|
কর্ণফুলির স্রোতে ভাসছে হাজার হাজার মরা মাছ, দায় নেবে কে?
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
![]() কর্ণফুলির স্রোতে ভাসছে হাজার হাজার মরা মাছ, দায় নেবে কে? সরেজমিনে বৃহস্পতিবার (৭ মার্চ) সকালে নৌকায় কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে দেখা যায়, বর্জ্যের কারণে কর্ণফুলি নদীর পানির রঙ তামাটে বর্ণ ধারণ করেছে। বেশি মাত্রায় পোড়া চিনি পড়ায় এর বিষাক্ত কেমিক্যালে নদীতে হাজার হাজার মাছ মরে ভেসে উঠছে। এরই মধ্যে টেংড়া, পুঁটি, শিং, মাগুর কাঁকড়া, পোয়া, কুচিয়া, রুই, সাপ ও ব্যাঙসহ আরও জলজ প্রাণী বিভিন্ন অংশে মরে পড়ে থাকতে দেখেছেন স্থানীয়রা। এর কারণে জীববৈচিত্র্য আরও হুমকির মুখে পড়ছে। অপরিশোধিত চিনি পুড়ে বিষাক্ত কেমিক্যালে রূপ নিয়ে নদী দূষণ হওয়াই হচ্ছে এর মূল কারণ করে জানান বিশেষজ্ঞরা। কর্ণফুলীতে এতো মাছ কেন মরছে? গত মঙ্গলবার (৫ মার্চ) রাত থেকে কর্ণফুলী, সিবিচ, চরপাড়া হালদা, কালুঘাট মধুরা পর্যন্ত এই বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ে। এরপর থেকেই নদীতে অক্সিজেন কমে মাছ মরা শুরু হয়। এ বিষয়ে স্থানীয় মাঝিরা জানান, এস আলম চিনির গুদামের পোড়া রাসায়নিক বর্জ্যের পুরোটাই নদীতে পড়ছে। এতে নদীর প্রায় ৩০০ প্রজাতির মাছ মারা যাচ্ছে। আমাদের দেশের সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। এর দ্রুত একটা সমাধান চান স্থানীয় মাঝিরা। এখন নদীতে আর কোনো জীবিত মাছ দেখা যাচ্ছে না, সব মরা মাছ ভাসছে। পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়ায় এমনটা হচ্ছে। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা জানান, চিনির দাহ্য পদার্থ যখন ৩৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে থাকে, তখন বিষাক্ত কেমিক্যালে রূপ নেয়। আর সেখানে পানি ছাড়া হলে অক্সিজেন ও হাইড্রোজেন কার্বন তৈরি হয়। যার কারণে কারখানায় আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। সেই আগুনে অপরিশোধিত চিনি গলে লাভা নদীতে এসে পড়ে। এতেই পানি দূষিত হয়ে অক্সিজেন কমে শ্বাস বন্ধ হয়ে মাছ মরছে। চিনির কেমিক্যালে নদী দূষণতো হয়েছেই; এছাড়া নদী দূষণের অন্যতম কারণ হলো ১৭টি খালের বর্জ্য ওই নদীতে এসে পড়ছে। স্থানীয় সাহাত মিয়া ও চাঁন মিয়া জানান, সুগার মিলের গুদামে চিনি পোড়া রাসায়নিক বর্জ্য কর্ণফুলি নদীতে পড়ে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া মিলের গুদাম ফুটো করায় বিষাক্ত বর্জ্য সড়কে এসে পড়ছে। এতে চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। গুদামের এ দূষিত পানি শরীরে লাগলে চুলকানি ও চর্মরোগও হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। সুগার মিলে থেমে থেমে এখনো জ্বলছে আগুন চট্টগ্রামের কর্ণফুলিতে এস আলম সুগার মিলের গুদামে লাগা আগুন প্রায় তিনদিনেও (৬৮ ঘণ্টা) পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বৃহস্পতিবার (৭ মার্চ) বেলা ১১টাতেও দেখা গেছে মিলের ভেতরে থেমে থেমে আগুন জ্বলছে। এ আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে আরও সময় লাগবে বলে জানায় ফায়ার সার্ভিস। চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা সহকারী পরিচালক এম ডি আবদুল মালেক জানান, চিনির গুদামের আগুন আর বাইরে ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা