|
করমুক্তির অধিকার কার—দারিদ্র্যের, নাকি জাতিগত পরিচয়ের?
ব্যারিস্টার কাজী ইসতিয়াক হোসাইন জিসান
|
![]() করমুক্তির অধিকার কার—দারিদ্র্যের, নাকি জাতিগত পরিচয়ের? একইভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী সার্কেল চিফ রাজা দেবাশীষ রায় দীর্ঘদিন ধরে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অধিকারভিত্তিক ব্যবস্থার পক্ষে কথা বলে আসছেন। অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় টিকিয়ে রাখতে বিশেষ সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে বর্তমান বাস্তবতায় এই অন্তর্ভুক্তিমূলক ধারণাকে কেবল জাতিগত পরিচয়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৯(৩)(ক) অনুচ্ছেদে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য বিশেষ ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। এখানে কোনো নির্দিষ্ট জাতি, ধর্ম বা গোষ্ঠীকে নয়; বরং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রীয় সহায়তা প্রদানের নীতিই প্রতিফলিত হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রীয় সুবিধা প্রদানের মানদণ্ড হওয়া উচিত ভৌগোলিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং সামাজিক প্রান্তিকতা। এই বিবেচনায় দেশের বিভিন্ন দুর্গম ও অনগ্রসর অঞ্চলকে ‘ইকোনমিক্যালি ডিপ্রেসড জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাশাপাশি রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চল, সিলেটের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকা, উপকূলীয় দ্বীপাঞ্চল, চরাঞ্চল কিংবা নদীভাঙনকবলিত জনপদগুলোকেও একই নীতির আওতায় আনা সম্ভব। কারণ এসব অঞ্চলের মানুষও উন্নয়ন ও সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে সমতলের মানুষের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যায়, সেখানে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ বাঙালি। তারাও একই ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা, যাতায়াত সংকট ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। ফলে কেবল জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে কর সুবিধা নির্ধারণ করা হলে একই পরিবেশে বসবাসকারী অন্য জনগোষ্ঠীর মধ্যে বৈষম্যের অনুভূতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও করনীতির মূল ভিত্তি হওয়া উচিত মানুষের আর্থিক সক্ষমতা। একজন দরিদ্র জুমচাষী, ক্ষুদ্র কৃষক, দিনমজুর বা প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষ—তিনি বাঙালি হোন বা উপজাতীয়—রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রাখেন। কিন্তু উচ্চ আয়ের ব্যক্তি, বড় ব্যবসায়ী কিংবা অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল নাগরিকদের ক্ষেত্রে কেবল জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে করমুক্ত সুবিধা দেওয়া আধুনিক কর ব্যবস্থার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই বাস্তবতায় একটি দীর্ঘমেয়াদি ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান হতে পারে ‘হিল-ট্যাক্স’ বা ভৌগোলিক বাস্তবতাভিত্তিক করনীতি। এই মডেলের মূল ধারণা হলো একটি নির্দিষ্ট করমুক্ত আয়সীমা নির্ধারণ করা, যা অনগ্রসর অঞ্চলের মানুষের জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। ফলে নির্ধারিত সীমার নিচে থাকা সকল নাগরিক—তাঁর জাতিগত পরিচয় যাই হোক না কেন—করের আওতার বাইরে থাকবেন। অন্যদিকে উচ্চ আয়ের ব্যক্তি ও বিত্তশালীরা কর প্রদান করবেন, যা ন্যায়সংগত ও টেকসই করব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে তুলবে। এছাড়া এসব অঞ্চল থেকে সংগৃহীত রাজস্বের একটি অংশ স্থানীয় শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামো উন্নয়নে পুনর্বিনিয়োগ করা হলে তা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়নকে আরও ত্বরান্বিত করবে। সকল অংশীজন, আঞ্চলিক নেতৃত্ব ও জনপ্রতিনিধির প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলা যায়, এখন সময় এসেছে নীতিনির্ধারণী চিন্তাভাবনাকে জাতিগত পরিচয়ের সংকীর্ণ পরিসর থেকে বের করে অর্থনৈতিক সামর্থ্য, ভৌগোলিক বাস্তবতা ও সামাজিক প্রান্তিকতার বৃহত্তর কাঠামোয় বিবেচনা করার। পাহাড় কিংবা সমতল—দেশের সকল সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য সমান সুযোগ ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারলেই