|
চট্টগ্রাম বন্দরের প্রবেশপথে আটকেপড়া সেই জাহাজকে কোটি টাকা জরিমানা কেন?
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
![]() চট্টগ্রাম বন্দরের প্রবেশপথে আটকেপড়া সেই জাহাজকে কোটি টাকা জরিমানা কেন? ‘বন্দরের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলায়’ এ জরিমানা করার কথা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের আদেশে বলা হয়েছে। মাল্টার পতাকাবাহী জাহাজ ‘এমভি সিএনসি ইউরেনাস’ ৩ অগাস্ট দুপুর সোয়া ২টার দিকে বন্দরে ঢোকার সময় অদূরে কর্ণফুলী মোহনার কাছে আটকা পড়েছিল। বন্দরের কর্মকর্তারা সেদিন জানিয়েছিলেন, ১৭০ মিটার দীর্ঘ কনটেইনার জাহাজটিতে ‘যান্ত্রিক ত্রুটি’ দেখা গিয়েছিল। ‘স্টিয়ারিং বিকল হওয়ায়’ সেটি ২ নম্বর বয়ার সঙ্গে ধাক্কা খায়। এরপর জাহাজটি কর্ণফুলীর মোহনা সংলগ্ন প্রতিরক্ষা দেয়ালে আটকে যায়। চীনের শিকোউ বন্দর থেকে আসা ১২৮২ টিইইউএস (২০ ফুট দৈর্ঘ্যের কনটেইনারকে একক ধরে) কনটেইনার নিয়ে জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরে আসছিল। জাহাজে মোট ২৪ জন নাবিক ছিলেন। পরে ৩ অগাস্ট গভীর রাতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের সমন্বিত প্রচেষ্টায় জাহাজটিকে সরিয়ে বন্দরের ‘বি অ্যাঙ্করেজে’ নিরাপদে নোঙর করা হয়। জাহাজটির ‘স্টিয়ারিং গিয়ার হাইড্রোলিক লকিং অ্যালার্ম’-এ ত্রুটি থাকার বিষয়টি বন্দরের পাইলট ও বন্দর কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকার পরও ‘সিএনসি ইউরেনাস’ কর্তৃপক্ষ তা গোপন করে বলে অভিযোগ। ‘তথ্য গোপন রেখে’ বন্দর চ্যানেলে প্রবেশ ও বার্থিংয়ের উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি বন্দরের ‘নিরাপত্তার জন্য’ ঝুঁকিপূর্ণ বলে ভাষ্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের। এ কারণে ‘এমভি সিএনসি ইউরেনাস’ জাহাজটিকে এক কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম। বন্দরের আদেশে বলা হয়, “এ ধরনের ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতার বিষয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যথাসময়ে অবহিত না করে জাহাজ পরিচালনার মাধ্যমে বন্দর, জাহাজ, পাইলট, বন্দর স্থাপনা এবং অন্যান্য নৌযানের নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলে বন্দরের সুনাম ক্ষুন্ন করার দায়ে জাহাজের মাষ্টার ও শিপিং এজেন্টকে এক কোটি টাকা জরিমানা আরোপ করা হল। “আরোপিত এক কোটি টাকার জরিমানাসহ ১৫ শতাংশ ভ্যাট বাবদ পনের লক্ষ টাকার দুটি পে-অর্ডার বন্দর তহবিলে অতি সত্বর জমা প্রদানের জন্য অনুরোধ করা হল।” জাহাজের শিপিং এজেন্ট প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া বন্দরের চিঠিতে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পাইলটদেরকে ইন্টারন্যাশনাল সেফটি ম্যানেজমেন্ট (আইএসএম) কোড অনুসারে তথ্য বিনিময়ের চেকলিস্ট পূরণের সময় ‘স্টিয়ারিং গিয়ার হাইড্রোলিক লকিং অ্যালার্ম’ এর ত্রুটির বিষয়টি জাহাজের মাস্টার গোপন করে। “পরবর্তীতে বন্দর চ্যানেলে প্রবেশের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে জাহাজের মাস্টার বিষয়টি পাইলটদেরকে জানায় এবং জাহাজ নির্মাণ ও চলাচলে আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণ বেসরকারি সংস্থা (মেরিটাইম ক্লাসিফিকেশন সোসাইটি) ডিএনভি কর্তৃক ইস্যু করা সনদটি হস্তান্তর করে।” ওই ডিএনভি ক্লাস সনদে জাহাজটির ‘স্টিয়ারিং গিয়ার হাইড্রোলিক লকিং অ্যালার্ম’ এ ত্রুটি থাকার বিষয়টি ছিল বলে দাবি বন্দরের। চীনের শিকোউ বন্দর থেকে সিঙ্গাপুর হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছিল জাহাজটি। সিঙ্গাপুরে অবস্থানকালে জাহাজটিতে সার্ভে করে ওই ডিএনভি ক্লাস সনদ দেওয়া হয়। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের আদেশের চিঠিতে বলা হয়, “ডিএনভি ক্লাস সনদের তৃতীয় শর্ত অনুসারে জাহাজটি বন্দরের আগমনের সাথে সাথে পাইলট ও বন্দর কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকার পরও বিষয়টি মাষ্টার ও এজেন্ট কর্তৃক গোপন রাখা হয়।” আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক কনভেনশন অনুসারে, জাহাজের গন্তব্য বন্দরের পাইলট এবং বন্দর কর্তৃপক্ষকে ত্রুটিপূর্ণ সরঞ্জাম সম্পর্কে অবহিত করতে হয়। কোনো জাহাজের ‘স্টিয়ারিং গিয়ার হাইড্রোলিক লকিং অ্যালার্ম’-এ ত্রুটি থাকলে জাহাজটি রাডারের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে। বন্দরে ঢোকার সময় দুর্ঘটনায় পড়ার ৫ দিন পর ৮ অগাস্ট এমভি সিএনসি ইউরেনাস জাহাজটিকে চট্টগ্রাম বন্দরের জেনারেল কার্গো বাথের (জিসিবি) ১১ নম্বর জেটিতে আনা হয়। ৩ অগাস্ট বন্দরে প্রবেশের সময় ঘটা দুর্ঘটনার বিষয়ে তদন্ত করতে নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তর ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ পৃথক কমিটি গঠন করেছে। মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত এই দুই কমিটির কোনটিই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি। নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তরের প্রিন্সিপাল অফিসার ক্যাপ্টেন শেখ জামাল উদ্দিন গাজীর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমরা পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। তারা প্রতিবেদন জমা দিলে সেটা দেখে বিস্তারিত বলতে পারব।” চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্য বন্দরের ডক মাস্টার ক্যাপ্টেন মো. আবু সুফিয়ান বলেন, “ওই জাহাজের বিষয়ে তদন্ত কমিটি কাজ করছে।” ‘এমভি সিএনসি ইউরেনাস’ জাহাজটির বাংলাদেশি শিপিং এজেন্ট আমেরিকান প্রেসিডেন্ট লাইনস (এপিএল) বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেড হল আন্তর্জাতিক কনটেইনার শিপিং প্রতিষ্ঠান সিএমএ-সিজিএম গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান। যান্ত্রিক ত্রুটির বিষয়টি না জানিয়ে জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে নিয়ে আসার বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা বলেন, “জাহাজে যদি যান্ত্রিক ত্রুটি থেকেই থাকে, তাহলে সেটি চীন থেকে সিঙ্গাপুর হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত আসল কীভাবে? “স্টিয়ারিং গিয়ার হাইড্রোলিক লকিং অ্যালার্মে যে ত্রুটির কথা ক্লাস সার্ভেতে উল্লেখ ছিল, তারা সেটি গন্তব্য বন্দরকে জানিয়ে রাখতে বলেছিল। তাড়াহুড়োয় মাস্টার সেটা পাইলটকে বলেনি। স্টিয়ারিং এ সমস্যা ছিল না। সেটি থাকলে জাহাজ এত দূর আসতে পারত না। বয়ার সাথে ধাক্কা ও পরে সীমানা দেওয়ালে আটকে যাওয়া দুর্ঘটনাবশত ঘটেছে।” বন্দরের করা জরিমানা পরিশোধের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবে জানিয়ে তিনি বলেন, “আমদানি পণ্য আনলোডিং হলেও বুকিং থাকা প্রায় এক হাজার তিনশ রপ্তানি পণ্যের কনটেইনার জাহাজে তোলা হয়নি। এতে রপ্তানি খাতের ক্ষতি হচ্ছে। “নৌ বাণিজ্য দপ্তরের তদন্ত শেষ হলে জানতে পারবেন কী ত্রুটি ছিল; সে পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।”
|
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
