ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
শনিবার ১৬ মে ২০২৬ ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
ভূমিদস্যু নিরু: ক্রেতা ফ্ল্যাট বুঝে পেলেও ব্যাংক তুললো নিলামে
নুতন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Saturday, 13 February, 2021, 12:49 PM
সর্বশেষ আপডেট: Saturday, 13 February, 2021, 12:57 PM

ভূমিদস্যু নিরু: ক্রেতা ফ্ল্যাট বুঝে পেলেও ব্যাংক তুললো নিলামে

ভূমিদস্যু নিরু: ক্রেতা ফ্ল্যাট বুঝে পেলেও ব্যাংক তুললো নিলামে

কোম্পানিটি ফ্ল্যাটগুলো ক্রেতাদের রেজিস্ট্রি করে দিয়েছে। ক্রেতারা ফ্ল্যাট বুঝেও পেয়েছেন। নিজেদের মতো সাজিয়ে থাকতেও শুরু করেছেন কেউ কেউ। হঠাৎ একদিন বাসায় এক ব্যাংক কর্মকর্তা হাজির। তার হাতে কিছু কাগজপত্র। জানালেন, এই ফ্ল্যাটগুলো বন্দক রেখে ব্যাংক থেকে গৃহঋণ নেওয়া আছে। যিনি ঋণ নিয়েছেন তিনি টাকা পরিশোধ করছেন না, ঋণখেলাপি। ব্যাংক বাড়িতে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দিলো, অর্থঋণ আদালতে মামলাও করলো। আদালত ফ্ল্যাটগুলো নিলামে বিক্রি করে ব্যাংকের টাকা পরিশোধ করার রায় দিলেন। এখন কেবল নিলাম হওয়াটাই বাকি। কিন্তু যারা ফ্ল্যাট কিনে থাকছেন, তারা কোনও বন্ধকি ঋণই নেননি। চুক্তি অনুযায়ী হোমল্যান্ড রিয়েল এস্টেট লিমিটেড এর কাছ থেকে ৭৬ জন ব্যক্তি ফ্ল্যাটগুলোর মূল্য পরিশোধ করে ক্রেতা।

সূত্রে জানা যায়, রাজধানী ঢাকার রামপুরা থানার বনশ্রী সোসাইটিতে ৩২ টি বাড়ীর ৭৬টি  ফ্ল্যাট হোমল্যান্ড রিয়েল এস্টেট লিমিটেড নামে একটি কোম্পানির কাছ থেকে কিনে বড় ধরণের প্রতারণার শিকার হয়েছেন ফ্ল্যাট ক্রেতারা। হোমল্যান্ড রিয়েল এস্টেট লিমিটেড-এর মালিক এমডি নুরুল কবির নিরু বনশী প্রজেক্টের বাড়ী মালিক সমিতিরও সাধারণ সম্পাদক।

ক্রেতাদের দাবি, ফ্ল্যাটের ভুয়া রেজিস্ট্রেশন দেখিয়ে তাদের কাছে বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে হোমল্যান্ড রিয়েল এস্টেট লিমিটেড। আবার ব্যাংক থেকে লোনও নিয়েছে। জীবনের যাবতীয় সঞ্চয় বিনিয়োগ করে এসব মানুষ এখন মারাত্মক বিপাকে। বিভিন্ন জায়গায় অভিযোগ করেও পাচ্ছেন না প্রতিকার।

এতকিছুর পরও কোম্পানির মালিকসহ সংঘবদ্ধ প্রতারকরা এখনো ধরা ছোয়ার বাইরে রয়েছে।

ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো, ২০১০/১২ সাল থেকে রামপুরা বনশ্রীর ৩২টি প্লটের মালিকের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিতে অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ শুরু করে হোমল্যান্ড রিয়েল এস্টেট লিমিটেড। এসব বাড়ি নির্মাণের আগেই ফ্ল্যাট বুকিং শুরু হয়। কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী ৩২টি বাড়ির ৭৬টি ফ্ল্যাট ক্রেতা হোমল্যান্ড রিয়েল এস্টেট লিমিটেড থেকে কেনেন। টাকা পরিশোধের পর সবাইকে রেজিস্ট্রিও বুঝিয়ে দেন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল কবির নিরু। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি  ফ্ল্যাটের কাজ শতভাগ শেষ না করেই ক্রেতাদের বুঝিয়ে দেয়। ক্রেতারা রেজিস্ট্রি করে নেওয়ার পর নিজেরাই বাকি কাজ করিয়ে ধীরে ধীরে ফ্ল্যাটে ওঠেন। তবে ২০১৬ সালের এপ্রিলের  মাঝামাঝি ফ্ল্যাট মালিকরা জানতে পারেন, হোমল্যান্ড রিয়েল এস্টেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল কবির নিরু বিভিন্ন মানুষের কাছে বিক্রি করা এসব ফ্ল্যাট বন্ধক রেখে পূবালী ব্যাংক থেকে ১২ কোটি টাকা এবং ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামি ব্যাংক লিমিটেড থেকে চার কোটি টাকা গৃহনর্মিাণ ঋণ নেয়। তবে ফ্ল্যাট নির্মাণ ও ফ্ল্যাটে ওঠার সময় এসব ভবনে কোনো ব্যাংকের গৃহঋণ সংশ্লিষ্ট কোনও সাইনবোর্ড ছিল না।

