ে আলাপ জুড়ানোর কায়দা করছে!

আশ্চর্য হয়ে দেখলাম, এই লোকটা আমার মনের কথাগুলো পড়ে ফেলেছেন!

তিনি হেসে বললেল, "তোমাকে বিরক্ত করবার জন্য আমি খুবই দুঃখীত। তবে, তোমার সাথে পরিচিত হবার জন্যই তোমাকে ডেকে আনলাম। আমার নাম ফিজ জিমপ্যাট্রিক। তোমার নাম? তুমি কি ইন্ডিয়ান?"

বললাম, ফারাহ্ দীবা, না ইন্ডিয়ান না বাংলাদেশী।

তিনি বললেন, "আমি ভাবলাম ইন্ডিয়ান, এতো চমৎকার নাম তোমার কে রেখেছেন? জানো নিশ্চয়ই এটা কার নাম?"

বললাম, আমার আম্মা রেখেছেন, ইরানের রাজা রেজা শাহ পাহলভির স্ত্রীর নাম ছিল ফারাহ দীবা। ততক্ষণে এই মানুষটাকে আমার মনে হয়েছে, বন্ধুবৎসল উপকারী কোন প্রতিবেশী। এভাবে তাঁর সাথে পাঁচ মিনিটের জায়গায় সময় গড়ালো প্রায় আধ ঘন্টা! দেখলাম, আমাদের দেশটার সম্মন্ধে তিনি বেশ ভালো জানেন। আমি কি করছি, কতটুকু লেখাপড়া করেছি, কয়জন সন্তান, স্বামী কি করে, দেশে কে কে আছেন। বাবা-মা কি করেন, হাসি গল্পচ্ছলে এসব তিনি জানতে চাইলেন। আমারও তাঁকে একজন ভদ্রলোক বলেই আমিও গল্পে স্বাভাবিক হয়ে এসেছি। তিনি কফি কেক খাওয়ালেন।

তিনি বললেন, "তুমি এই এলাকায় নতুন বলেই তোমাকে ডেকে এনে তোমার সাথে পরিচিত হলাম। পরিচিত হতে পেরে খুবই ভালো লাগছে, তোমার যে কোন দরকার বা সমস্যা হলে আমাকে জানিও, আমি তোমার পাশে আছি। এই এলাকা তোমার, তুমি বুক ফুলিয়ে চলবে কেমন।"

আমি বললাম, আমার কোন সমস্যা তোমাকে বলার জন্য, তোমাকে কোথায় পাবো?

তিনি বললেন, "কেনো, দেখছো না, প্রতিদিন বিকেলে এই গাছের তলাতেইতো আমাকে দেখো বসতে। এখানেই পাবে। আর না পেলেও আশপাশে খোঁজ করলেই আমাকে পাবে।"

আমি তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়িতে ফিরলাম। এরপরও বহুবার তাঁর সাথে দেখা হয়েছে, ঐ ম্যাপেল গাছের নীচে চেয়ারে বসা অবস্থায়। কখনো দেখেছি একাএকা কফির কাপ হাতে, কখনো দেখেছি দু'চারজনের সাথে গল্পে হেসে গড়িয়ে পড়ছেন, আবার কখনো দেখেছি গালে হাত দিয়ে মনোযোগ দিয়ে কারো কথা শুনছেন। মাঝেমধ্যে ডেকে নিয়ে খুব সহজভাবে বলেছেন, "ফারাহ আজ খুব ঠান্ডা পড়েছে, তোমাকে এককাপ কফি খাওয়াতে চাইলে, তুমি কি খাবে?" এমন আপনজনের মতো কথা বললে কেউ কি না করতে পারে? আসা যাওয়ার পথে চোখাচোখি হলে ভুরু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করেছেন, "ফারাহ্, কেমন আছো, সব ভালো যাচ্ছে তো?"

