ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
সোমবার ১১ মে ২০২৬ ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩
কাপাসিয়ায় ৫ খুন
স্ত্রীর মরদেহের গলায় অলংকার, হাতে চুড়ি, পরনের শাড়ি নিয়ে রহস্য
নতুন সময় প্রতিনিধি
প্রকাশ: Monday, 11 May, 2026, 7:36 PM

স্ত্রীর মরদেহের গলায় অলংকার, হাতে চুড়ি, পরনের শাড়ি নিয়ে রহস্য

স্ত্রীর মরদেহের গলায় অলংকার, হাতে চুড়ি, পরনের শাড়ি নিয়ে রহস্য

গাজীপুরের কাপাসিয়ায় পাঁচ খুনের ঘটনায় করা হত্যা মামলায় তিন দিনেও কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। স্ত্রী, তিন সন্তান ও শ্যালককে হত্যা করে পালিয়েছেন গৃহকর্তা ফোরকান মিয়া (৪০)—এমন অভিযোগে কাপাসিয়া থানায় একটি মামলা করা হয়েছে। গত শনিবার রাতে করা ওই মামলায় ফোরকানকে এজাহারনামীয় আসামি করা হয়। অজ্ঞাতনামা আসামি তিন থেকে চারজন।

গত শনিবার সকালে কাপাসিয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের রাউৎকোনা গ্রামে একটি বাড়ি থেকে উদ্ধার হয় এক নারী, তাঁর তিন মেয়ে, ভাইসহ পাঁচজনের মরদেহ। নিহত ব্যক্তিরা হলেন গোপালগঞ্জ সদরের পাইককান্দি উত্তর চরপাড়া গ্রামের শাহাদাৎ হোসেন মোল্লার মেয়ে শারমিন আক্তার (৩০), শারমিনের মেয়ে মীম খানম (১৫), উম্মে হাবিবা (৮), মোসা. ফারিয়া (২) ও ভাই রসুল মিয়া (২২)।

এ হত্যাকাণ্ডের জন্য অভিযুক্ত ফোরকান মিয়ার বাড়ি গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার মেরি গোপীনাথপুর গ্রামে। ফোরকান পরিবার নিয়ে প্রায় পাঁচ বছর ধরে গাজীপুরের কাপাসিয়ার ওই বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। ফোরকান প্রাইভেট কার চালাতেন। আর তাঁর শ্যালক রসুল মিয়া গাজীপুর সদরের একটি কারখানায় কাজ করতেন।

এ ঘটনায় করা মামলা প্রসঙ্গে তদন্তকারী কর্মকর্তা ও কাপাসিয়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. যুবায়ের আহমেদকে মুঠোফোনে কল করা হলে ব্যস্ত আছেন এবং পরে কথা বলবেন বলে সংযোগ কেটে দেন।

কাপাসিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহীনুর আলম আজ সোমবার সকালে বলেন, আসামিকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত রাখা হয়েছে।

বাসা থেকে লাশ উদ্ধারের সময় শারমিনের নিথর দেহের গলায় ছিল চকচকে হার, হাতে চুড়ি আর পরনে নতুন শাড়ি। বিষয়টিকে অনেকেই রহস্যময় মনে করছেন। পাঁচ খুনের খবর শুনে ওই বাড়িতে ভিড় জমায় স্থানীয়দের অনেকে। তাঁদের একজন মোসা. শ্রাবণী। তিনি বলেন, শারমিনের শরীরে নতুন শাড়ি, গলায়-হাতে গয়না থাকার বিষয়টি নিয়ে তদন্ত হওয়া দরকার। তাঁর মতে, বিষয়টি রহস্যঘেরা। পাঁচজন মানুষকে একজন ব্যক্তি হত্যার করার বিষয়টিও তদন্তের দাবি রাখে।

নিহত শারমিনের সাজপোশাক রহস্যজনক বলে মনে করেন ওই গ্রামের বাসিন্দা রাসেল মিয়াও। ফেসবুকে ঘটনাস্থলের ছবি তিনি দেখেছেন। তাঁর কাছে, ওই ছবিতে থাকা নিহত শারমিনকে সাজানো-গোছানো মনে হয়েছে। শরীরে অলংকার ছিল। এগুলো আগে থেকেই পরানো ছিল কি না, তা ভাবনার বিষয়। এ ঘটনায় রহস্য থাকতে পারে।‌ এ ছাড়া ওই রাতে ঘটনাস্থলে আরও কেউ এসেছিল কি না, তা–ও দেখা দরকার।

এদিকে নিহত শারমিন আক্তার ও রসুলের ভাই আরোজ আলী জানান, গাজীপুরে গিয়েও তিনি তাঁর বোন ও ভাগনিদের দেখতে পাননি। তবে স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে জানতে পারেন, ঘটনার দিন বিকেলে শারমিন ও তাঁর সন্তানদের নিয়ে ফোরকান ঘুরতে বের হয়েছিলেন। এ সময় তাঁর পরনে নতুন শাড়ি ও সিটি গোল্ডের গয়না ছিল। আরোজ আলীর দাবি, পরিকল্পিতভাবে তাঁদের হত্যা করা হয়েছে। ঘুরতে যাওয়ার সময় শারমিন যে পোশাক পরেছিলেন, হত্যার সময়ও তাঁর গায়ে একই পোশাক ছিল।

