বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আহত হয়ে জাতীয় অর্থোপেডিকস ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) ক্যাজুয়ালিটি-২ ওয়ার্ডের জি-১২ নম্বর বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে জুয়েল রানা (২১)। রাগান্বিত স্বরে পাশে বসা স্ত্রীকে বারবার বলছেন, ‘আমি আর থাকতে পারছি না! আমাকে বাড়ি নিয়ে চলো। সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন স্ত্রী জুলি আক্তার। বলেন, ‘বাড়ি গেলে ভালো (সুস্থ) হবে কীভাবে? চিকিৎসার খরচ দেবে কে? এখানে থাকলে কিছু হলেও ওষুধপথ্য পাবে। দোয়া করো ডাক্তারা যেন ছুটি না দেয়। আরও কিছুদিন থাকতে পারি।’
জানতে চাইলে জুলি আক্তার বলেন, তার স্বামী মতিঝিল এলাকার ফুটপাতে ঝালমুড়ি বিক্রি করতেন। প্রতিদিনের মতো গত ১৮ জুলাই জীবিকার তাগিদে বের হয়েছিলেন। ওইদিন পুলিশ ও ছাত্র-জনতার মাঝে পড়ে বাম পায়ে গুলিবিদ্ধ হন। ঢাকা মেডিকেলে নেওয়ার পর এখানে পাঠায়। ডাক্তাররা পায়ের আঙুলগুলো কেটে ফেলে কিছু ওষুধ দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেন। টানা পনেরো দিন ওষুধ খাওয়ানোর পরও কোনো উন্নতি হয়নি। উলটো ক্ষতস্থানে পচন ধরে। উপায়ান্তর না দেখে ৩১ জুলাই ফের এখানে নিয়ে এলে চিকিৎসকরা জানান, গ্র্যাংগ্রিন হয়ে গেছে! ভালো হতে সময় লাগবে! পচন না কমলে পায়ের আরও কিছু অংশ কেটে ফেলতে হতে পারে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে জুলি আক্তার আরও বলেন, ‘তিনি বছরখানেক আগে জুয়েলকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন। বর্তমানে ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা। অভাবের সংসারে শাশুড়ি অন্যের বাসায় কাজ করেন। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি (জুয়েল) পুলিশের গুলিতে পা হারাতে বসছে। ক্ষতের যন্ত্রণায় হাসপাতালে থাকতে চাইছেন না। গতকালও ডাক্তার ১০টি ইনজেকশন লিখেছে। যার প্রতিটির দাম ৬০০ টাকা করে। পাঁচটি ইনজেকশন হাসপাতাল থেকে দিলেও বাকিগুলো কিনে দিতে বলছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো টাকা জোগাড় করতে পারেননি। এমন পরিস্থিতিতে স্বামীকে বাড়ি নিয়ে গেলে খরচ জোগাবে কে? এই ভয়ে হাসপাতাল ছাড়তে চাচ্ছেন না।’
বৃহস্পতিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) ক্যাজুয়ালটি ১নং ওয়ার্ডে শয্যায় শুয়ে ব্যথায় ছটফট করছিলেন দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী নিশাদ হোসেন (১৬)। তিনি ঢাকায় আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে এসে গত ৫ আগস্ট মধ্য বাড্ডায় গুলিবিদ্ধ হন। তার ঊরুতে গুলি লাগে। ঢামেকে গিয়ে দেখা যায়, নিশাদের ক্ষতস্থান লোহার রড দিয়ে আটকানো। শয্যাপাশে বসা এক স্বজন জানান, বুলেটবিদ্ধ স্থানে পচন ধরেছে। ক্ষতস্থানের ঘা না শুকালে গুলি বের করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
নিশাদ হোসেন বলেন, ‘গুলিবিদ্ধ হওয়ায় আমার পুরো পরিবার থমকে গেছে। চিকিৎসা খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছে। এলাকার মানুষ এবং আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ঋণ করে চিকিৎসার খরচ চলছে। যেদিন ভর্তি হয়েছি সেদিনই পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং লোহার রড কিনতে ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এ পর্যন্ত ৬০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়েছে। এভাবে আর কতদিন চলব।
তিনি আরও বলেন, গত কয়েকদিনে ছাত্ররা কিছু অর্থ সহযোগিতা করেছিল। সরকারের কাছ থেকে কোনো ধরনের সাহায্য পাচ্ছি না। হাসপাতাল রিলিজ দিলে কীভাবে চিকিৎসা করাব সেই চিন্তায় পরিবারের সমস্যদের ঘুম হচ্ছে না।
গত ৩ আগস্ট মাগুরায় গুলিবিদ্ধ হয়ে বর্তমানে ঢামেকের ক্যাজুয়ালটি ১০২ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ইসরাফিল আলম। তার মা লাকী আক্তার যুগান্তরকে বলেন, ছেলের কাঁধে ও হাতে গুলি লেগে এখনো ভেতরে রয়ে গেছে। ডাক্তাররা কবে গুলি বের করবে কিছুই জানি না।
তিনি আরও জানান, ‘গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ২৫ হাজার টাকা অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে ঢাকায় আসতে হয়েছে। এখন পর্যন্ত লাখ টাকার বেশি খরচ হয়েছে। আমার স্বামী ভ্যানচালক। এত টাকা দিয়ে চিকিৎসার সামর্থ্য নেই। আত্মীয়স্বজন ও এলাকাবাসীর কাছ থেকে ধারদেনা করে কোনোরকমে খরচ চালাচ্ছি।’
ঢামেকে চিকিৎসক-নার্সরা বলেন, ক্যাজুয়ালটির তিনটি ওয়ার্ডে বর্তমানে প্রায় অর্ধশত রোগী ভর্তি। ছাত্রদের ডাকা অসহযোগ আন্দোলনে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটনায় হতাহত হয়ে ঢামেকে এসেছে। তাদের কারও বুকে, পেটে, কারও হাতে কিংবা পায়ে, কারও মাথায় গুলির জখম রয়েছে। আর আহতদের অধিকাংশই নিুআয়ের মানুষ। এই নিুবিত্ত পরিবারের আহতের চিকিৎসা খরচ বহন করতে হিমশিম খাচ্ছে পরিবারগুলো। ধারদেনা, সুদে ঋণ নিয়ে, ডিপিএস ভেঙে (মাসিক জমাভিক্তিক সঞ্চয়ী হিসাব), জমি বন্ধক কিংবা আত্মীয়দের সাহায্য নিয়ে আহতদের চিকিৎসা চলছে।
ঢাকা মেডিকেল ও পঙ্গু হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক বলছেন, সাম্প্রতিক সহিংসতায় আহতদের অনেকের অবস্থা খুবই খারাপ। তারা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারবে কিনা তা নিয়ে অনেকেই শঙ্কিত। গুরুতর আহত রোগীদের স্বাভাবিক জীবনযাপন যেমন বাধাগ্রস্ত হবে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।