নেই। তবে ভেতরে এখনো থেমে থেমে আগুন জ্বলছে। পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে আরও সময় লাগবে। তিনি বলেন, সুগার মিলের চিনির কাঁচা রাসায়নিকের পোড়া গলিত বর্জ্য কারখানার ড্রেন দিয়ে সোজা কর্ণফুলিতে গিয়ে পড়ছে। এতে নদীর পানিতে বিষাক্ত কেমিক্যাল মিশে মরে ভেসে উঠছে মাছ। এ ছাড়া চারদিক থেকে গুদাম বদ্ধ থাকায় বর্জ্য দ্রুত বের হতে পারছে না। তাই দেয়ালে ১০টি ফুটো করা হয়েছে। সেখান থেকে গুদামের বিষাক্ত রাসায়নিক লাভা বের হচ্ছে। এতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। এস আলম সুগার মিল কর্তৃপক্ষ যা বললেন এস আলম সুগার মিলের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার হাসমত আলী জানান, কারখানার পুরো প্রসেস এবং কারখানা নিরাপদ রয়েছে। আগুন যাতে ছড়াতে না পারে, সেজন্য গোডাউন থেকে কারখানার মূল প্ল্যান্টে আসার বেল্ট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়েছে। এস আলম গ্রুপের এইচ আর ম্যানেজার মোহাম্মদ হোসেন জানান, প্রাথমিকভাবে কনভেয়ার বেল্টের ঘর্ষণজনিত তাপ কিংবা বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কর্ণফুলী দূষিত হিসেবে চিহ্নিত কেন? নদী ও খালরক্ষা কমিটির চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাধারণ সম্পাদক আলীউর রহমান সময় সংবাদকে বলেন, চট্টগ্রাম শহরের ৭০ লাখ মানুষের বর্জ্য ও দেড় শতাধিক কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য কর্ণফুলি নদীতে পড়ার কারণে এটি দেশের অন্যতম দূষিত নদী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বঙ্গোপসাগরের তীরে এই নদী। জোয়ার-ভাটায় খরস্রোতার কারণে এ নদী দূষণ থেকে কিছুটা বেঁচেছিল এবং এর কিছু মাছও পানিতে বেঁচেছিল। এ কর্ণফুলির তীরে সুগার মিলের বর্জ্যে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ আছে, এগুলো তরল হয়ে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় পানিতে এসে পড়ছে। যার ফলে আগুন লাগার পর যখন থেকেই সুগার মিলের পানি এসে নদীতে পড়ছে, তখন থেকেই মাছ মরা শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার থেকেই নদীতে প্রচুর মাছ মরে ভেসে উঠছে। এখন দেখছি, যেসব মাছ মাটির নিচে ডুবে থাকত, সেসবও মরে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা কিন্তু নিজেরাই নদীকে ধ্বংস করছি। এ কর্ণফুলি নদীর পানি চট্টগ্রাম শহরের ৭০ লক্ষাধিক মানুষের দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার হয়। ওয়াসা নগরীর বাসা-বাড়িতে কর্ণফুলির পানি সরবরাহ করে থাকে। এ রাসায়নিক দ্রব্য কর্ণফুলি হয়ে হালদায় যাওয়ার কারণে দুটি নদীর পানি ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে যাবে। উল্লেখ্য, এস আলম সুপার রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান কর্ণফুলি নদীর পাড়ে ইছানগর এলাকায়। প্রায় দশ হাজার বর্গফুটের এ গুদামটি পাঁচ তলা ভবনের সমান উঁচু। সোমবার বিকেল ৪টার দিকে কারখানার ওই গুদামের ছাদের দিকেই প্রথম আগুন দেখা যায়। পরে তা পুরো গুদামে ছড়িয়ে পড়ে। আগুন লাগার সময় কারখানাটি চালু ছিল। সেখানে প্রায় সাড়ে ৫০০ শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করেন। আগুন লাগার পর কারখানাটি বন্ধ করে দেয়া হয়। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