নিহত শারমিন আক্তার ও রসুলের বাবা শাহাদাৎ হোসেন জানান, শারমিনের গায়ে নতুন কাপড় ও গয়না পরানো হয়েছিল কি না, এ বিষয়ে তাঁরা কিছুই জানেন না। ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর পুলিশ তাঁদের ঘরে প্রবেশ করতে দেয়নি। ফলে মেয়ের গায়ে কী ছিল, তা তিনি নিজ চোখে দেখতে পারেননি। তবে লোকমুখে তিনি এ ধরনের কথা শুনেছেন বলে জানান। শাহাদাৎ হোসেন আরও বলেন, তাঁর কাছে পুরো ঘটনাটি ফোরকানের সাজানো নাটক বলে মনে হয়েছে। হত্যার পর ঘটনা ভিন্ন খাতে নিতে কোনো নাটক সাজানোর চেষ্টা করা হয়ে থাকতে পারে। সে কারণেই হয়তো শারমিনের গায়ে নতুন কাপড় ও অলংকার পরানো হয়েছিল।

গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক মাজহারুল হক বলেন, নিহত শারমিনকে অলংকার পরা অবস্থায় পাওয়া গেছে। তবে এ বিষয়ে তাঁর কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই।

মাজহারুল হক আরও বলেন, ‘আমাদের ধারনা রসুল মিয়াকে অতর্কিতভাবে আঘাত করা হয়েছে। তাঁর গলায় বড় বড় দুটো কাটা দাগ আছে। এর পর দুই বছর বয়সী ছোট্ট মেয়েটিকে শ্বাস রোধ করে হত্যা করা হয়। আট বছর বয়সী মেয়েটির গলায় দুটি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। বড় মেয়ের গলায়, মুখে ও হাতে ধারাল অস্ত্রের আঘাত রয়েছে। আমরা ধারণা করছি বড় মেয়েটি হয়তো বাধা দিতে চেয়েছিল। এতে তার হাতে আঘাত লেগে থাকতে পারে।’

এই চিকিৎসক আরও জানান, নিহতদের পাকস্থলির নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। তাদের নেশা জাতীয় দ্রব্য খাওয়ানো হয়েছিল কি–না তা রিপোর্ট পেলে বলা যাবে। এ ছাড়া প্রাথমিকভাবে ওই নারীকে যৌন নির্যাতন করা হয়নি বলে মনে হচ্ছে।

নিহত শারমিনের ফুফু ইভা আক্তার বলেন, ঘটনার পর ফোরকান তাঁর ভাই মিশকাতকে কল দিয়ে বলেন, ‘আমার সব শেষ হয়ে গেছে। সবাইকে মাইরা ফেলছি। আমারে আর তোরা পাবি না।’ খবর পেয়ে তাঁরা পাঁচ-ছয়জন সকালে কাপাসিয়ার ওই বাড়িতে যান। গিয়ে দেখেন, ভবনের কলাপসিবল গেট খোলা। নিচতলার কক্ষগুলোর দরজাও খোলা। ভেতরে গিয়ে শারমিন, তিন মেয়ে ও ফোরকানের শ্যালকের নিথর দেহ বিছানায় পড়ে থাকতে দেখেন। পরে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়। সেই সঙ্গে তাঁরা কাপাসিয়া থানায় যান।

ইভা আক্তারের দাবি, ফোরকান আরেকটি বিয়ে করবেন বলে শারমিনকে জানিয়েছিলেন। এ নিয়ে শারমিন মনঃক্ষুণ্ন ছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে মনোমালিন্য চলছিল। ছয়-সাত মাস আগে ফোরকান শারমিনকে মারধর করেন। এতে তাঁর শরীরের বিভিন্ন অংশ ফুলে যায়। পরে তাঁকে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়। সুস্থ হওয়ার পর শারমিন বাবার বাড়িতে থাকছিলেন। কয়েক দিন পর ফোরকান আবার স্ত্রীকে সেখান থেকে নিয়ে আসেন। তবে দ্বিতীয় বিয়ের প্রসঙ্গ নিয়ে তাঁদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ চলছিল। শারমিন স্বামীকে জানিয়েছিলেন, তাঁর সন্তানদের নিয়ে কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই, তাই স্বামীর সঙ্গেই থাকতে চান।

রসুল মিয়া ও তাঁর ভাগনিদের মরদেহের পাশ থেকে ফোরকান মিয়ার থানায় করা একটি অভিযোগের কপি উদ্ধার করা হয়েছে। তবে কপিটিতে কোনো স্বাক্ষর নেই। গোপালগঞ্জ সদর থানার ওসি মো. আনিসুর রহমান জানান, এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ বা জিডি তাঁর থানায় হয়নি।

কম্পিউটারে টাইপ করা ওই কাগজে লেখা, ৩ মে ফোরকান মিয়া থানায় ওই অভিযোগ করেন। সেখানে তাঁর স্ত্রী, শ্বশুরসহ ১১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। ওই কাগজে লেখা রয়েছে, শ্বশুর তাঁর স্ত্রীর মাধ্যমে কয়েক দফায় তাঁর কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা নিয়েছেন। এ ছাড়া স্ত্রী তাঁর এক স্বজনের সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়েছেন। এসব বিষয়ে প্রতিবাদ করায় শ্বশুর ও অন্যরা মিলে তাঁকে হাত-পা বেঁধে নির্যাতন করেন।

নিহত শারমিনের চাচা মো. উজ্জ্বল মিয়া বলেন, ‘আমাদের জানামতে, ফোরকান সম্প্রতি তাঁর শ্বশুরবাড়ি যাননি। তাঁকে মারধরের কোনো ঘটনা ঘটেনি। আমার মনে হয়, তিনি নিজেকে বাঁচানোর জন্য এমন অভিযোগ লিখেছেন।’

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status