ক্রেতাদের অভিযোগ, ফ্ল্যাট ও জমির মূল কাগজপত্র ব্যাংকে জমা রেখে ক্রেতাদের ভুয়া দলিল দিয়ে ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দিয়েছে কোম্পানিটি।

এমন একজন ফ্ল্যাট ক্রেতা আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমি বনশ্রীর বি-ব্লকের ৪ নম্বর সড়কের ১৬ নম্বর বাড়ির এ-৩ ফ্ল্যাটটি কিনেছি। এই ভবনে আমার সঙ্গে আরো চারজন রয়েছেন। যারা প্রত্যেকেই ১১২০ স্কয়ারের একটি করে ফ্ল্যাট কিনেছেন। প্রত্যেকেই টাকা পরিশোধ করেছেন। কিন্তু ২০১৬ সালে হঠাৎ একদিন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আমাদের ভবনের ফ্ল্যাট ও জমির বিপরীতে তিন কোটি টাকা ঋণ আছে বলে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয়। সুদসহ যা এখন চার কোটি টাকার বেশি হয়েছে। ঋণ পরিশোধ না করায় বাড়ি নিলামে ‍উঠেছে বলেও ব্যাংক আমাদের জানায়।’

তিনি বলেন, ‘এরপর আমরা নুরুল কবিরকে বিষয়টি জানাই। কিন্তু চার বছর ধরেও তিনি এর সুরাহা করেননি। একটার পর একটা তারিখ দিয়ে যাচ্ছেন। তাকে আমরা ব্যাংকের টাকা পরিশোধের জন্য বারবার অনুরোধ করেছি। কিন্তু তিনি কিছুই করেননি।’

ফ্ল্যাট বিক্রি করে ক্রেতাদের কাছ থেকে পুরো টাকা নিয়ে দলিল করে দিয়েছেন। আবার সেই ফ্ল্যাটের কাগজপত্র বন্ধক রেখে ব্যাংকঋণ নিয়েছেন। যা দেশের প্রচলিত আইনে অবৈধ।

আবদুর রাজ্জাক আরও বলেন, “ফ্ল্যাটের মূল দলিল ব্যাংকে জমা দিয়েই ঋণ নিয়েছিলেন তিনি। এরপর রেজিস্ট্রি অফিস ‘ম্যানেজ’ করে আমাদের ফ্ল্যাটের নিবন্ধন করিয়েছেন। আইনত রেজিস্ট্রি অফিস তা করতে পারে না।”

তিনি বলেন, ‘আমরা ব্যাংকে যাই। নুরুল কবিরকেও বলেছি। ব্যাংক তাকে ১৮ মাসের সময়ও দিয়েছে। এই সময়ের মধ্যে ৪ কোটি ৩০ লাখ ২০ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হবে। তা না হলে ফ্ল্যাট নিলামে উঠবে।’

মাহবুবুল আলম নামে আরেক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, ‘একই ফ্ল্যাটের দুই সেট কাগজপত্র করে ব্যাংক ও আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে ফ্ল্যাট নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানটি। এর সঙ্গে রেজিস্ট্রি অফিসও জড়িত থাকতে পারে। তা না হলে কীভাবে আমাদের দলিল দিলো? হয়তো আমাদের ভুয়া রেজিস্ট্রেশন দিয়েছে। নয়তো ব্যাংকে জাল কাগজ দিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘নুরুল কবীর নিজে বনশ্রী সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক। তার কোম্পানি হোমল্যান্ড রিয়েল এস্টেট লিমিটেড এই সোসাইটিতে অনেক ভবন নির্মাণ করেছে। সবকটিতেই ফ্ল্যাট বিক্রির ক্ষেত্রে এমন জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন তিনি।’

ভুক্তভোগী শারমিন জাহান মৃধা, সমির সেন গুপ্ত, শমসের আলী, আবদুল মান্নান, মাসুমা খাতুন, আশরাফ ইমতিয়াজুর রহমান, জসীম উদ্দিনসহ আরও অনেকেই এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরকারের বিভিন্ন দফতরের লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

ইশরাত শিউলি নামে একজন নারীর কাছ থেকে ধার নেওয়ার কথা বলে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে নুরুল কবির নিরুর স্বজনরাও পালিয়েছেন। ভুক্তভোগী এই নারী জিডি করেছেন (জিডি নম্বর ১০০৫)। যা এখন তদন্তাধীন।

জালিয়াতির বিষয়ে নুরুল কবিরের কাছে জানতে চাইলে তিনি গণমাদ্ধমকে বলেন, ‘আমি সবকিছু ব্যাংকে ক্লিয়ার করে দিয়েছি। এখন কোনও ঝামেলা নেই। এগুলো ষড়যন্ত্র।’

সরকারের বিভিন্ন দফতরে নুরুল কবির নীরুর বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়ার বিষয়টি জানেন না রামপুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল কুদ্দুস ফকির গণমাদ্ধমকে বলেন, ‘বিভিন্ন দফতরে অভিযোগ দিলেও আমাদের থানায় জমিজমা বা ফ্ল্যাট সংক্রান্ত কোনও মামলা নেই।’


পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status