ই-পেপার সোমবার ● ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
রোববার ● ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ● ২ কার্তিক ১৪৩৩
ঋণ চায় বাংলাদেশ, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোই বড় চ্যালেঞ্জ
সায়ীদ আবদুল মালিক, ব্যাংকক (থাইল্যান্ড) থেকে
প্রকাশ: Sunday, 18 October, 2026, 8:28 PM

ঋণ চায় বাংলাদেশ, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোই বড় চ্যালেঞ্জ

ঋণ চায় বাংলাদেশ, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোই বড় চ্যালেঞ্জ

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে সাত মাসে জ্বালানি ও সার আমদানিতে বাংলাদেশের অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৪১২ কোটি ডলার, দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ৫০ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে প্রতি মাসে আরও প্রায় ৬০ কোটি ডলার বাড়তি ব্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগে স্থবিরতার মধ্যে এই বাড়তি ব্যয় দেশের অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত অর্থায়ন চাওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কাছেও বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু ঋণ, বিনিয়োগ সম্মেলন কিংবা প্রণোদনা দিয়ে অর্থনীতিতে গতি ফেরানো সম্ভব নয়। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, ব্যবসা ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি।

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভার ফাঁকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে অর্থায়ন ও বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা করছে। আইএমএফের সঙ্গে নতুন তিন বছর মেয়াদি সাড়ে চার বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি আগামী তিন বছরে বিশ্বব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন চেয়েছে বাংলাদেশ। তবে এসব অর্থায়নের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

বিনিয়োগের পথে বড় বাধা আস্থার সংকট

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হানের মতে, বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আস্থার বড় সংকট তৈরি হয়েছে। দুর্বল প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ কাটিয়ে উঠতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি হলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

তিনি বলেন, মব সন্ত্রাস, পিটিয়ে হত্যা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ধর্মীয় উগ্রতার প্রকাশ বাংলাদেশের নিরাপত্তা, সহনশীলতা ও স্থিতিশীলতা সম্পর্কে আন্তর্জাতিক পরিসরে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ও এসব ঘটনার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে।

ড. সেলিম রায়হানের মতে, বিনিয়োগ সম্মেলন আয়োজন বা প্রণোদনা দিয়ে এই আস্থার সংকট দূর করা যাবে না। বিনিয়োগকারীদের বিশ্বাস করতে হবে যে রাষ্ট্র তাদের জীবন, সম্পদ, কর্মী ও ব্যবসার নিরাপত্তা দিতে সক্ষম। নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে নতুন বিনিয়োগ পিছিয়ে যেতে পারে, এমনকি বিদ্যমান বিনিয়োগ অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

যুদ্ধের ধাক্কায় বাড়তি ব্যয় ৫০ হাজার কোটি টাকা

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও সার আমদানিতে অতিরিক্ত ব্যয় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় চাপ তৈরি করেছে। ডলারের সংকট ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির মধ্যে এই পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। যুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি জড়িত না থেকেও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও সারের দাম বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশকে বড় আর্থিক চাপ বহন করতে হচ্ছে।

তার মতে, এ পরিস্থিতিতে ক্ষতিপূরণ চাওয়ার যুক্তি থাকলেও কে দেবে এবং কীভাবে তা আদায় করা হবে, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্পষ্ট ব্যবস্থা নেই। বিশ্বব্যাংক ৩০ থেকে ৪০টি দেশের সঙ্গে সম্ভাব্য সহায়তা নিয়ে আলোচনা করছে, যা বাংলাদেশের জন্য আশাব্যঞ্জক। তবে শুধু আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভর না করে জ্বালানি আমদানির উৎস বাড়ানো, সারের সরবরাহ নিশ্চিত করা, অপচয় কমানো এবং সৌরশক্তিসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি দরিদ্র পরিবার ও কৃষকদের লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।

ঋণের পাশাপাশি সরাসরি বিনিয়োগ চায় সরকার

ব্যাংককে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের কর্মকর্তা ও চীনের এক্সিম ব্যাংকের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে অর্থায়ন ও বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল।

যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়োজাহাজ, জ্বালানি ও সয়াবিনসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি করছে। দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি আরও সহায়তার প্রত্যাশা জানিয়েছেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ও যৌথ বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এ বিষয়ে চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট, বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতির প্রভাব এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। ব্যাংক খাত সংস্কার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও দারিদ্র্য কমাতে সরকারের কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, চীনের এক্সিম ব্যাংক ও যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা চলছে। আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে অগ্রগতি হতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ঋণ নয়, দীর্ঘমেয়াদি সমাধান বিনিয়োগ ও সংস্কার

বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা জানিয়েছেন, যুদ্ধ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে ক্ষতিগ্রস্ত ৩০ থেকে ৪০টি দেশের সঙ্গে সম্ভাব্য সহায়তা নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রাথমিকভাবে ২৫ বিলিয়ন ডলারের সংকটকালীন তহবিলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে তা সর্বোচ্চ ১০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে বাংলাদেশ কতটা অর্থ পাবে এবং কী শর্তে পাবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে ঋণ সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন, বিদ্যমান শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি ও রফতানি সম্প্রসারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এ জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, নীতিনির্ধারণে ধারাবাহিকতা এবং জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো ও নিম্ন আয়ের মানুষের সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা জরুরি।

সব মিলিয়ে, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন বাংলাদেশের তাৎক্ষণিক চাপ সামলাতে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারলে ঋণ ও বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধিতে রূপ নেওয়া কঠিন হবে। 

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status