গড়ে উঠবে একটি বৈষম্যহীন, আধুনিক ও কল্যাণমুখী বাংলাদেশ। একইভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী সার্কেল চিফ রাজা দেবাশীষ রায় দীর্ঘদিন ধরে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অধিকারভিত্তিক ব্যবস্থার পক্ষে কথা বলে আসছেন। অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় টিকিয়ে রাখতে বিশেষ সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে বর্তমান বাস্তবতায় এই অন্তর্ভুক্তিমূলক ধারণাকে কেবল জাতিগত পরিচয়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৯(৩)(ক) অনুচ্ছেদে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য বিশেষ ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। এখানে কোনো নির্দিষ্ট জাতি, ধর্ম বা গোষ্ঠীকে নয়; বরং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রীয় সহায়তা প্রদানের নীতিই প্রতিফলিত হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রীয় সুবিধা প্রদানের মানদণ্ড হওয়া উচিত ভৌগোলিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং সামাজিক প্রান্তিকতা। এই বিবেচনায় দেশের বিভিন্ন দুর্গম ও অনগ্রসর অঞ্চলকে ‘ইকোনমিক্যালি ডিপ্রেসড জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাশাপাশি রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চল, সিলেটের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকা, উপকূলীয় দ্বীপাঞ্চল, চরাঞ্চল কিংবা নদীভাঙনকবলিত জনপদগুলোকেও একই নীতির আওতায় আনা সম্ভব। কারণ এসব অঞ্চলের মানুষও উন্নয়ন ও সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে সমতলের মানুষের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যায়, সেখানে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ বাঙালি। তারাও একই ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা, যাতায়াত সংকট ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। ফলে কেবল জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে কর সুবিধা নির্ধারণ করা হলে একই পরিবেশে বসবাসকারী অন্য জনগোষ্ঠীর মধ্যে বৈষম্যের অনুভূতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও করনীতির মূল ভিত্তি হওয়া উচিত মানুষের আর্থিক সক্ষমতা। একজন দরিদ্র জুমচাষী, ক্ষুদ্র কৃষক, দিনমজুর বা প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষ—তিনি বাঙালি হোন বা উপজাতীয়—রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রাখেন। কিন্তু উচ্চ আয়ের ব্যক্তি, বড় ব্যবসায়ী কিংবা অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল নাগরিকদের ক্ষেত্রে কেবল জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে করমুক্ত সুবিধা দেওয়া আধুনিক কর ব্যবস্থার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই বাস্তবতায় একটি দীর্ঘমেয়াদি ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান হতে পারে ‘হিল-ট্যাক্স’ বা ভৌগোলিক বাস্তবতাভিত্তিক করনীতি। এই মডেলের মূল ধারণা হলো একটি নির্দিষ্ট করমুক্ত আয়সীমা নির্ধারণ করা, যা অনগ্রসর অঞ্চলের মানুষের জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। ফলে নির্ধারিত সীমার নিচে থাকা সকল নাগরিক—তাঁর জাতিগত পরিচয় যাই হোক না কেন—করের আওতার বাইরে থাকবেন। অন্যদিকে উচ্চ আয়ের ব্যক্তি ও বিত্তশালীরা কর প্রদান করবেন, যা ন্যায়সংগত ও টেকসই করব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে তুলবে। এছাড়া এসব অঞ্চল থেকে সংগৃহীত রাজস্বের একটি অংশ স্থানীয় শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামো উন্নয়নে পুনর্বিনিয়োগ করা হলে তা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়নকে আরও ত্বরান্বিত করবে। সকল অংশীজন, আঞ্চলিক নেতৃত্ব ও জনপ্রতিনিধির প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলা যায়, এখন সময় এসেছে নীতিনির্ধারণী চিন্তাভাবনাকে জাতিগত পরিচয়ের সংকীর্ণ পরিসর থেকে বের করে অর্থনৈতিক সামর্থ্য, ভৌগোলিক বাস্তবতা ও সামাজিক প্রান্তিকতার বৃহত্তর কাঠামোয় বিবেচনা করার। পাহাড় কিংবা সমতল—দেশের সকল সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য সমান সুযোগ ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারলেই গড়ে উঠবে একটি বৈষম্যহীন, আধুনিক ও কল্যাণমুখী বাংলাদেশ। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
