|
কে এই ডেভিড ইমন, কেন এত আলোচিত?
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
![]() কে এই ডেভিড ইমন, কেন এত আলোচিত? মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন এখন চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের এক নতুন আতঙ্কের নাম। তার হোয়াটসঅ্যাপ কলের আতঙ্কে থাকেন ব্যবসায়ীরা। এক কলেই চলে আসে লাখ লাখ টাকা। গত এক মাসে একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ফোন দিয়েই চাঁদা আদায় করেছেন কয়েক কোটি টাকা। ![]() কে এই ডেভিড ইমন, কেন এত আলোচিত? সবশেষ চট্টগ্রামে ২০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে এক ব্যবসায়ীর নির্মাণাধীন ১০তলা ভবনে সশস্ত্র হামলা, ভাঙচুর ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় ভবনটির নির্মাণকাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। রবিবার (২৬ জুলাই) সকালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডে এ সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনের পরিবার চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। তার পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কে রয়েছেন। ঘটনার পর থেকে ভয়ে ভবনটির কাজ করতে আসছেন না নির্মাণশ্রমিকরা। নির্মাণাধীন ভবনটির মালিক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন। ভাঙচুর ও বিস্ফোরণের ঘটনায় ভবনের মালিক বাদী হয়ে রবিবার রাতে হাটহাজারী থানায় অজ্ঞাতপরিচয় সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এতেও ইমনের নাম এসেছে। মামলার পর ৫০ লাখ টাকা চেয়েছে সন্ত্রাসীরা। তার আগে চট্টগ্রামে একটি ইন্টারনেট সেবাপ্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে ২ কোটি টাকা চাঁদা চেয়ে দুই দিনের সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। নির্ধারিত সময়ে চাঁদা না পাওয়ায় তার নির্দেশে চন্দনপুরার ওই ইন্টারনেট অফিসে সশস্ত্র হামলা চালানো হয়। এরপর নতুন করে আবার আলোচনায় আসে এই ডেভিড ইমনের নাম। ওই হামলায় তার নির্দেশে অন্তত ৩০ জন সন্ত্রাসী অংশ নেন। ডেভিড ইমন দুই বছরেই সাত খুনের আসামি। পুলিশের দাবি, চট্টগ্রাম নগরী এবং রাউজান, হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি উপজেলায় বেশিরভাগ চাঁদা দাবি ও হামলার নেপথ্যে রয়েছেন বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খানের অনুসারীরা। একসময় ছোট সাজ্জাদ বড় সাজ্জাদের হয়ে সব অপরাধ করে বেড়াতেন। ছোট সাজ্জাদ গ্রেফতারের পর মোবারক হোসেন ইমন এবং মোহাম্মদ রায়হান নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। সোমবার (১৩ জুলাই) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নগরের চকবাজার থানার চন্দনপুরা-বাকলিয়া এক্সেস সড়কে অবস্থিত ডিজিটাল ডট নেট (ডিডিএন) কার্যালয়ে হামলা-ভাঙচুর চালানো হয়। লুট করা হয় প্রতিষ্ঠানটিতে বেতনের জন্য রাখা ৩৫ লাখ টাকা। ৩০ থেকে ৩৫ জন সশস্ত্র ব্যক্তি এ হামলা চালান। অথচ এর আগে গত শনিবার (১১ জুলাই) ডেভিড ইমন (মোবারক হোসেন ইমন) পরিচয়ে ২ কোটি টাকা চাঁদা চেয়ে ডিডিএন মালিক আদিল বিন মামুনের মোবাইলে বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করা হয়। এতে ডেভিড ইমন বলেন, ‘ব্যবসা করতে হলে এককালীন ২ কোটি টাকা দেবেন। আর প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা করে দেবেন। না হলে এখন থেকে আমার ছেলেরা ব্যবসা করবে। আপনি আমার ডিটেইলস পুলিশ কমিশনার থেকে জিজ্ঞেস করেন। আপনি আমাকে না চিনলে পুলিশ কমিশনারকে আমার নম্বরটা দেখাইয়েন। ব্যবসা এখন থেকে আমরা করবো। আপনারা করিয়েন না। বেশি বাড়াবাড়ি করলে স্মার্ট গ্রুপের মুজিবের ঘরে কী হয়েছিল ওটা দেখেছেন তো। মুজিব থেকে গিয়ে আমার কথা জিজ্ঞেস করেন। তাহলে বুঝবেন।’ এই হুমকির মাত্র দুই দিনের মধ্যে ডিডিএন অফিসে প্রকাশ্যে দিনদুপুরে সিনেমার স্টাইলে হামলা-ভাঙচুর ও লুট করা হয়। ব্যবসা বন্ধ রাখতে হুমকি দিয়ে গেছেন তারা। হামলার সিসিটিভি ফুটেজ ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। হামলার শিকার প্রতিষ্ঠানের মালিক আদিল বিন মামুন বলেন, ‘দুই দিন আগে বিদেশি একটি নম্বর থেকে ফোন করে ডেভিড ইমন (মোবারক হোসেন ইমন) পরিচয়ে আমার কাছে ফোন আসে। এতে ইমন বলেন, ব্যবসা করতে হলে এককালীন ২ কোটি টাকা এবং প্রতি মাসে ১০ লাখ করে চাঁদা দাবি করে। চাঁদা না দেওয়ায় আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা করা হয়েছে। আমি এবং আমার প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। এর সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি। সোমবার যে প্রতিষ্ঠানে হামলা হয়েছে, তার পাশেই চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি পুলিশের পাহারায় থাকা স্মার্ট গ্রুপের পরিচালক মুজিবুর রহমানের বাসা লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। অভিযোগ ছিল, কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অনুসারীরা এ হামলা চালান। এর আগে