মো. হুমায়ূন কবির গাজী। তার কাছে বার্ধক্য কোনো বাধা নয়। সত্তরোর্ধ্ব বয়সী এ মানুষটি কৃষকের সন্তান। তিনি ১৯৭৩ সালে এইচএসসি পাস করার পর ১৯৮৩ সালে ইউনিয়ন পরিষদ সচিব পদে চাকরিতে যোগ দেন। দীর্ঘ ২৯ বছর সফলতার সঙ্গে মঠবাড়িয়ার তুষখালী ও ভান্ডারিয়ার তেলিখালী ইউনিয়ন সচিব পদে চাকরি শেষে ২০১১ সালে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন। এরপর নিজের চাকরি ও পেনশনের ১০ লাখ টাকা ও কুয়েত প্রবাসী ছেলের কাছ থেকে ধার নেয়া ১৩ লাখ টাকাসহ মোট ২৩ লাখ টাকা নিয়ে বসতবাড়িসহ আশপাশের পতিত ১২ একর জমিতে মাছের ঘের, সবজি ও ফলদ গাছ রোপণ করে গড়ে তোলেন সমন্বিত কৃষি খামার।
মঠবাড়িয়ার বলেশ্বর নদ তীরবর্তী ছোট মাছুয়া গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা মো. হুমায়ূন কবির সমন্বিত কৃষি খামার গড়ে তুলে এ জেলায় আত্মনির্ভরশীলতার এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ কৃষি ও কৃষকের জীবন তছনছ করে দেয়। সেই সঙ্গে নদী তীরের গ্রামে জলোচ্ছ্বাস নিয়ে আসে লবণের আগ্রাসন। ফসল মার খায়, সেই সঙ্গে পোকা মাকড়ের উপদ্রব নিত্য-নৈমত্তিক বিষয় হয়ে উঠে। ঘূর্ণিঝড় সিডর আর আইলায় উপকূলীয় কৃষকদের ঘুরে দাঁড়াতে সমন্বিত কৃষি খামার জরুরি। এ বিষয় মাথায় রেখেই হুমায়ূন কবির সমন্বিত কৃষি আবাদের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে সক্ষম হন। চাষাবাদে সফলতা অর্জন করে তিনি আজ এলাকায় লাখপতি কৃষকের পরিচিত পেয়েছেন।
ইউনিয়ন পরিষদের চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেয়া সফল কৃষক হুমায়ূনের মতে মাছ, গাছ, ফল আর সবজির সমন্বিত আবাদ করে যে কেউ এমন উৎপাদনে সফল হতে পারেন।
ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলায় বিপর্যস্ত ছোট মাছুয়া গ্রামের সফল কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রমে গ্রামটি এখন আদর্শ গ্রামে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে হুমায়ূন কবিরের রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও ফরমালিং মুক্ত ঘেরের মাছ, লবণ সহিষ্ণু ক্ষেতের সবজি ও বাগানের রসালো ফল মঠবাড়িয়া, ভাণ্ডারিয়া ও শরণখোলাসহ এ অঞ্চলের চাহিদা মেটায়। উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারজাত করে কৃষি খরচ বাদে তার বছরে আয় হচ্ছে ১৫-২০ লাখ টাকা। তাকে অনুসরণ করে পতিত জমিতে মাছ সবজি ও ফল চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন এলাকার অনেক বেকার যুবক চাষি।
এ কৃষি খামারির অধিকাংশ জমি পৈতৃক হলেও বাৎসরিক বন্ধকেও কিছু জমি এ খামারের আওতায় রয়েছে। মোট ১২ একর জমির প্রায় ৭ একর জমিতে মাছ চাষের পুকুর ও সাড়ে ৩ একর জমিতে সবজি ও দেড় একর জমিতে ফলদ গাছ। ঘেরের বেড়িবাঁধে সারিবদ্ধভাবে লাগানো হয়েছে কুল, পেঁপে, কলা ও আমসহ বিভিন্ন ফলদ গাছ। পুকুর পাড়ে তৈরি করা হয়েছে ক্ষেত। এ ক্ষেতে চাষ করা হয়েছে মৌসুমী সবজি পাতা কপি, মিষ্টি কুমড়া, শিম ও করলা।
কৃষক হুমায়ুন কবির জানান, ২০১১ সালে প্রথম এ কৃষি খামার শুরুর করার পর প্রথম দু’ বছর লাভের ফসল ঘরে ওঠেনি। তবে ২০১৪ ও ২০১৫ সালে লাভজনক হয়ে ওঠে চাষাবাদ। চলতি বছর শুরুতেই উন্নত মানের মনোসেক্স তেলাপিয়া ও পাঙাশ মাছ আসতে শুরু করে। প্রতিদিন ঘের থেকে মৌসুমী ফলসহ প্রায় ৪০ হাজার টাকার ফল বিক্রি হয়। প্রতিদিন ২০ বস্তা মাছের খাবার ২২ হাজার টাকা, সবজি পরিচর্যা ২ হাজার ও শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য খরচসহ ২৫ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে। গড়ে প্রতিদিন হুমায়ূনের লাভ থাকছে ১০-১২ হাজার টাকা।
তিনি আরো জানান, ঘেরের পানির তলদেশে মাছের খাবারের পরিত্যক্ত অংশ ও মাছের মল মূত্রের পলি মাটি প্রতি চৈত্র, বৈশাখ ও জৈষ্ঠ মাসে সেচ দিয়ে শুকিয়ে ১ থেকে দেড় ফুট পলি কাদা উঠিয়ে রোদে শুকিয়ে কম্পোষ্ট সার এবং নিজের গরুর গোবরের জৈব সার ক্ষেতে দিয়ে সবজি ক্ষেত তৈরি করেন। এ সময় মাছের ঘেরের পুকুরে চুন, ইউরিয়া ও খৈল দিয়ে নতুন পোনা ছাড়ার জন্য পুকুর তৈরি করা হয়। ক্ষেতে পোকা নিধন প্রযুক্তি সেক্সফেরোমোন ফাঁদ ব্যবহার করছেন। প্রতিদিন মাছের খাবার এখানে সেখানে ছিটিয়ে রাখায় পরিবেশ বান্ধব পাখি ওখানে বসবাস করে এবং এইসব পাখিও পোকা নিধন করে।
মঠবাড়িয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাজিরা খাতুন বলেন, আমি কৃষি খামারটি পরিদর্শন করেছি। মো. হুমায়ূন কবির গাজী একজন পরিশ্রমী ও সফল কৃষক। তিনি তার বসতবাড়ির আশপাশে পতিত ১২ একর জমিতে মাছের ঘের, সবজি ও ফলদ গাছ রোপণ করে গড়ে তুলেছেন সমন্বিত কৃষি খামার। লেবু জাতীয় ফসলের সম্প্রসারণ, ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন প্রকল্পের আওতায় কৃষক হুমায়ূনকে আমাদের পক্ষ থেকে সহায়তা করা হচ্ছে।