করোনাভাইরাস বিশ্বে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। চীন থেকে সংক্রমিত হওয়া নতুন করোনাভাইরাস থেকে সৃষ্ট ‘কোভিড-১৯’ রোগে আক্রান্ত হয়ে বুধবার পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪ হাজার ২৯৯ জনে দাঁড়িয়েছে।
ওয়ার্ল্ডওমিটাররের তথ্যানুসারে, এ পর্যন্ত ১ লাখ ১৯ হাজার ২২৫ জন আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৬৬ হাজার ৫৬৯ জন পুরোপুরি সুস্থ হয়েছেন এবং ৪৮ হাজার ৩৫৭ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১১৯টি দেশ ও অঞ্চলে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রাণঘাতী মারাত্মক এ রোগের সাথে যারা লড়াই করছেন তেমন কয়েকজন তাদের কষ্টকর অনুভূতি প্রকাশ করেছে।
তাদের একজন যিনি বন্ধুর বিয়েতে যোগদানের জন্য অস্ট্রেলিয়া গিয়েছিলেন তাকেও কোয়ারেন্টাইনে নেওয়া হয়।
লন্ডনের বাসিন্দা ব্রিজেট উইলকিনসকে অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়। গত সপ্তাহে বন্ধুর বিয়ের জন্য সিঙ্গাপুর হয়ে অস্ট্রেলিয়া গিয়েছিলেন। করোনা ভাইরাস পরীক্ষায় পজেটিভ আসলে তাকে ব্রিসবেনের একটি হাসপাতালে আলাদা করে রাখা হয়।
২৯ বছর বয়সী ওই নারী বলেন, যে লক্ষণগুলোর সম্মুখীন হয়েছিলেন তার মধ্যে মাথা ব্যথা, গলা ব্যথা ও ক্লান্ত অবস্থায় ছিলেন।
এসব সমস্যা যে ভাইরাসে আক্রান্তের ফলে হয়েছে তা তিনি বুঝতে পারেননি। তিনি মনে করেছিলেন- দীর্ঘ ভ্রমণের কারণে এমন লাগছিল।
অস্ট্রেলিয়ার ৭নিউজের সাথে কথা বলার সময় তিনি বলেন, তার এখনো ঐ লক্ষণগুলো রয়েছে এর বেশি কিছু না।
করোনা ভাইরাসের লক্ষণ বর্ণনা করতে যেয়ে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি আমাদের শান্ত হতে হবে, কারণ বেশিরভাগ লোকের মতো বা আমার মতো, এটা এমন দীর্ঘ শীতকালীন অবস্থা যাতে আমাদের কাঁপাকাপি শুরু হয়।
চীনের উহান শহরে বসবাসকারী ব্রিটেনের নর্থ ওয়েলসের বাসিন্দা কর্নার রিড প্রথম করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ব্রিটিশদের একজন।
করোনা ভাইরাসের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, গত বছরের নভেম্বরে তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। যা চীনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রাদুর্ভাব ঘোষণারও এক মাস আগে। তিনি ভেবেছিলেন তার মারাত্মক কোনো রোগ হয়েছে।
তিনি তার ডায়েরিতে লিখেছিলেন, ২৪ দিন অসুস্থ থাকার পরে যে হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছিল সেখান থেকে তাকে বলা হয় যে তিনি করোনায় আক্রান্ত প্রথম ব্যক্তিদের একজন। যে ভাইরাসটি এখন কোভিড-১৯ নামে পরিচিত।
২৫ বছর বয়সী এই ইংরেজি শিক্ষক তার ডায়রিতে লিখে রেখেছিলেন যে কীভাবে তিনি এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। প্রথমে তিনি গরম হুইস্কি ও মধু দিয়ে প্রথমে নিরাময়ের চেষ্টা করেছিলেন। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে তিনি ভেবেছিলেন তার মারাত্মক কোনো ফ্লু হয়েছে।
‘এটি এখন কেবল ঠান্ডা নয়। আমি সারা শরীরে ব্যাথা অনুভব করেছি, আমার মাথা অস্বাভাবিকভাবে ধড়ফড় করছিল, চোখে প্রচণ্ড জ্বালাপোড়া ছিল, আমার গলা চেপে আসছিল’।
১১ দিনের মাথায় মনে করেছিলাম ফ্লু চলে গেছে। কিন্তু পরের দিন আরো বেশি ‘আক্রোশ’ নিয়ে ফিরে এসেছিল।
তিনি বলেন, আমি ঘামছিলাম, ভেতরটা জ্বলছিল আর কাঁপছিলাম। রুমে টেলিভিশন চালু থাকার পরেও আমি বুঝতে পারছিলাম না। আমার জন্য ‘এটি একটি দুঃস্বপ্ন’ ছিল।
তিনি আরো বলেন, আমি যখন আমার ভেতরে শ্বাস নিয়ে ছেড়ে দিচ্ছিলাম তখন ফুসফুসের ভেতরে মনে হচ্ছিল কাগজের প্যাকেট চূর্ণবিচূর্ণ হচ্ছে। এসময় আমি দেরি না করে ডাক্তারের স্মরণাপন্ন হই।
ডাক্তার দেখানোর পর কয়েক ঘন্টা ধরে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তাকে বলা হল নিউমোনিয়ার কথা। কয়েক দিন পর নিউমোনিয়া ভালো হয়ে গেলেও উন্নতির লক্ষণ দেখা গেল না। তিনি বলেন, সাইনাসিসে প্রচণ্ড রকম ব্যথা হচ্ছিল, কান মনে হয় ফুটছিল। আমার তখন কিছুই করার ছিল না কিন্তু তারপরেও আমি কটন বাড দিয়ে কান চুলকানোর চেষ্টা করছিলাম যাতে ব্যথা কমে যায়।
এর কয়েকদিন পর তিনি সুস্থ হয়েছিলেন বলে জানান।
গত বছরের ডিসেম্বর মাসে প্রথম থাই নাগরিক হিসেবে করোনভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন ৭৩ বছরের নারী জাইমুয়ে সায়ে-উং।
তার হার্টের সমস্যাসহ বিভিন্ন ধরণের রোগে আক্রান্ত থাকার পরেও জাইমুয়ে করোনা থেকে মুক্ত হতে পেরেছিলেন।
তার লক্ষণগুলোর মধ্যে জ্বর ও কাশি ছিল। তাকে কোয়ারেন্টাইনে নেয়ার পর নিউমোনিয়ায় আকান্ত হয়েছিলেন। এসময় তার পরিবার মনে করেছিল যে তিনি হয়তো বাঁচবেন না।
করোনায় আক্রান্ত এই সাত সন্তানের মা স্কাই নিউজকে বলেন, হাসপাতালে আসার পরে আমি জানতাম (আমার করোনভাইরাস হয়েছে)। আমি খারাপ লাগছিল, কিছুটা হতবাক হয়ে গেছিলাম। আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম এবং কিছুই খেতে পারছিলাম না।
জাইমুয়ে বলেছিলেন যে তিনি হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদের সাথে তর্ক করেছিলেন কারণ তিনি মনে করছিলেন তার সেখানে থাকার দরকার নেই। এর ১০ দিন পর তার অবস্থার উন্নতি হয়েছিল এবং দুটি পরীক্ষার ফলাফল নেগেটিভ আসার পরে তাকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।