|
দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ জনগোষ্ঠী: সম্ভাবনা, নাকি অর্থনীতির বাড়তি চাপ?
শিক্ষা, দক্ষতা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বেসরকারি খাতের বিকাশ জরুরি বলে মনে করছে আইএমএফ
সায়ীদ আবদুল মালিক, ব্যাংকক (থাইল্যান্ড) থেকে
|
![]() দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ জনগোষ্ঠী: সম্ভাবনা, নাকি অর্থনীতির বাড়তি চাপ? বুধবার থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভা উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির এ অবস্থান তুলে ধরা হয়। আইএমএফের বৈশ্বিক নীতিগত কর্মসূচি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা। আইএমএফের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, উন্নত অর্থনীতি ও কয়েকটি উদীয়মান দেশে জনসংখ্যা দ্রুত বয়স্ক হয়ে উঠছে। বিপরীতে আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায় বাড়ছে তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা। ফলে এসব অঞ্চলে কর্মক্ষম মানুষের বড় অংশকে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। তবে এ সুযোগ কাজে লাগাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানমুখী বিনিয়োগ প্রয়োজন। বাংলাদেশে প্রায় ৪ কোটি ৬০ লাখ তরুণ দক্ষিণ এশিয়ায় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তরুণ জনগোষ্ঠীর বসবাস। ইউনিসেফের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ অঞ্চলে ৩৪ কোটির বেশি কিশোর-কিশোরী রয়েছে। পাশাপাশি ২৪ বছরের কম বয়সী মানুষের সংখ্যা ৭০ কোটির বেশি। বাংলাদেশেও তরুণ জনগোষ্ঠীর আকার উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ৬০ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ। এই জনগোষ্ঠীকে দক্ষ ও উৎপাদনশীল জনশক্তিতে রূপান্তর করা গেলে দেশের উৎপাদন, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তরুণদের উদ্ভাবনী শক্তি, প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা ও উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহ অর্থনীতির নতুন ক্ষেত্র বিকাশেও ভূমিকা রাখতে পারে। তবে মানসম্মত শিক্ষা, বাজারের চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ না বাড়লে এ সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হবে। শিক্ষা, দক্ষতা ও স্বাস্থ্যে বিনিয়োগের তাগিদ তরুণ জনগোষ্ঠীর সুবিধা কাজে লাগাতে শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে আইএমএফ। পরিবর্তিত শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কর্মীদের নতুন দক্ষতা অর্জন ও পুনঃপ্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানোরও পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। শ্রমবাজারে প্রযুক্তি ও উৎপাদনব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে কিছু প্রচলিত কাজের ধরন বদলে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে শুধু বিদ্যমান চাকরি ধরে রাখার চেষ্টা নয়, বরং কর্মীদের নতুন কাজের উপযোগী করে গড়ে তোলাও জরুরি। শ্রমশক্তিতে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানো, শ্রমবাজারের আধুনিকায়ন এবং কাজের প্রয়োজনে স্থান পরিবর্তনের বাধা কমানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে আইএমএফ। অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সময় কর্মীদের সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে তাঁরা নতুন কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারেন। কর্মসংস্থানে বেসরকারি খাতের ভূমিকা টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রাণবন্ত বেসরকারি খাতকে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে আইএমএফ। এ খাতের বিকাশে নিয়ন্ত্রক জটিলতা কমানো, বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো, সুশাসন শক্তিশালী করা এবং অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। পাশাপাশি কার্যকর করব্যবস্থা এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের মতো তরুণ জনগোষ্ঠীনির্ভর অর্থনীতিতে নতুন শিল্প ও ব্যবসার বিকাশ, উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টি সরাসরি যুক্ত। তাই তরুণদের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি বেসরকারি খাতে নতুন কাজের সুযোগ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়ন সহজ করা এবং নতুন উদ্যোগ গড়ে তোলার বাধা কমানো এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। এআইয়ে সম্ভাবনার পাশাপাশি ঝুঁকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিজিটাল অর্থায়নের দ্রুত বিস্তার অর্থনীতিতে নতুন সুযোগ তৈরি করছে। তবে এসব প্রযুক্তি শ্রমবাজারে পরিবর্তন আনার পাশাপাশি আয়বৈষম্য বাড়ানোর ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে আইএমএফ। প্রযুক্তির সুফল পেতে ডিজিটাল অবকাঠামো, টেকসই জ্বালানি এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বিনিয়োগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে এমন নীতিমালা গড়ে তুলতে হবে, যাতে প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ার সুফল সমাজের বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায়। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে কর্মসংস্থানে যাঁরা ঝুঁকির মুখে পড়বেন, তাঁদের নতুন দক্ষতা অর্জন ও বিকল্প কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে। উন্নয়ন ব্যয় ও সামাজিক সুরক্ষায় গুরুত্ব সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাস করে প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক বিনিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় সামাজিক খাতের ব্যয় সুরক্ষিত রাখার আহ্বান জানিয়েছে আইএমএফ। তরুণদের অর্থনীতির শক্তিতে পরিণত করতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের বিকল্প নেই। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সামনে তাই চ্যালেঞ্জ শুধু বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী নয়; বরং তাদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, বাজারোপযোগী দক্ষতা এবং পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শ্রমবাজারকে প্রস্তুত করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর নীতি ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে তরুণ জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উদ্ভাবন ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। অন্যথায় প্রত্যাশিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় জনমিতিক সুবিধার সুফল সীমিত হয়ে পড়তে পারে। |
| « পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ » |
