ঠিক যেনো ভিনি, ভিডি, ভিসি। এলেন, দেখলেন, জয় করলেন। চলচ্চিত্রের মানুষগুলোর সাথে ওনার হৃদয়ের বন্ধন বহু যুগের। এটা আমি নিজ চোখেই দেখেছি। কিন্তু প্রযোজনায় এলেন মাত্র কয়েক বছর আগে। এসেই খুব অল্প সময়ে অনেকগুলো সিনেমা প্রযোজনা করলেন। ব্যবসা সফল সিনেমা। তারমানে তিনি সিনেমা বোঝেন, প্রযোজনার ব্যাপারটাও বোঝেন।
ফরমান আলী ভাইর সাথে আমার প্রথম দেখা ১৯৯৯ সালে। কোথায় কিভাবে সেটা না হয় না-ই বললাম। প্রথম দর্শনেই বুঝে গেছি, অত্যন্ত পরিপাটি অথচ সাদামাটা জীবনের একজন দিলখোলা মানুষ তিনি। পরিচয়ের শুরুতেই ওনার সাথে আমার গভীর সম্পর্ক হওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ থাকা সত্বেও এটা হয়ে ওঠেনি। দোষটা আমার। কারণ আমার মাঝে তখন ভুলের রাজত্ব। ভুল করেছি ক্রমাগত। খেসারত দিয়েছি সুদে-আসলে। অথচ ফরমান ভাইর সাথে তখন থেকেই ঘনিষ্টতাটা হলে জীবনে আজ প্রাপ্তির পাল্লাটা অনেক ভারী থাকতো। কারণ, গুণী মানুষরা সব সময় সবাইকে সঠিক উপদেশ এমনকি দিক নির্দেশনা দেন।
যাই হোক, যখন ফরমান ভাইর সাথে প্রথম পরিচয় তখন আমি বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারী টিভি চ্যানেলের প্রতিষ্ঠাতা ও কর্ণধার। সিনেমা কিংবা প্রযোজনার চিন্তা তখন মগজে নেই। যদিও আমার আব্বা সত্তুরের দশকেই চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেছেন। ওই সূত্রে এফডিসির সাথে একটা সম্পর্ক তৈরী হয় যা সময়ের বিবর্তনে গভীরতর হয়েছে। চলচ্চিত্র এবং এফডিসির সাথে এক ধরনের আত্মার সম্পর্ক তৈরী হওয়া সত্বেও পরবর্তী কিছু ঘটনার কারণে আমি নিজেকে আর এফডিসির আত্মীয় ভাবিনি অনেক বছর।
২০১৫-১৬ সালের দিকে লোকমুখে শুনলাম ফরমান ভাই চলচ্চিত্র প্রযোজনায় এসেছেন। অফিস নিয়েছেন। মন চাইলো ওনার অফিসে যেতে। কিন্তু ওই সময়ে আমি কারাগারে। ২০১৮ সালের দিকে কাজের প্রচণ্ড ব্যস্ততার কারণে বিনোদন জগতের সাথে সম্পর্ক প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। ওই সময়ে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গুরুত্বপূর্ন দায়িত্বের বোঝা কাঁধে। রাতদিন খেটেছি। এমনও হয়েছে একটানা ৩-৪ দিন ঘুমাতেই পারিনি। এভাবেই ২০১৮ সাল কেটে গেলো। মাঝখানে একদিন তাজুল ইসলাম, চিত্র পরিচালক নুর মোহাম্মদ মনি ভাইসহ নাটক-সিনেমার কয়েকজনের সাথে এক দুপুরের মধ্যাহ্নভোজে কথা হলো। আমি সেদিনও তাজুলকে জিজ্ঞেস করলাম, ফরমান ভাই কেমন আছেন।