এভাবেই মাসগুলো পার হচ্ছিল। ততদিনে পপলার এলাকাটা মোটামুটি পরিচিত হয়ে উঠেছে। সায়মনকে ডকল্যান্ডের আর্নহেম ওয়ার্ফ স্কুলে ভর্তী করিয়ে, ওখানেই বাসা ভাড়া নিয়ে চলে যাবার প্রস্তুতি চলছে। ক্রিসমাস সামনেই, পুরা বৃটেন আলো ঝলমলে সাজে। আমার মনটা খারাপ হয়ে আছে এলাকাটা ছেড়ে যেতে হবে মনে করে। পরিচিত এলাকা ছেড়ে আবার নতুন এলাকা! ইন্ডিয়ান গ্রোসারি শপে যেতে ম্যাপেল গাছটার পাশ দিয়েই যেতে হয়। খেয়াল করলাম বেশ কয়েকদিন ধরে গাছের নীচের চেয়ারগুলো ফাঁকা! পরিচিত মানুষ কয়েকজন নাই! এলাকাটা ছেড়ে যাবো, অথচ চমৎকার উপকারী এই বন্ধুর সাথে দেখা না করে, একটু বিদায় নিয়ে যাবো না এটা কেমন করে হয়! কোথায় পাই তাঁকে, আমাকে তিনি তাঁর মোবাইল নাম্বার একটা কাগজে লিখে দিয়েছিলেন, সেটা কোথায় রেখেছি তাও খুঁজে পেলাম না! নিজের উপর বিরক্ত হয়ে, গ্রোসারি শপে হাজির হয়ে, সেলস ম্যানকে বললাম, ভাই সামনের সপ্তাহে ডকল্যান্ডে চলে যাচ্ছি, তোমার দোকানে অনেক কেনাকাটা করেছি, তাই তোমার কাছ থেকে বিদায় নিতে এসেছি। আচ্ছা, ঐ যে ম্যাপেল গাছের নীচে মাঝে মধ্য বসেন, ফিজ জিম নামের মানুষটা, তাঁকে দেখছি না বেশ কয়েকদিন ধরে, তিনি কোথায় তাকি জানো?

দোকানীর কথা শুনে আমার তখন আকাশ থেকে পড়ার অবস্থা!

তিনি বললেন, "ও, আমাদের এমপির কথা জিজ্ঞেস করছো?"
আমি বললাম, না, এমপির কথা না। রোজ বিকেলে ম্যাপেল গাছের নীচে বসে গল্প করা, সোনালী চুলের ভদ্রলোকটা, তাঁর কথা জানতে চাইছি!

দোকানী, "হ্যা আমিওতো তাঁর কথাই বলছি। তিনিই আমাদের এই এলাকার এমপি ফিজ জিমপ্যাট্রিক। আর কয়েকদিন পরই ক্রিসমাস, তিনি হয়তো পাশের কোন এলাকায় সময় দিচ্ছেন। তোমার কোন দরকার হলে তাঁর অফিসে চলে যাও সকালের দিকে, কোন এ্যাপয়েনমেন্ট লাগবে না। তিনি সবার সাথেই দেখা করেন, কথা বলেন, শোনেন, কারো কোন সমস্যা হলে সেই সমস্যা সমাধানের জন্য সর্বোচ্চ সহায়তা করেন। "

কথাগুলো হজম করতে আমার বেশ সময় লাগলো! নিজকে কেমন জানি বোকা বোকা লাগছিলো! কেমন মানুষ আমি! একদিনও বুঝতে পারিনি তিনিই এই এলাকার জনপ্রতিনিধি! আর আমারই বা দোষ কোথায়, তিনিতো শুধু তাঁর নাম বলেছেন, তাঁর পদবী, তাঁর অতিসাধারণ চলাফেরা, তাঁকে আমিই বা কেমন করে চিনবো! এগুলো নিজকে নিজে বলে সান্ত্বনা দিতে দিতে বাসায় এলাম।

ডকল্যান্ডে শিফট করার আগে তাঁর সাথে দেখা করতে তাঁর অফিসে গেলাম। তিনি আমাদের সাদরে গ্রহণ করলেন, তাঁকে আমি চিনতে পারিনি বলায়, তিনি মুচকি হাসলেন।

তিনি বললেন, "আমাকে চেনার দরকার নেই। আমি তোমাদেরই লোক, তোমাদের কাজ করার দায়িত্ব পেয়ে আমি ধন্য। তোমাদের সামান্যতম কাজেও যদি আমি লাগি, তবেই আমার কাজের সার্থকতা, জীবন ধন্য। অন্য এলাকায় যাচ্ছো, ভালো কথা, দরকার পড়লে এসো, আমি আমার সাধ্যমতো সহায়তা করার চেষ্টা করবো। আমার দরোজা সবার জন্য সব সময় খোলা।"

মাননীয় ফিজ জিমপ্যাট্রিক এমপি মহোদয়, আপনার প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালবাসা। আপনি যতো দূরেই থাকুন না কেনো, প্রার্থনা করি আল্লাহ আপনাকে সুস্থ রাখুন এবং দীর্ঘ জীবন দান করুন

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status