গত ২ জানুয়ারিও একই বাসায় গুলি করা হয়। তখন বাসার জানালার কাচ ও দরজায় গুলি লাগে। ওই ঘটনার পর থেকে বাসাটি পুলিশি পাহারায় ছিল। এরপরও আবার গুলির ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কে এই ইমন মোবারক হোসেন ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার মো. মুসার ছেলে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকার জোড়া খুন এবং একই বছরের ২৩ মে রাতে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলাসহ মোট সাতটি মামলার আসামি। ইমন অন্তত ১৫ থেকে ২০টি আগ্নেয়াস্ত্র বহন করেছেন—এমন তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। অস্ত্র ব্যবহারে তিনি দক্ষ। বাকলিয়ার জোড়া খুনের ঘটনায় সন্ত্রাসী ও মোটরসাইকেল ভাড়া করার দায়িত্বও তার ছিল। বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের হয়ে বর্তমানে চট্টগ্রামে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন দুজন। তাদের একজন ইমন। এর আগে দেশে এই দলের নেতৃত্ব দিতেন সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ। তিনি বর্তমানে কারাগারে থাকায় ইমন ও মোহাম্মদ রায়হান দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন। রায়হানের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজি, অস্ত্র ও হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে অন্তত আটটি মামলা রয়েছে। পুলিশের দাবি, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে অন্তত ৫০ জন শুটার ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছেন। মোহাম্মদ রায়হান ও ইমন তার হয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে নিয়মিত চাঁদা দাবি করে আসছেন। ডেভিড ইমন বা মোবারক হোসেন ইমন পরিচয়ে এর আগেও একাধিকবার বিভিন্ন ব্যক্তি ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিককে ফোনে চাঁদা দাবি করে হুমকি দেওয়া হয়। গত ৯ মে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে বিপ্লব দে পার্থ নামে এক সাংবাদিককে হুমকি দেয় ডেভিড ইমন বা মোবাইরক হোসেন ইমন পরিচয়ে। চাঁদা না দিলে ওই সাংবাদিককে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গুলি করার হুমকি দেওয়া হয়। এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন বিপ্লব দে পার্থ। গত বছরের ২০ আগস্ট ৫০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে হাটহাজারী উপজেলার ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীরের বাড়িতে গুলি করা হয়। এই ঘটনায় করা মামলায় পুলিশ তিন জনকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতরা বড় সাজ্জাদের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। গত ২০ জুন দুপুরে পাঁচ জনের একটি দল চান্দগাঁও থানাধীন ‘ইয়ুনেস্কো’ পোশাক কারখানার সামনে প্রকাশ্যে গুলি ছুড়ে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল। চাঁদা না পেয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে এমনটাই করেছে তারা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ৩৭ সেকেন্ডের একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, গোলাপি রঙের টি-শার্ট পরা এক যুবক কারখানার সামনে থেকে সড়কের দিকে এগিয়ে আসছেন। ওই সময় তার পাশ দিয়ে সাধারণ পথচারী হেঁটে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ যুবকটি প্যান্টের পেছনের পকেট থেকে একটি পিস্তল বের করে কারখানার দিকে তাক করে ফাঁকা গুলি ছোড়ে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে চট্টগ্রামে সন্ত্রাসী ভেডিড ইমন নামে কাউকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সাধারণ মানুষ চিনতো না। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদ গ্রুপের সদস্য হিসেবে অপরাধ জগতে পরিচিতি পান ইমন। তার বাড়ি ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগরে। সাধারণ কৃষকের ঘরে তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। লেখাপড়াও তেমন করেননি। অল্প বয়সে কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে যান। সাজ্জাদের গ্রুপে এসে একাধিক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে সহজেই তার নজরে আসেন ইমন। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রামে সাজ্জাদ আলী খানের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে কাজ করছেন। সাজ্জাদ আলীর গ্রুপে অর্ধশতাধিক তরুণ রয়েছেন। যাদের নেতৃত্বে দিচ্ছেন ইমন। নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ, পতেঙ্গা, রাউজান ও হাটহাজারী উপজেলায় এই চক্রের প্রভাব বেশি। এসব এলাকায় তারা নানা অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে। পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের হয়ে অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নেতৃত্ব দেওয়া দুই প্রধান ব্যক্তির একজন মোবারক হোসেন ইমন। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
