|
জলাবদ্ধতা, বন্যা ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে কোন রোগের আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি?
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
![]() জলাবদ্ধতা, বন্যা ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে কোন রোগের আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি? অন্যদিকে, বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পাশাপাশি নদীগুলোয় উজানের পানির ঢলে দেশের অনেক এলাকায় বন্যা দেখা দেয়; দিনের পর দিন পানিবন্দি হয়ে থাকতে হয় বহু মানুষকে। এমন দুর্যোগে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ভোগান্তি, দুর্ভোগের পাশাপাশি বাড়ে স্বাস্থ্যঝুঁকিও। সড়কে, বাড়িঘরে, স্কুলে জমে থাকা ওই পানি, অতিরিক্ত আর্দ্র পরিবেশ এবং অনেক ক্ষেত্রে নিরাপদ খাবার পানির সংকটের মতো নানাবিধ কারণে বর্ষাকালে বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সময়ে সবচেয়ে বেশি আশঙ্কা থাকে ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড, ডেঙ্গু, বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগ এবং কিছু ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস এ এবং ই-এর মতো পানিবাহিত সংক্রমণের। তবে সব রোগের কারণ এক নয়। এগুলোর কোনোটি দূষিত খাবার বা পানির মাধ্যমে ছড়ায়, কোনোটি মশাবাহিত, আবার কোনোটি দীর্ঘ সময় স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে থাকার কারণে। তাই জলাবদ্ধতা বা বন্যার মতো পরিস্থিতিতে সুস্থ থাকতে হলে শুধু রোগের নাম জানলেই হবে না, জানতে হবে কোন রোগ কী কারণে হয়, কারা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন এবং কোন পরিস্থিতিতে কী ধরনের সতর্কতা নিলে, সেই ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। কী কী রোগ হতে পারে? জলাবদ্ধতা বা বন্যার সময় মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিকে মূলত দুইভাগে ভাগ করে ব্যাখ্যা করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন। তার মতে, প্রথমত ঝুঁকি তৈরি হয় বিশুদ্ধ পানি, নিরাপদ খাবার এবং স্যানিটেশনের সংকট থেকে। বন্যার সময় চারপাশে পানি থাকলেও তা অনেক ক্ষেত্রেই পান করার উপযোগী থাকে না। একই সঙ্গে খাবার ও পানির উৎস দূষিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, চারদিকে অনেক পানি আছে, কিন্তু খাবার মতো পানি নেই। এটাই বন্যার সময় সবচেয়ে বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর একটি। ফলে নিরাপদ পানি ও খাবার নিশ্চিত করা না গেলে ডায়রিয়া, কলেরাসহ বিভিন্ন খাবার ও পানিবাহিত রোগ দ্রুততম সময়ের মাঝেই ছড়িয়ে পড়তে পারে। ডায়রিয়া বা উদরাময় মূলত পেটের একটি অসুখ। সাধারণত দূষিত পানি বা পঁচা খাবার থেকে ডায়রিয়া হয়ে থাকে। ডায়রিয়া হলে খুব দ্রুত শরীর থেকে পানি এবং ইলেক্ট্রোলাইট (খনিজ লবণ) বের হয়ে গিয়ে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে রোগীদের মৃত্যুর ঝুঁকি দেখা দেয়। বিশেষ করে, ডায়রিয়ায় শিশুরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে। ২৪ ঘণ্টায় তিন বা তার বেশি বার পাতলা পায়খানা হলে সেটিকে