|
আব্বা বলেছিলেন গাইড বই কিনে দেবেন,এক দুর্ঘটনায় থেমে গেল দুই শিশুর স্কুল আর স্বপ্ন
মিজানুর রহমান, সুনামগঞ্জ
|
![]() আব্বা বলেছিলেন গাইড বই কিনে দেবেন,এক দুর্ঘটনায় থেমে গেল দুই শিশুর স্কুল আর স্বপ্ন কথাটা বলতে বলতে থেমে যায় সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুরের রাজারগাঁও গ্রামের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী জোহা আক্তার। চোখের পানি বাঁধ মানছে না পাশে দাঁড়িয়ে বড় বোন হাওয়া বেগম। হাওয়া পড়ে চতুর্থ শ্রেণিতে যার রোল নম্বর ৯,আর তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া জোহার রোল ৬, দুই বোনের সামনে এখন শুধু খালি ঘর আর অনিশ্চিত দিন। গত রবিবার তাদের বাবা শাহাব উদ্দিন আর মা নিলোফা বেগম গিয়েছিলেন শশুরবাড়ি বালিজুরী ইউনিয়নের তিওরজাল গ্রামে। চাচা শশুর ইছব আলী অসুস্থ, তাকে ডাক্তার দেখাতে সিলেট নিতে হবে। গত সোমবার দুপুরে ছাতকের জালালপুর এলাকায় রিফাত পরিবহনের একটি বাস সাইড বদল করে সোজা ধাক্কা দেয় তাদের সিএনজিকে। মুহূর্তে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় সবকিছু। ঘটনাস্থলেই মারা যান কাঠমিস্ত্রি শাহাব উদ্দিন, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর একে একে মারা যান স্ত্রী নিলোফা বেগম, চাচা শশুর ইছব আলী এবং ইছব আলীর মেয়ে। ভিডিও ফুটেজে স্পষ্ট—বাস লেন বদলে এসে সিএনজিকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এক ধাক্কায় কেড়ে নিল পাঁচটি প্রাণ। শাহাব উদ্দিন ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। কাঠমিস্ত্রির কাজ করে যা রোজগার করতেন, তাই দিয়ে চলত ছয় জনের সংসার। বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। তৃতীয় সন্তান মেহেদী পড়াশোনা ছেড়ে নদীতে বালুর কাজ ধরেছে। ঘরে রইলেন ২য় বড় মেয়ে, আর দুই ছোট মেয়ে জোহা আর হাওয়া। যাদুকাটা নদীর কূল ঘেঁষে রাজারগাঁওয়ের বাড়িটা শূন্য মরুভূমি। স্কুলের ব্যাগ দুটি কোণে পড়ে আছে ধুলো জমে। জোহার হাতে সেই গাইড বই নেই, যেটা তার আব্বা কথা দিয়েছিলেন কিনে দেবেন। হাওয়া চুপচাপ তাকিয়ে থাকে মাটির দিকে। একদিকে দুই অবুঝ শিশুর বাকরুদ্ধ কান্না, অন্যদিকে উপার্জনহীন পরিবারের হাহাকার। প্রতিবেশীরা বলছেন, এই বাচ্চা দুটোকে এখন কে দেখবে? স্কুল কি চালিয়ে যেতে পারবে? স্কুল পড়ুয়া হাওয়া আর জোহার ভাই মেহেদি হাসান এখন নির্বাক হয়ে থাকিয়ে থাকে। কি করবে বুঝতে পারেনা। সেও শৈশব থেকে মাত্র কৈশরে পা দিয়েছে। সংসারের বোঝা কী এখনও বুঝতে পারেনি। বাবার সাথে রাজমিস্ত্রী কাজে সহযোগী করা ও মাঝে মধ্যে যাদুকাটা নদীতে বালু তুলে কোন রকমের দিন চালাচ্ছিলেন তারা। এই দূর্ঘটনায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ার চেয়েও অনেক কিছু। দূর্ঘটনায় নিহত শাহাবুদ্দিনের ভাই কেঁদে কেঁদে বলেন, আমার ভাইকে সিলেট মেডিকেল থেকে নিয়ে আসার মত এম্বুল্যান্স এর ভাড়া ছিল না। সিলেটের কিছু লোক এবং মানবিক সংগঠন এম্বুল্যান্সের ভাড়া দিয়ে লাশগুলো বাড়িতে পাঠান। প্রতিবেশীরা অভিযোগ করে বলেন, এখন পর্যন্ত তাদের পরিবারের পাশে কেউ দাড়ায়নি। পরিবারটি অনেক মানবেতর জীবনযাপন করছে। জয়নাল- সাফিয়া ফাউন্ডেশন তাহিরপুর এর চেয়ারম্যান সুহেল আলম জানান, দূর্ঘটনায় নিহত শাহাবুদ্দিন এর ছোট দুটি মেয়ের জন্য গাইড বই কিনে দিয়েছি। আমরা চেষ্টা করব যেন কোমলমতি শিশুরা পড়াশোনা চালিয়ে যায়। এ ব্যাপারে বিআরটিএ সুনামগঞ্জ জেলার সহকারী পরিচালক আব্দুর রশীদ জানান, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করা হয়। নির্দিষ্ট ফরমে নব্বই দিনের মধ্যে আবেদন করলে আমরা অবশ্যই তাদেরকে সহযোগীতা করব। স্থানীয়রা প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়েছেন, দ্রুত পরিবারটির পাশে দাঁড়ানো হোক এবং উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হোক। নইলে গাইড বইয়ের স্বপ্নটাই নয়, থেমে যাবে দুই বোনের পুরো ভবিষ্যৎ। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
