খুনের মামলায় আসামি না হয়েও প্রায় তিন বছর কারাভোগ করে গত ১৬ জুন চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান মিনু আক্তার (৩০)। কারামুক্তির ১৩ দিনের মাথায় এবার তিনি জীবন থেকেই মুক্তি পেলেন।
গত ২৮ জুন দিবাগত রাতে চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী ফৌজদার হাট সংযোগ সড়কের আরেফিন নগর এলাকায় দ্রুতগতির একটি ট্রাক মিনুকে চাপা দিয়ে পালিয়ে যায়। ট্রাকচাপায় গুরুতর আহত হন তিনি। খবর পেয়ে তাঁকে উদ্ধার করে পুলিশ। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করা হয়। সেখানে ২৯ জুন ভোরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। কোনো পরিচয় না পাওয়ায় এক দিন পরে অজ্ঞাত হিসেবে তাঁর লাশ দাফন করে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম। গতকাল শনিবার রাতে পুলিশ ও পরিবার নিশ্চিত হয় যে অজ্ঞাত হিসেবে দাফন করা লাশটি মিনুর।
বায়েজিদ বোস্তামী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ কামরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ট্রাকচাপায় মারা যাওয়া নারীর পরিচয় শনাক্তের জন্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজখবর করা হয়। পরে তাঁর ছবি দেখে একজন শনাক্ত করেন যে এই নারীর নাম মিনু। তাঁর ভাইকে খুঁজে বের করে ছবি দেখানো হলে তিনিও মিনুকে শনাক্ত করেন।
মিনুর বড় ভাই মো. রুবেল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার বোনকে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যা করা হয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানাচ্ছি। তাঁকে যাঁরা জেলে পাঠিয়েছিলেন, তাঁরা এই ঘটনায় জড়িত কি না, তার তদন্ত হওয়া উচিত। আমার বোনের সন্তানদের এখন কী হবে, তা নিয়ে চিন্তায় আছি।’
ওসি মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, এই ঘটনায় পুলিশ অজ্ঞাতপরিচয়ের ট্রাকচালকের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। ট্রাকচালককে শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এই ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
‘সাজা কুলসুমার, খাটছেন মিনু’ শিরোনামে গত ২৩ মার্চ প্রথম আলোয় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদন প্রকাশের দিনই চট্টগ্রামের চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মামলাটি হাইকোর্টে বিচারাধীন থাকায় প্রতিবেদন পাঠান। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকৃত আসামির পরিবর্তে আরেকজন সাজা ভোগ করছেন। পরে উচ্চ আদালতের নির্দেশে গত ১৬ জুন চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান মিনু।
মুঠোফোন নিয়ে কথা-কাটাকাটির জেরে ২০০৬ সালের ৯ জুলাই চট্টগ্রাম নগরের রহমতগঞ্জ এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় পোশাককর্মী কোহিনুর বেগমকে হত্যা করা হয়। ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর এই মামলার রায়ে কুলসুমাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। প্রকৃত আসামি কুলসুমা আক্তার মামলার সাজা হওয়ার আগে ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত কারাগারে ছিলেন। সাজা হওয়ার পর ২০১৮ সালের ১২ জুন কুলসুমা সেজে মিনু কারাগারে আসেন।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ তত্ত্বাবধায়ক মো. শফিকুল ইসলাম খান জানান, কারা রেজিস্টারে থাকা দুজনের ছবির মিল ছিল না। এই বিষয়টি নজরে আসার পর লিখিতভাবে আদালতকে জানানো হয়। পরে তিনি মুক্তি পান।
মুক্তির পর মিনু প্রথম আলোকে বলেছিলেন, মর্জিনা আক্তার নামের পূর্বপরিচিত এক নারী তাঁকে টাকা দেওয়ার কথা বলে কারাগারে যেতে বলেন। তিনি কুলসুমাকে চিনতেন না। কিন্তু ভয়ে কাউকে কিছু বলেননি।
মিনুর বড় ভাই মো. রুবেল জানান, তাঁর বোন মানসিক প্রতিবন্ধী ছিলেন। তিন সন্তানসহ তাঁর বোনকে অনেক আগেই ফেলে চলে যান স্বামী। সন্তানদের মানুষ করতে মিনু কখনো ভিক্ষা করতেন, আবার কখনো মানুষের বাসায় কাজ করতেন। মিনু কারাগারে থাকাকালে গত মে মাসে তাঁর ছোট্ট মেয়ে জান্নাতুল মারা যায়। জান্নাতের জন্মের পরপরই মিনু কারাগারে যান। স্থানীয় শাহাদাত হোসেন নামের এক ব্যক্তি জান্নাতকে লালন-পালন করছিলেন। মিনুর আরেক সন্তান মো. গোলাপ (৭) সীতাকুণ্ডের জাফরাবাদ ইমাম হোসাইন হাকিমিয়া লোকমানিয়া সুন্নিয়া হেফজখানা ও এতিমখানায় থাকে। আর বড় সন্তান মো. ইয়াছিন (১০) একটি দোকানে কাজ করে।
মিনুর ভাই বলেন, কারাগার থেকে মুক্তির পর মিনু এখানে-সেখানে ঘোরাঘুরি করতে থাকেন। পরে শুরু করেন ভিক্ষা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে বাঁচতে পারল না।
মো. ইয়াছিন বলে, ‘বাবার চেহারা মনে পড়ে না। মা তিন বছর জেলে ছিল। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর মা-ও চলে গেল। আমাদের তো কেউ রইল না।’
নিরপরাধ মিনুর কারামুক্তির জন্য আইনি সহায়তা দিয়েছিলেন চট্টগ্রামের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী গোলাম মাওলা মুরাদ। আজ রোববার সকালে তিনি বলেন, কারাগার থেকে মুক্তির পর জীবন থেকেও মুক্তি পেলেন মিনু। ট্রাকচাপায় তাঁর মৃত্যুর পেছনে কেউ জড়িত আছেন কি না, তা তদন্ত হওয়া উচিত।