|
প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফর
নতুন উচ্চতায় ঢাকা-কুয়ালালামপুর ও ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক
রেজাবুদ্দৌলা চৌধুরী
|
![]() নতুন উচ্চতায় ঢাকা-কুয়ালালামপুর ও ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া সফর শেষে ২২ জুন রাতে চীনে পৌঁছান। ২৩ জুন তিনি চীনের দালিয়ানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের 'সামার ডাভোস সম্মেলনে যোগ দেন এবং ‘পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জলবায়ু নেতৃত্ব' শীর্ষক অধিবেশনে ভাষণ দেন। এ ছাড়া তিনি সম্মেলনে অংশ নেওয়া বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি এবং বৈশ্বিক ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ২৪ জুন তিনি দালিয়ান থেকে রাজধানী বেইজিং পৌঁছান। ২৫ জুন বেইজিংয়ের গ্রেট হলে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হয় উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয়; যেমন— অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতাসহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে এবং খোলা মনে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা বিষয়ক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়। সই হওয়া সমঝোতা স্মারকের মধ্যে রয়েছে বিনিয়োগ, জিডিআই, মানবসম্পদ উন্নয়ন, চীনের ভাষাশিক্ষা এবং গণমাধ্যমের নানা পরিসরে সহায়তা। বিনিয়োগ সহযোগিতায় চারটি চুক্তি ও বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি, গণমাধ্যম খাতে সহযোগিতা জোরদারে বাংলাদেশ- চীনের মধ্যে চারটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। বিনিয়োগ সহায়তায় স্বাক্ষরিত চারটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে বাগেরহাটের মোংলা বন্দরের পাশে চীন-বাংলাদেশ মোংলা পোর্ট অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন, চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল, বাংলাদেশে বিনিয়োগ প্রসার, ব্যবসায়িক সংযোগ বৃদ্ধি এবং চীনা বিনিয়োগকারীদের সহায়তা জোরদার করা। এ ছাড়া ব্রিকসে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে চীন সহযোগিতা করবে বলে আশ্বস্ত করেন চীনের প্রধানমন্ত্রী। একইদিন চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি গোয়োইংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সে বৈঠকে তিস্তাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনায় দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে ঐকমত্য হয়। এছাড়া চীনা কমিউনিস্ট পার্টি 3 বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপির মধ্যেও একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। সফরের শেষ দিন ২৬ জুন সকালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অত্যন্ত আন্তরিক ও হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে দুই নেতা পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা করেন। তাঁদের আলোচনায় বিশেষভাবে গুরুত্ব পায় স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও শিক্ষা, স্থানীয় সরকার পর্যায়ে বিনিময় ও সহযোগিতা জোরদার, আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারি ইত্যাদি। বৈঠকে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেন, চীন সবসময় বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্য বন্ধু, ভালো প্রতিবেশী ও অংশীদার। মৌলিক স্বার্থ ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়গুলোতে উভয় দেশ পরস্পরকে সমর্থন অব্যাহত রাখবে। বাংলাদেশের সঙ্গে বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ এবং আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধি করতে চীন-মিয়ানমার- বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরের উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে চীনের সহযোগিতার কথাও জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে দুই দেশের মধ্যে ১৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশে বিনিয়োগের ব্যাপারে চীনা বিনিয়োগকারীদের পক্ষ থেকে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে। এটা উল্লেখ করার অপেক্ষা রাখে না যে, মালয়েশিয়া ও চীন উভয় দেশ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি যে আন্তরিকতা দেখিয়েছে এবং জমকালো আয়োজনের মাধ্যমে যেভাবে তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা ও লাল গালিচা সংবর্ধনা দিয়েছে তা যেমন অভূতপূর্ব, তেমনি তা আন্তর্জাতিক বিশ্বে বিপুল সাড়াও জাগিয়েছে। পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে কোনো সরকারপ্রধানের বিদেশ সফরের সাফল্য শুধু কতগুলো চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে কিংবা কী পরিমাণ বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি এসেছে অথবা কতগুলো যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে – এসব দিয়ে বিচার করা যায় না। বরং কোনো সফরের প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করা যায় সফরসংশ্লিষ্ট সেই দেশের কৌশলগত অগ্রাধিকার, পারস্পরিক প্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কের গতিপথকে কতটা স্পষ্ট করে, তা থেকেও। বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া ও চীন সফরও এর বাইরে কিছু নয়। দেশ দুটি সফর নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে নানা ধরনের মূল্যায়ন হচ্ছে। কারো মূল্যায়নে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে অর্থনীতি, কেউ বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন কূটনীতিকে, আবার কারো কারো কাছে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি। সামগ্রিক বিচারে প্রতিটি দিকই গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবতা। