|
ব্যাংক খাতে অদক্ষ এমডি বাছাই শুরু, চাকরি হারাচ্ছেন কারা?
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
![]() ব্যাংক খাতে অদক্ষ এমডি বাছাই শুরু, চাকরি হারাচ্ছেন কারা? রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানদের কাছে ‘কি পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটরস (কেপিআই) ফ্রেমওয়ার্ক ফর অ্যাসেসমেন্ট অব দ্য পারফরম্যান্স অব ম্যানেজিং ডিরেক্টর অ্যান্ড চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার’ শীর্ষক এই কাঠামো পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে ব্যাংকপ্রধানদের নিয়োগের পাশাপাশি দায়িত্ব পালনকালে তাদের কর্মদক্ষতা নিয়মিত মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন এই উদ্যোগের ফলে ব্যাংকের এমডি-সিইওদের দীর্ঘদিন একই পদে থেকে যাওয়ার সুযোগও অনেকটা সীমিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্য, খেলাপি ঋণ, সুশাসন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা পরিপালন ও গ্রাহকসেবায় ব্যর্থতার বিষয়গুলো এখন সরাসরি তাদের কর্মদক্ষতার মূল্যায়নে প্রভাব ফেলবে। ৬৫ শতাংশের নিচে হলেই ‘বিলো অ্যাভারেজ’ বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত কাঠামোতে মোট ১০০ নম্বরের মধ্যে ৭৫ বা তার বেশি নম্বর পাওয়া এমডি-সিইওদের ‘অ্যাবোভ অ্যাভারেজ’ বা গড়ের চেয়ে ভালো হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ৬৫ থেকে ৭৫-এর কম নম্বর পাওয়া কর্মকর্তাদের ‘অ্যাভারেজ’ এবং ৬৫ শতাংশের নিচে নম্বর পাওয়া ব্যাংকপ্রধানদের ‘বিলো অ্যাভারেজ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। অর্থাৎ, ৬৫ শতাংশের নিচে স্কোর করা এমডি-সিইওদের কর্মদক্ষতায় ঘাটতি রয়েছে বলে ধরে নেওয়া হবে এবং তাদের কর্মক্ষমতা উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ৬৫ শতাংশের নিচে নম্বর পাওয়া এমডি-সিইওদের প্রথমে সতর্ক করা হতে পারে। এরপরও কর্মদক্ষতায় কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হলে কিংবা গুরুতর ব্যর্থতা দেখা দিলে পরিস্থিতি বিবেচনায় তাদের পদ থেকে অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। পাঁচ খাতে ১০০ নম্বর এমডি-সিইওদের মূল্যায়নে পাঁচটি প্রধান খাত রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংকের সচ্ছলতা ও তারল্যের জন্য ২৫ শতাংশ, সম্পদের গুণগত মানের জন্য ২৫ শতাংশ এবং সুশাসন ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের জন্য ২৫ শতাংশ নম্বর বরাদ্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, গ্রাহকসেবা ও বাজার আচরণের জন্য ১৫ শতাংশ এবং মুনাফাযোগ্যতার জন্য ১০ শতাংশ নম্বর রাখা হয়েছে। এই পাঁচ খাতের অধীনে প্রায় ৩০টি নির্দিষ্ট সূচকে ব্যাংকপ্রধানদের কর্মদক্ষতা পরিমাপ করা হবে। খেলাপি ঋণ কমাতে না পারলেও প্রভাব পড়বে নতুন মূল্যায়ন কাঠামোয় খেলাপি ঋণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকের মোট ও নিট খেলাপি ঋণের অনুপাত, মন্দ ঋণের পরিমাণ, খেলাপি ঋণ থেকে বছরে নগদ আদায়ের পরিমাণ এবং অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ মূল্যায়নে বিবেচনা করা হবে। অর্থাৎ, ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ক্রমাগত বাড়লেও এমডি-সিইওর কর্মদক্ষতার মূল্যায়নে তার প্রভাব পড়বে। একইভাবে খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে, সেটিও দেখা হবে। ঋণ ও আমানতের অনুপাত বা এডিআরও মূল্যায়নের আওতায় থাকবে। ব্যাংকের মোট আমানতের কত অংশ ঋণ হিসেবে বিতরণ করা হচ্ছে, নিয়মিত ঋণ আদায় হচ্ছে কি না এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত সীমা—৮৫ বা ৮৭ শতাংশ—পরিপালন করা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা হবে। বড় গ্রাহকের হাতে ঋণ কেন্দ্রীভূত কি না ব্যাংকের ঋণ কেন্দ্রীকরণও এমডি-সিইওদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। ব্যাংকের বড় অঙ্কের ঋণ শীর্ষ ১০ বা ২০ গ্রাহকের মধ্যে অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে কি না, তা দেখা হবে। একইসঙ্গে একক গ্রাহকের ঋণসীমা বা ‘সিঙ্গেল বরোয়ার এক্সপোজার লিমিট’ যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কি না, সেটিও মূল্যায়নে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকের ঋণ ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার ভূমিকা আরও বেশি জবাবদিহির মধ্যে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সুশাসনেও দিতে হবে হিসাব ব্যাংকের সুশাসন ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপরও ২৫ শতাংশ নম্বর রাখা হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা ও বিধিবিধান পরিপালন, মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে (এএমএল/সিএফটি) ব্যাংকের কার্যক্রমসহ বিভিন্ন বিষয় মূল্যায়ন করা হবে। এর পাশাপাশি আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, গ্রাহকসেবা ও বাজার আচরণও গুরুত্ব পাচ্ছে। সিএমএসএমই, কৃষি ও পরিবেশবান্ধব সবুজ অর্থায়নের মতো অগ্রাধিকার খাতে ঋণ সম্প্রসারণ এবং ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা নতুন গ্রাহকদের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনার উদ্যোগও মূল্যায়নের অংশ হবে। নতুন এমডির পরিকল্পনাও অনুমোদন নিতে হবে নতুন কাঠামো অনুযায়ী, কোনও ব্যাংকে নতুন এমডি বা সিইও নিয়োগের পর পরবর্তী বোর্ড সভায় তার কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করতে হবে। এরপর সেই পরিকল্পনা বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে চূড়ান্ত করতে হবে। বর্তমানে দায়িত্ব পালনরত এমডি-সিইওদের ক্ষেত্রে আগামী সেপ্টেম্বর থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত সময়ের কর্মদক্ষতা দিয়ে প্রথম মূল্যায়ন শুরু হবে। অর্থাৎ, নতুন কাঠামোর মাধ্যমে শুধু নতুন নিয়োগ পাওয়া ব্যাংকপ্রধানদের নয়, বর্তমানে দায়িত্ব পালনরত এমডি-সিইওদেরও কর্মদক্ষতার আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। ছয় ঘাটতিতে কাটা যাবে অতিরিক্ত নম্বর মূল্যায়ন ব্যবস্থায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রাখা হয়েছে। ছয়টি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকলে একজন এমডি-সিইওর অর্জিত মোট নম্বর থেকে সর্বোচ্চ ৫ নম্বর পর্যন্ত কেটে নেওয়া যাবে। যেমন, কোনও ব্যাংকপ্রধান ১০০-এর মধ্যে ৭৫ দশমিক ৫০ নম্বর পেলেন। কিন্তু নির্ধারিত ছয়টি বিষয়ের মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় তার নম্বর থেকে ৫ দশমিক ৮ পয়েন্ট কাটা হলে চূড়ান্ত স্কোর দাঁড়াবে ৭০ দশমিক ৪২। ফলে শুধু মোটামুটি ভালো স্কোর করলেই হবে না; নির্দিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ সূচকেও এমডি-সিইওদের কাঙ্ক্ষিত মান বজায় রাখতে হবে। ‘জবাবদিহিতা বাড়বে’ বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরফান আলী। তবে ছয় মাসের পরিবর্তে এক বছর পরপর মূল্যায়ন করা হলে তা আরও কার্যকর হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘যেকোনও চাকরির জন্য জবাবদিহিতা থাকা দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকের এমডিদের জন্য যে ফ্রেমওয়ার্ক নির্ধারণ করেছে, আমি বলবো, দিস ইজ অ্যা গুড স্টেপ। তবে প্রতি ছয় মাস অন্তর মূল্যায়ন—এটা খুবই আর্লি। এটা এক বছর মেয়াদি করলে ভালো হয়।’ আরফান আলী বলেন, অনেক ব্যাংকের এমডি চেয়ারম্যানকে সন্তুষ্ট রেখে দীর্ঘমেয়াদি চাকরি করে থাকেন। বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়োগের সময় তাদের অভিজ্ঞতা দেখে। কিন্তু এখন নির্ধারিত ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় সার্বক্ষণিক তদারকির মধ্যে থাকলে ব্যাংক খাতে অনেকটা শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন এই কাঠামোর ফলে ব্যাংকের এমডি-সিইওদের দায়িত্ব এখন শুধু পরিচালনা পর্ষদের কাছে সীমাবদ্ধ থাকছে না। তাদের আর্থিক ফলাফল, খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা, সুশাসন, নিয়ন্ত্রক বিধি পরিপালন ও গ্রাহকসেবার মতো বিষয়েও নির্দিষ্ট নম্বরের ভিত্তিতে জবাবদিহি করতে হবে। আর নির্ধারিত মানে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে শেষ পর্যন্ত পদ হারানোর ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
বাগমারায় বিদ্যালয়ে অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে উত্তেজনা, দু’পক্ষের ধস্তাধস্তি
কুড়িগ্রামে সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেলের প্রশিক্ষণ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত
দীঘিনালায় আগুনে পুড়ে নিঃস্ব মোস্তফার পরিবার, দুই সন্তানের পরনের কাপড়ও নেই
মানবিক ও জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশ নির্মাণের আহবান জানিয়েছেন কবি মু. নজরুল ইসলাম তামিজী
