ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
রোববার ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ঠিকাদার উধাও, মেঘনায় থমকে ১৭৭ কোটি টাকার সেতু
এম এ আজিজ, কিশোরগঞ্জ
প্রকাশ: Sunday, 13 September, 2026, 8:04 PM

ঠিকাদার উধাও, মেঘনায় থমকে ১৭৭ কোটি টাকার সেতু

ঠিকাদার উধাও, মেঘনায় থমকে ১৭৭ কোটি টাকার সেতু

কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল মেঘনা নদীর ওপর একটি সেতু। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে অষ্টগ্রামের বাঙালপাড়া থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের চাতলপাড় পর্যন্ত মেঘনার বুক চিরে শুরু হয়েছিল এক হাজার মিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণকাজ। ১৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া এই প্রকল্পের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়েও যাচ্ছিল। নদীর বুকে একের পর এক পিলার মাথা তুলে দাঁড়ানোয় নতুন আশায় বুক বাঁধছিলেন হাওরবাসী। কিন্তু প্রায় ৪০ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর হঠাৎ থেমে গেছে সেই স্বপ্নের নির্মাণযজ্ঞ।

গত প্রায় পাঁচ মাস ধরে কার্যত বন্ধ রয়েছে বাঙালপাড়া-চাতলপাড় সেতুর নির্মাণকাজ। নির্মাণস্থলে নেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন। পড়ে আছে কোটি কোটি টাকার নির্মাণসামগ্রী ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি। দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় এসব সামগ্রী নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মেঘনার বুকের অসম্পূর্ণ পিলারগুলো এখন যেন হাওরবাসীর স্বপ্নভঙ্গের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

জানা গেছে, অষ্টগ্রাম উপজেলার বাঙালপাড়া ইউনিয়নের নোয়াগাঁও থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার চাতলপাড় ইউনিয়নের দুর্গাপুর পর্যন্ত মেঘনা নদীর ওপর নির্মাণ হওয়ার কথা এক হাজার মিটার দীর্ঘ এই সেতুটি। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর-এলজিইডির মাধ্যমে ২০২৩ সালে ১৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির কাজ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তমা কনস্ট্রাকশন। কাজ শুরুর পর থেকেই সেতু নির্মাণে বেশ অগ্রগতি দেখা যায়। মেঘনার বুকে দৃশ্যমান হতে থাকে একের পর এক পিলার। সেতুর নির্মাণকাজ ঘিরে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন অষ্টগ্রামসহ পার্শ্ববর্তী ইটনা ও মিঠামইনের মানুষ। দীর্ঘদিনের নৌ-নির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে সড়কপথে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন তারা। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বদলে যায় প্রকল্পের পরিস্থিতি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক আত্মগোপনে চলে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে নির্মাণকাজে স্থবিরতা দেখা দেয়। একপর্যায়ে কাজ প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। স্থানীয়দের দাবি, গত পাঁচ মাস ধরে নির্মাণস্থলে কার্যত কোনো কাজ হচ্ছে না। নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিয়োজিত লোকজনও নির্মাণস্থল ছেড়ে চলে গেছেন। যাওয়ার সময় তারা সেখানে রেখে গেছেন বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী ও যন্ত্রপাতি। দীর্ঘদিন ধরে খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকায় এসব মালামাল নষ্ট হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয়রা আগামীর সময়কে বলেন, বাঙালপাড়া-চাতলপাড় সেতুটি নির্মিত হলে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন। অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইনের মানুষ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর হয়ে সরাসরি সড়কপথে ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াতের সুযোগ পাবেন। এতে শুধু যাতায়াতের সময় ও দুর্ভোগ কমবে না, বরং কৃষি, শিক্ষা, চিকিৎসা ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও তৈরি হবে নতুন সম্ভাবনা। হাওরের কৃষকরা ধানসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য সহজে দেশের বড় বাজারগুলোতে নিয়ে যেতে পারবেন। জরুরি রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত শহরাঞ্চলে নেওয়া সম্ভব হবে। শিক্ষার্থীদের যাতায়াতও সহজ হবে। একই সঙ্গে হাওরাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।

স্থানীয় বাসিন্দা আনিসুর রহমান বলেন, এই ব্রিজের সঙ্গে আমাদের অনেক স্বপ্ন জড়িত। কাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই অপেক্ষায় আছি, কখন এটি চালু হবে। ব্রিজটি হলে সারা বছর শহরের সঙ্গে সড়কপথে যোগাযোগ থাকবে। হাওরের ধান শহরে নিয়ে গিয়ে ভালো দামে বিক্রি করা যাবে। মুমূর্ষু রোগীদের উন্নত স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব হবে, শিক্ষার সুযোগও বাড়বে। কিন্তু পাঁচ মাস ধরে কাজ বন্ধ থাকায় আমাদের সেই স্বপ্নও স্থবির হয়ে পড়েছে।

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা উসমান মিয়া বলেন, তিন বছর আগে ব্রিজের কাজ শুরু হয়েছে। এখানে আমার অনেক জায়গা গেছে। ব্রিজটি আমাদের অনেক দিনের স্বপ্ন। আমার বয়স হয়েছে, হয়তো বেশিদিন বাঁচব না। কিন্তু আমার পরবর্তী প্রজন্ম যেন সারা বছর সড়কপথে শহরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে এমন আশা ছিল। তাদের উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখেছি। ব্রিজটি হলে শুধু আমার নয়, হাওরের সব মানুষের উপকার হবে। কিন্তু এখন কাজ বন্ধ করে ঠিকাদারের লোকজন চলে গেছে। নির্মাণসামগ্রী পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে, দেখার যেন কেউ নেই।

নির্মাণকাজের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ইঞ্জিনিয়ার জাহাঙ্গীর আলম বুলবুল জানান, তিনি প্রায় দেড় মাস আগে চাকরি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। বর্তমানে প্রকল্পের কাজ কেন বন্ধ রয়েছে, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারবেন না। এমনকি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগও নেই বলে জানান তিনি।

এলজিইডির অষ্টগ্রাম উপজেলা প্রকৌশলী মো. মোজাম্মেল হক বলেন, ইতোমধ্যে ১৭৭ কোটি টাকার মধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৩৫ কোটি টাকা বিল উত্তোলন করে নিয়েছে। তমা কনস্ট্রাকশন চুক্তিভঙ্গ করে কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই চলে গেছে। সরকারের পতনের পর থেকেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক আত্মগোপনে থাকায় প্রকল্পের কাজ ধীরগতিতে চলছিল। তবে গত পাঁচ মাস ধরে কাজ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন নির্মাণসামগ্রী ও যন্ত্রপাতি রেখেই চলে গেছেন। অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করার জন্য নতুন করে দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রশাসনিক অনুমোদন সম্পন্ন করে দ্রুত সেতুটির নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু করা হবে।



পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status