এরপর ২০১৯ সালের জুলাই মাস থেকে তাজুলের সাথে যোগাযোগ বেড়ে গেলো। কারণ জাতীয় শোক দিবসের কিছু কাজ ভুল কিছু লোকের হাতে দিয়ে আমি রীতিমত বিপদে। তাজুল রাতদিন খেটে কাজগুলো তুলে দিয়ে আমায় বাঁচালো। ওই সময়টায় আমার ঘনঘন বিদেশ যেতে হচ্ছিলো, কাজের প্রয়োজনে। তাজুলের সাথে দেখা হতো, কথা হতো ভিন্ন বিষয়ে। কিন্তু আমি ওর চোখে এক ধরনের তৃষ্ণা লক্ষ্য করতাম। ওই বছর অক্টোবর মাসে আমার বাসায় তাজুল এলো। দুপুরের খাওয়ার পর বিভিন্ন বিষয়ে আড্ডা। সন্ধ্যের পর হঠাৎ করেই সে বললো মিডিয়া কোম্পানী করার কথা। কাগজ-কলম নিয়ে হিসেব শুরু হলো। দেখলাম তাজুল বড় কিছু করতে একটু ইতস্তত। কারণ ও জানতো মিডিয়ার ব্যবসার অবস্থা তখন তেমন সুবিধাজনক অবস্থায় নেই। তাজুল ওর কর্ম পরিকল্পনায় কয়েকজন মানুষের নাম বললো। এদের এক-দুজন টেকনিশিয়ান। আমি নামগুলো নিয়ে ওই মুহূর্তে কিছু না বললেও মনেমনে সিদ্ধান্ত নিলাম, ওসব লোক দিয়ে কাজের কাজ হবেনা কিছুই। রাত প্রায় একটা অব্দি পরিকল্পনা চললো। বাজেটের খসড়া হলো। টাকার অংক দেখে তাজুল আবারও একটু চিন্তায় পড়ে গেলো। ও ভাবতে লাগলো, এতো টাকা নিয়ে ঝুঁকি নেয়াটা কি ঠিক হবে! আর্থিক দিক থেকে তাজুল সবসময় ভীষণ সৎ, এটা ওর সাথে ২০১০ সালে প্রথম পরিচয় হওয়ার পর থেকেই দেখেছি। একারণেই সে হয়তো এতগুলো টাকা ঝুঁকিতে ফেলতে চায়নি।
যাক, স্রষ্টার দয়ায় ক্রাউন এন্টারটেইনমেন্ট এর যাত্রা শুরু হলো। শুরুর দিকে যারা এসেছিলেন ওনাদের কেউই এখন আর ক্রাউন এর সাথে কাজ করছেন না। কারণ, ক্রাউন এর মতো নতুন একটা প্রতিষ্ঠান থেকে ওনাদের যেসব মতলত হাসিল করা সহজ ছিলো সেই পথটা ক্রমশ বন্ধ হয়ে গেলো, আমাদের অভিজ্ঞতা বাড়ার সাথেসাথে। যদিও এরই মাঝে বিরাট অংকের টাকা গচ্চা গেলো এবং আটকেও গেলো। সোজা কথায়, আমরা ঠকেছি। মানুষ ঠকেই শেখে। আমরাও শিখেছি। ২০২০ সালের মাঝামাঝি সময় থেকেই তাজুলের ব্যবসায়িক প্ল্যানিংগুলো যখন পরিপক্কতা পেতে শুরু করেছে ঠিক ওই সময়ে আমার অনুজপ্রতিম সাংবাদিক সৈয়দ ইকবাল একদিন এলো ক্রাউন অফিসে। ততোদিনে ইকবাল নাটকের এজেন্সী ব্যবসায় অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। যারা আমায় চেনে তারা বলাবলি করে, আমি নাকি মোহিনী যাদু জানি। হয়তো ওই যাদুতেই ইকবাল কাবু। বেড়াতে এসে ক্রাউন এর সাথেই বন্ধনে জড়িয়ে গেলো। ওর কারণেই প্রতিষ্ঠিত হলো ক্রাউন ক্রিয়েশনস্। আরেকজন মানুষ ওই সময়ে সর্বাত্মক সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দিলো। শাহেদ হোসেন। আমার খুব স্নেহের একজন। ফ্যাক্টর থ্রি সল্যুশনস্ নামের এজেন্সীর কর্ণধার। ক্রমশ ক্রাউন পরিবার এগিয়ে যেতে লাগলো।
আমাদের ব্যবসায়িক প্রতিপক্ষ ছিলেন টেলিহোম-এর আলী বশির ভাই। একদিন হঠাৎ করেই উনি ক্রাউন অফিসে এলেন, কেক নিয়ে। ওনার ব্যবহারে আমি মুগ্ধ। সেই থেকে বশির ভাইর সাথেও ক্রাউন এর গভীর সম্পর্ক। এক সময়ের প্রতিপক্ষ হয়ে গেলেন আমাদেরই একজন।
আমি দুষ্টুমি করে বলি, ক্রাউন অফিসটা হচ্ছে কামরূপ কামাক্ষা। এখানে একবার কেউ এলে আর মুক্তি নেই। তাজুল, ইকবাল, রানা ওরা মজা করে বলে, আমি নাকি ওই কামরূপ কামাক্ষার মূল যাদুকর। আমিও এটা মেনে নিই হাসিমুখে। মানুষকে মমতার বন্ধনে আটকে ফেলতে পারলে সমস্যা কোথায়!