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক্ষেত্রে যে বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন তা হচ্ছে, তিনি বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও জিও পলিটিক্স বিবেচনায় নিয়ে তাঁর প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন। এছাড়া পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে মালয়েশিয়ার প্রতি তাঁর একটা আলাদা দুর্বলতাও রয়েছে এবং তা হচ্ছে, ২০০৪ সালের ১ জানুয়ারি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মালয়েশিয়ার প্রসঙ্গ টেনেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশের পর যদি কোনো দেশ তাঁর বিশেষ পছন্দের তালিকায় থাকে, তবে সেটি মালয়েশিয়া। মালয়েশিয়ার প্রতি তাঁর এ আগ্রহের কারণ কীভাবে একটি দেশ কয়েক দশকের ব্যবধানে নিজেকে আমূল বদলে ফেলতে পারে। তাঁর মতে, মালয়েশিয়ার সামাজিক কাঠামো, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে বাংলাদেশের যথেষ্ট মিল রয়েছে। অথচ একসময় উন্নয়নের সূচকে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রায় একই অবস্থানে থাকা দেশটি আজ বিশ্বে উন্নয়ন, অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি বুঝতে চেয়েছিলেন, কোন নীতি, কোন নেতৃত্ব এবং কোন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মালয়েশিয়া আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় পর তাঁর সেই কথাগুলো নতুন তাৎপর্য নিয়ে ফিরে এসেছে। তিনি আজ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী দায়িত্বে। প্রধানমন্ত্রী হয়ে প্রথম বিদেশ সফরে সেই দেশটিতেই ছুটে গেছেন। ফলে তাঁর এ সফরকে নিছক আর দশটি রাষ্ট্রীয় সফরের মতো ভাবা যায় না। বরং এর মধ্যে রয়েছে দেশকে তাঁর স্বপ্ন বা পরিকল্পনা অনুসারে গড়ে তোলার বার্তা। যে পরিকল্পনার কথা তিনি গত বছর ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরেই বলেছিলেন। মালয়েশিয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। বস্তুত, প্রধানমন্ত্রী এমন এক সময়ে এই সফর করলেন, যখন বিশ্বব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং এশিয়ায় চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা ক্রমশ তীব্রতর হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে সফরটি কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ নয়; বরং বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্কের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। ১৯৭৫ সালে চীন আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। তারপর গত পাঁচ দশকে দুই দেশের সম্পর্ক ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক, সামরিক, অবকাঠামোগত ও কূটনৈতিক সহযোগিতার এক শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলেও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। সেক্ষেত্রে বলা যায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর সেই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতাকে নতুন বাস্তবতায় আরও শক্তিশালী করবে। বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে এই সফরের গুরুত্ব শুধু অর্থনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। চীনের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন প্রকল্প বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকটের মতো জটিল আঞ্চলিক সমস্যায়ও চীনের ভূমিকা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মিয়ানমারের ওপর বেইজিংয়ের প্রভাব থাকায় ঢাকা আশা করে, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে চীন আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ধারাবাহিক উদ্যোগ অর্থনৈতিক কূটনীতি, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান আরো শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। দেশের জনগণেরও এটাই কামনা। ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সহযোগিতায় বাংলাদেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হোক। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গড়ে উঠুক সমৃদ্ধ নতুন বাংলাদেশ। লেখক: রাজনীতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠক। সাবেক তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, বিএনপি। সাবেক সভাপতি, জাতীয়তাবাদী সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংস্থা— জাসাস
|
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
