জর্জিয়া, ইরাক, সিরিয়া ও আফগানিস্তানের পর এখন ইউক্রেন। প্রত্যেকটা জায়গাতেই পশ্চিমাদের ‘নীতি’ প্রায় একই। পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সংকটকালে কেটে পড়া। বন্ধুর বিপদে বুক পেতে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি শেষে পৃষ্ঠপ্রদর্শন। বিশ্লেষকরা বলছেন, একবার কিংবা দুইবার হলে এটাকে ‘ভুল’ বলে মেনে নেওয়া যেত। কিন্তু দশকের পর দশক ধরে সবাইকে এভাবেই ধোঁকা দিয়ে আসছে পশ্চিমারা। বহু বছর যাবৎ ধারাবাহিক দুর্ভাগ্যের শিকার কুর্দিরা। বর্তমানে কুর্দিদের সংখ্যা আড়াই কোটিরও বেশি। কিন্তু এদের মধ্যে দুই কোটি চল্লিশ লাখই অন্তত পাঁচটা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসবাস করে। দেশগুলো হচ্ছে তুরস্ক, ইরাক, ইরান, সিরিয়া ও আজারবাইজান। সবচেয়ে বেশি কুর্দি বসবাস করে তুরস্কে। দীর্ঘকাল ধরে তারা নিজেদের জন্য একটা স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য লড়াই করে আসছে। এই লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছে তুরস্কের কুর্দিদের সশস্ত্র রাজনৈতিক দল পিকেকে। ২০১২ সালে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হলে সিরীয় কুর্দি নেতাদের নানা আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতি দিতে থাকেন মার্কিন নেতারা। এমনকি কুর্দি-নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী গোষ্ঠী সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সের (এসডিএফ) সঙ্গে আইএসবিরোধী লড়াই শুরু করে মার্কিন বাহিনী। কুর্দি নেতারা ভাবতে শুরু করেন, মার্কিন ও তাদের মধ্যে যে ‘আস্থার সম্পর্ক’ গড়ে উঠেছে তা সহজেই ভাঙার নয়। বিপদে পড়লে নিশ্চিতভাবেই তাদের সাহায্য করবে ওয়াশিংটন।
কিন্তু তাদের সেই সম্পর্ক ভেঙে পড়তে খুব বেশি সময় নেয়নি। ২০১৯ সালের অক্টোবরে সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সীমান্তে সেনা সমাবেশ করে তুরস্ক। তথাকথিত ‘নিরাপদ অঞ্চল’ গঠনের নামে কুর্দি বসতিপূর্ণ এলাকায় আগ্রাসন শুরু করে। আঙ্কারা এই আগ্রাসন ঠেকাতে কুর্দি নেতারা তাদের শক্তিশালী মিত্র ওয়াশিংটনের সমর্থন প্রার্থনা করেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, কোনো মার্কিন কিংবা ন্যাটো সেনাই কুর্দিদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসেনি।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ার হামলার পর জঙ্গিগোষ্ঠী আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে ধরতে আফগানিস্তানে অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো। অভিযানের মধ্য দিয়ে তৎকালীন আফগান শাসক তালেবানদের উৎখাত করে অনুগত একটি সরকার প্রতিষ্ঠা করে তারা। কিন্তু দুই দশক পর নিজেদের হাতে গড়া সরকারকেই তালেবানের প্রবল হামলার মুখে ফেলে পালায় পশ্চিমা মিত্ররা। শুধু সিরিয়া কিংবা আফগানিস্তান নয়, এর আগে পশ্চিমাদের এমন পৃষ্ঠপ্রদর্শনের দৃষ্টান্ত দেখা গেছে জর্জিয়া ও ইরাকেও। আর সর্বশেষ সেই একই চিত্র দেখা গেল ইউক্রেনে।
গত সপ্তাহে ইউক্রেনে হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। কিন্তু বিপদের দিনে কাউকেই কাছে পাচ্ছে না ইউক্রেনের জনগণ ও সরকার। পশ্চিমা মিত্ররা তাদের বিভিন্ন আশ্বাস দিলেও লড়াইয়ে মাঠে নেই কেউ। এ নিয়ে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও। হামরার পরপরই জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আজ আমরা একা আমাদের দেশকে রক্ষার জন্য লড়াই করছি। গতকালের মতোই বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলো দূর থেকে কেবল সবকিছু দেখে যাচ্ছে।’ ইউক্রেনকে ন্যাটোর সদস্য করার আশ্বাসের পাশাপাশি সব ধরনের নিরাপত্তা সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের তার মিত্র দেশগুলো। পশ্চিমা নেতাদের এই প্রতিশ্রুতির ফাঁদে পা দিয়েছিলেন ইউক্রেনের নেতারা। যেমনটা বলছিলেন ‘ইউক্রেন অ্যান্ড রাশিয়া : আ ফ্রাটারনাল রাইভালরি’ বইয়ের লেখক আনাতোল লিভেন। পশ্চিমা এই বিশ্লেষক সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘ইউক্রেনকে সহযোগিতার ন্যূনতম ইচ্ছাও কখনোই ছিল না পশ্চিমের।