চলতি বছর একদিন ফরমান ভাই ক্রাউন অফিসে পদধূলি দিলেন। ওনাকে কাছে পেয়ে আমার আনন্দের শেষ নেই। উনিও ক্রাউন এর সাফল্য দেখে খুশী হলেন। আমি জানি, ফরমান ভাই একবার যখন কামরূপ কামাক্ষায় পা রেখেছেন তখন আমাদের মায়ার জাল থেকে ওনার আর মুক্তি নেই। এখন নিয়মিত নানা বিষয়ে আমি ফরমান ভাইর পরামর্শ নিই। কারণ আগেই বলেছি, তিনি গুণী মানুষ, ভালো মানুষ।
কেউকেউ বলে, সীমানাহীন স্বপ্ন দেখতে নেই। আমি এটা মানিনা। আমার স্বপ্নের পরিধি বরাবরই আকাশের সীমানা ছড়িয়ে যায়, সৌরলোকের সীমানাও অতিক্রম করে। কারণ আমি বিশ্বাস করি, জীবনে অসম্ভব বলে আসলেই কিছু নেই। সবই সম্ভব। শুধু অবিচল থাকতে হয় স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে। বেপরোয়া হতে হয় কখনো-কখনো। স্রষ্টার দয়ায় ক্রাউন এগিয়ে যাচ্ছে, যাবে। আমাদের সামনে আরো বিশাল পরিকল্পনা আছে। ইনশাআল্লাহ এগুলোও এক-এক করে পূরণ হবে। মাঝেমাঝে ভাবি একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর কর্মক্ষেত্র থেকে অবসর নেবো। গতকালও সারারাত ভেবেছি কথাটা। তারপর মনে হয়েছে, সাবেক সাংবাদিক বলে কোনো শব্দ পৃথিবীর অভিধানে নেই। তাহলে কিসের অবসর? কাজ করে যেতে হবে জীবনের শেষ মুহূর্ত অব্দি। একদিন মানুষ আমার কথা মনে করে বলবে, আমাদের মিডিয়ায় এক মোহিনী যাদু জানা শোয়েব চৌধুরী ছিলো। আমিও দৃষ্টির অন্তরালে থেকে মুচকি হাসবো। হয়তো মন চাইলে স্রষ্টার কাছ থেকে কাগজ কলম নিয়ে লিখতে বসবো গান, কবিতা কিংবা গল্প। মিডিয়ার জন্যে আমার ভালোবাসা শেষ হবেনা জন্ম-জন্মান্তরে।
সালাহ উদ্দিন শোয়েব চৌধুরী, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পুরস্কারপ্রাপ্ত জঙ্গিবাদ বিরোধী সাংবাদিক, গবেষক, কলামিষ্ট এবং প্রভাবশালী ইংরেজী পত্রিকা ব্লিটজ-এর সম্পাদক