সাধারণত ডায়রিয়া বলা হয়। শুরুর দিকে বমি হয়ে থাকে। এছাড়া থাকে পেট কামড়ানো – এগুলো ডায়রিয়ার মূল লক্ষণ। এদিকে, কলেরা হলো ডায়রিয়াজনিত একটি সংক্রামক রোগ, যা দূষিত খাবার বা পানির মাধ্যমে ছড়ায়। অর্থাৎ, সব ডায়রিয়া কলেরা নয়, তবে কলেরার প্রধান লক্ষণ হলো তীব্র ডায়রিয়া। কলেরার জন্য স্থায়ী একটি বিশেষ ব্যাকটেরিয়া। কলেরার জীবাণুতে আক্রান্ত হলে শরীরে ডায়রিয়া দেখা দেয় ও রোগী ক্রমাগত বমি করতে পারে। এছাড়া, শরীরেও নানা লক্ষণ দেখা দেয়। বিশেষ করে, রোগী বারবার বমি ও মলত্যাগ করতে থাকে। রোগী পানির তৃষ্ণা বেড়ে যেতে পারে। আবার দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়া কিংবা হার্টবিট বেড়ে যেতে পারে অনেকের। আবার অনেক রোগীর রক্তচাপও কমে যেতে দেখা যায়। আর কারও অবস্থা জটিল হয়ে গেলে কিডনি ফেইলিউর হলে, শকে চলে গেলে বা প্রস্রাব কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা গেলে মাইক্রো বায়োলজিক্যাল পরীক্ষার দরকার হয়। কলেরা হলে চিকিৎসকরা বলেন রাইস ওয়াটার স্টুল। অর্থাৎ, চাল-ধোয়া পানির মতো দেখতে পাতলা পায়খানা হবে প্রচুর পরিমাণে। কলেরার অন্যতম প্রধান লক্ষণ, আক্রান্ত রোগী বারবার বাথরুমে যাবে। অনেকের দিনে ২০ থেকে ২৫ বারও বাথরুমে যাবার অভিজ্ঞতা হতে পারে। অনেক সময় রোগীর আর শক্তি থাকে না বাথরুমে আসা যাওয়ার মতো। কলেরায় খুবই দ্রুত শরীরে পানি শূন্যতা তৈরি হয়। সেক্ষেত্রে রোগী দ্রুত নিস্তেজ হয়ে যাবেন এবং শকে চলে যাবেন। মুশতাক হোসেন বলেছেন, কলেরা ও ডায়রিয়া আলাদা ভাইরাসের কারণে হলেও লক্ষণ প্রায় একই। দুই ক্ষেত্রেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শরীরে পানিশূন্যতা ঠেকানো। আর এজন্য রোগীকে যত দ্রুত সম্ভব ওরস্যালাইন (ওআরএস) খাওয়ানো, পর্যাপ্ত নিরাপদ পানি পান করা এবং গুরুতর লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া প্রয়োজন। দ্বিতীয় ধরনের ঝুঁকি আসে বন্যা বা জলাবদ্ধতার কারণে তৈরি হওয়া দুর্ঘটনা ও পরিবেশগত কারণে। এ সময় শিশুদের পানিতে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। পানিতে আশ্রয়স্থল ডুবে যাওয়ায় সাপ লোকালয়ে চলে আসে, ফলে সাপের কামড়ের ঘটনাও বাড়তে পারে। এ ছাড়া, জলাবদ্ধতার পানিতে হাঁটার সময় কাচ, টিন বা কোনো ধারালো বস্তুর আঘাতে পায়ে ক্ষত হতে পারে, যা দ্রুত পরিষ্কার ও চিকিৎসা না করা হলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। টিটেনাসের টিকা নেওয়া না থাকলে ধনুষ্টংকারের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি। বন্যার পরে যেসব রোগ দেখা দিতে পারে বন্যা বা জলাবদ্ধতাজনিত আরও কিছু স্বাস্থ্যসমস্যা আছে, যা ডায়রিয়া ও কলেরার মতো সঙ্গে সঙ্গে দেখা দেয় না। কিছু রোগ কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ পর প্রকাশ পেতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো টাইফয়েড এবং হেপাটাইটিস এ ও ই (জন্ডিস)। বাংলাদেশে পানি ও খাদ্যবাহিত রোগগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো এই টাইফয়েড। এর প্রধান লক্ষণ হলো– দীর্ঘদিন জ্বর, মাথাব্যথা, দুর্বলতা, পেটব্যথা, ক্ষুধামন্দা এবং কখনো ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য। সময়মতো অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা না হলে জটিলতা দেখা যেতে পারে। এই রোগের জটিলতায় শিশুর মস্তিষ্কে প্রদাহ, হেপাটাইটিস, পিত্তথলিতে প্রদাহ, অন্ত্র ছিদ্র হয়ে যাওয়া, অন্ত্র থেকে রক্তক্ষরণ হতে পারে। অন্ত্রে রক্তক্ষরণ হলে শিশুর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশে প্রতি বছর প্রায় চার লাখ ৭৮ হাজার মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হন এবং এতে প্রায় আট হাজার মানুষের মৃত্যু হয়, যাদের ৬৮ শতাংশই শিশু। টানা বৃষ্টিপাতের কারণে তৈরি হওয়া জলাবদ্ধতার কারণে হেপাটাইটিস এ ও ই সংক্রান্ত রোগের প্রকোপও বৃদ্ধি প্রায় বন্যা বা জলাবদ্ধতা কবলিত এলাকায়। হেপাটাইটিস এ ও ই অন্যান্য হেপাটাইটিসের মত মারাত্মক নয়। কেউ হেপাটাইটিস বি অথবা সি আক্রান্ত হলে যতটা মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি হয়, এই দুই হেপাটাইসিসের কারণে তা হয় না। তবে গর্ভবতী মায়েদের জন্য হেপাটাইটিস ই বেশ ক্ষতিকর হতে পারে। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে জন্ডিসের মতই লক্ষণ দেখা যায়। খাওয়ায় অরুচি, বমি করা, চোখ হলুদ হওয়া, গায়ের রঙ হলুদ হওয়া, প্রস্রাব অতিরিক্ত হলুদ হওয়া ইত্যাদি। এসব লক্ষণ দেখা দিলে শুরুতে জন্ডিসের পরীক্ষা করা হয়। তারপর কোন ধরনের হেপাটাইটিস, তা জানার জন্য পরীক্ষা চালানো হয়। এই রোগ প্রতিরোধের একমাত্র উপায় নিরাপদ পানির ব্যবহার। পাশাপাশি, তৈজসপত্র ধোয়া, গোসল করা এবং অন্যান্য ব্যবহারের পানিও যেন বিশুদ্ধ হয়, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। জলাবদ্ধতা ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে বসবাসের ফলে চর্মরোগের ঝুঁকিও তৈরি হয়। কারণ অনেকসময় মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে গাদাগাদি করে তিন বা তিন দিনের বেশি সময় ধরে থাকতে হয়। তখন একজনের থেকে আরেকজনের চর্মরোগ হতে পারে। ডা. মুশতাক হোসেন বলছিলেন, চর্মরোগ যদি সাথে সাথে অ্যাড্রেস না করা হয়, সেখান থেকে কিডনির সমস্যা হতে পারে। যেমন, যদি কারও স্ক্যাবিস থাকে এবং সে হাত দিয়ে ভাত খায়, তাহলে কিডনির ভেতরে সেই ইনফেকশন যায়। অর্থাৎ, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে না পারলে এই স্ক্যাবিসসহ বিভিন্ন চর্মরোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। উল্লেখ্য, স্ক্যাবিস একটি প্যারাসাইটিক বা পরজীবী চর্মরোগ। যে স্থান ঘনবসতিপূর্ণ, যেমন – বস্তি এলাকা, হোস্টেল – যেখানে অনেকে একসঙ্গে থাকেন, সেখানে স্ক্যাবিস বেশি হয়। স্ক্যাবিস হয়েছে এমন কারো সরাসরি সংস্পর্শ, আক্রান্ত ব্যক্তির জামা-কাপড়, বিছানা, তোয়ালেসহ ব্যবহৃত জিনিসপত্রের মাধ্যমে জীবাণু একজন থেকে আরেক জনের শরীরে ছড়ায়। এছাড়া, কারও ত্বকে সংক্রমণ বা ফোঁড়া থাকলেও তা অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। আশ্রয়কেন্দ্রে দীর্ঘদিন অবস্থানের কারণে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, নিউমোনিয়া, হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টের সমস্যাও বাড়তে পারে বলে জানান ডা. হোসেন।
|
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
