|
ভারতের গুপ্তচর সংস্থা ‘র’-এর কাজ কী, কীভাবে হয় নিয়োগ?
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
![]() ভারতের গুপ্তচর সংস্থা ‘র’-এর কাজ কী, কীভাবে হয় নিয়োগ? সত্যটা হলো- ২২ সেপ্টেম্বর যেদিন যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়, ততদিনে পাকিস্তানের অস্ত্রভাণ্ডার প্রায় ফুরিয়ে এসেছিল। সেই ঘাটতি মিটিয়ে নতুন করে অস্ত্র মজুত করাও সম্ভব ছিল না। কারণ যুক্তরাষ্ট্র আগে থেকেই পাকিস্তানে অস্ত্র বিক্রির ওপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। ভারতের বহির্দেশীয় গুপ্তচর সংস্থা ‘রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং’ বা ‘র’ (RAW)-এর সাবেক প্রধান শঙ্করণ নায়ার তার বই ‘ইনসাইড আইবি অ্যান্ড র: দ্য রোলিং স্টোন দ্যাট গ্যাদার্ড মস’-এ লিখেছেন, তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল জে এন চৌধুরী প্রতিরক্ষামন্ত্রী যশবন্তরাও চৌহানকে জানিয়েছিলেন, ‘সেনাবাহিনী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করতে পারেনি। কারণ আমাদের কাছে সঠিক গোয়েন্দা তথ্য ছিল না। এসব তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল অযোগ্য ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ বা আইবির গুপ্তচরদের ওপর।’ ওই সমালোচনার ফলে সম্পূর্ণ নতুন একটি নতুন গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (র) প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয় ভারত। এই সংস্থার দায়িত্ব দেশের বাইরের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা। যেভাবে শুরু হলো ‘র’ ‘র’ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর। সংস্থার প্রথম প্রধান হিসাবে নিযুক্ত হন রামেশ্বর নাথ কাও আর শঙ্করণ নায়ার হন তার দু-নম্বর অফিসার। এই দুজন ছাড়াও ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো থেকে ২৫০ জনকে রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইংয়ে বদলি করা হয়। পরে, ১৯৭১ সাল থেকে রামনাথ কাও কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরাসরি ‘র’ এজেন্ট বেছে নেওয়ার প্রথা শুরু করেন। এর ফলে ‘র’-এ কর্মরত অনেকের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুরা সেখানে চাকরি পেয়ে যান। তখন মজা করে সংস্থাটিকে ‘রিলেটেড অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন’ বলা হতো। কিন্তু ১৯৭৩ সালের পর ওই সরাসরি নিয়োগের প্রক্রিয়া বদলে যায়। শুরু হয় কঠিন প্রতিযোগিতা। মনোনীতদের বেশ কয়েকটি পরীক্ষা পার করতে হয়। যেভাবে কর্মী নিয়োগ করে ‘র’ নীতিন গোখলে তার ‘আরএন কাও, জেন্টলম্যানস্ স্পাইমাস্টার’ বইয়ে লিখেছেন, ‘প্রথমটি হতো মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা। পরীক্ষার্থীদের ভোর ৩টার মধ্যে একটি জায়গায় আসতে বলা হতো। সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের অবজেক্টিভ টাইপ টেস্ট দেওয়া হতো। যারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতেন, তাদের ইন্টারভিউ নেওয়া হতো। ওই ইন্টারভিউ নিতেন যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা।’ ১৯৭৩ সালে ‘র’-তে যাদের নিয়োগ হয়েছিল, তাদেরই একজন জয়দেব রানাডে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে অবসর নেন। তিনি বলেন, পরের রাউন্ডে ‘র’-এর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এনএন সন্তুক এবং শঙ্করণ নায়ার ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন। এই পর্যায়টি পাস করার পরে আমরা মুখোমুখি হই পররাষ্ট্র সচিব, র-এর প্রধান আর এন কাও এবং একজন মনোবিজ্ঞানী সহ ছয় সদস্যের বোর্ডের। আমার সাক্ষাৎকার চলেছিল ৪৫ মিনিট। রানাডে দুই মাস পরে জানতে পারেন তিনি ‘র’-এ চাকরির জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। তার সঙ্গে প্রতাপ হেবলিকর, চক্রু সিনহা ও বিধান রাওয়ালও নির্বাচিত হয়েছিলেন। ‘র’-এর বিশেষ সচিব পদ থেকে অবসর নেওয়া রানা ব্যানার্জী বলছিলেন, ১৯৮৫ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে এমন আরও কয়েকজনকে নেওয়া হয়েছিল ‘র’-এ, যাদের নিয়ে স্পেশাল সার্ভিস গঠন করা হয়। পরে অজ্ঞাত কারণে এভাবে নিয়োগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ‘এখন ৯৫ শতাংশেরও বেশি কর্মী ভারতীয় পুলিশ সেবা বা আইপিএস থেকে নির্বাচিত হন এবং অর্থনৈতিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কাজের জন্য কিছু কর্মকর্তাকে কাস্টমস এবং আয়কর বিভাগ থেকে নেওয়া হয়।’ পুলিশ বাহিনী থেকে গুপ্তচর নিয়োগ ‘র’ এখন যেভাবে কর্মকর্তা নিয়োগ করে, সেই বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে সংস্থার একটি অংশেরই সমালোচনা রয়েছে। গুপ্তচর সংস্থাটির সাবেক প্রধান বিক্রম সুদ তার বই ‘দ্য আনএন্ডিং গেম’-এ লিখেছেন, যতদিনে কোনো ব্যক্তি আইপিএস অফিসার হচ্ছেন, ততদিনে তার বয়স মোটামুটি ২৭ বছর ছুঁতে যাচ্ছে। এর তিন বছর পর ‘র’-এ যোগ দিলে তার বয়স তখন ৩০ বা তার বেশি। ওই বয়সে নতুন কোনও পেশায় মানিয়ে নেওয়া যে কারও পক্ষেই কঠিন। এই বয়সে খুব বেশি ঝুঁকি নেওয়ার পরিস্থিতিতে থাকে না কেউ। বিক্রম সুদ লিখেছেন, পুলিশ সার্ভিস থেকে গোয়েন্দা সংস্থায় নিয়োগ এখন আর অতটা কার্যকর পদ্ধতি নয়। এটি এমন একটি পেশা, যেখানে ভাষার দক্ষতা এবং খবর বের করার শিল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কাজের জন্য প্রশিক্ষণ পুলিশের থাকে না। গুপ্তচরদের অর্থনৈতিক, সাইবার, বৈজ্ঞানিক এবং কৌশলগত ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ হতে হবে, যে প্রশিক্ষণ আইপিএস অফিসারদের দেওয়া হয় না। ‘র’ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ নিযুক্তির জন্য যাদের বেছে নেওয়া হয়েছে, তাদের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। যে কোনো একটি বিদেশি ভাষাও শিখতে হয় তাদের। প্রাথমিক প্রশিক্ষণের পরে তাদের ফিল্ড ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোতে রাখা হয়। সেখানে তাদের শেখানো হয় চরম শীতে কীভাবে কাজ করতে হয়, কীভাবে অন্য দেশে অনুপ্রবেশ করা যায়, কীভাবে ধরা পড়া এড়ানো যায়– এসব। কীভাবে প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় বা কীভাবে নতুন কারও সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলা যায়, তা-ও প্রশিক্ষণের অংশ। মাঠে নামার আগে আত্মরক্ষার জন্য ‘ক্রাভ মাগা’র প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় গুপ্তচরদের। এটি এক ধরনের ইসরায়েলি মার্শাল আর্ট, যেখানে মুখোমুখি লড়াইয়ে জেতার জন্য কিছু অপ্রচলিত কৌশল শেখানো হয়। রানা ব্যানার্জী বলেন, বিদেশে যাওয়ার আগে তাদের এমন কিছু জিনিস শেখানো হয়, যা তাদের পরে কাজে লাগবে। যেমন একটা সময়ে ‘ডেড লেটার বক্স’-এর প্রচলন ছিল। আপনি একটি কাগজ একটি গাছের নিচে রাখবেন। অন্য কেউ ওই কাগজটি সেখান থেকে তুলে নিয়ে যাবে। কাগজটি রাখা আর তুলে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় কিছু চিহ্ন সেখানে রেখে আসতে হয়। সাংকেতিক ভাষায় লেখাও শেখানো হয় ‘র’ কর্মকর্তাদের। দূতাবাসে ‘আন্ডার-কভার’ হিসেবে মোতায়েন বিশ্বের বহু দেশ বিদেশে তাদের দূতাবাসগুলোকে গুপ্তচরবৃত্তির কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে। ‘র’ এজেন্টদের প্রায়ই বিদেশে ভারতীয় দূতাবাসে পোস্টিং দেওয়া হয়। অনেক সময় ভুয়া নাম দিয়ে তাদের বিদেশে পাঠানো হয়। অনুসন্ধানী সাংবাদিক যতীশ যাদব তার বই ‘র: এ হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়াস কভার্ট অপারেশনস’-এ লিখেছেন, এর পেছনে কারণ হলো তাদের আসল নাম সিভিল সার্ভিসের তালিকায় রয়েছে। একবার ‘র’-এ কর্মরত বিক্রম সিংকে বিশাল পণ্ডিত নাম নিয়ে মস্কো যেতে হয়েছিল। তার পরিবারের সদস্যদেরও নাম বদল করা হয়েছিল। বিদেশে অবস্থানকালে ‘র’ কর্মকর্তাদের কারও পরিবারে যদি কোনো শিশু জন্ম নেয়, তবে তাকেও নকল পদবি দেওয়া হয়। পরিচয় ফাঁস ও দেশ থেকে বহিষ্কার নানা প্রশিক্ষণ বা নাম পরিচয় বদলের পরেও পরিচয় প্রকাশ পেয়ে যাওয়ার একটা ভয় গুপ্তচরদের সবসময়ই থাকে। পেশাদার গুপ্তচরদের খুব তাড়াতাড়ি চিহ্নিত করে ফেলা যায়। রানা ব্যানার্জী বলেন, ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যে একটি কূটনৈতিক প্রোটোকল রয়েছে যে, একে অপরের দেশে যে গুপ্তচরদের পাঠাবে, তাদের নাম আগে থেকেই অন্য দেশকে জানাতে হবে। এই সিদ্ধান্তও নেওয়া আছে যে, আমরা একে অপরের গুপ্তচরদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করব না। যদি কেউ সীমা অতিক্রম করে কাজ করছেন দেখা যায়, তাহলে তাকে ফিরিয়ে আনা হয়। তিনি জানান, পরিচয় প্রকাশ বা এক দেশ থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার ভয় সবসময়ই থাকে। কেউ যদি তিন বছরের পোস্টিংয়ে যান, তিনি তো সেই দেশেই সন্তানের পড়াশোনার ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু যদি ছয় মাসের মধ্যে তাকে দ্রুত সেই দেশ ছাড়তে বলা হয়, তখন সেটি এক চিন্তাজনক পরিস্থিতি তৈরি করে। সূত্র: বিবিসি বাংলা |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
