|
ব্যবসায়ী বাবার কণ্যা তৃণার ডেসডিমোনা'র গল্প
সাকিব আল রোমান
|
![]() ব্যবসায়ী বাবার কণ্যা তৃণার ডেসডিমোনা'র গল্প ২০১৬ সালে ইউনিভার্সিটি অফ লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ থেকে ইংরেজি বিভাগে গ্র্যাজুয়েশান করেছেন। ইউরোপীয়ান স্টার্ন্ডাটে খণ্ডকালীন শিক্ষিকা হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন একদা। পেশা হিসেবে শিক্ষককতাকেই বেছে নিয়েছিলেন এই রমণী। গ্র্যাজুয়েশন করার আগেই কর্মজীবনে পা বাড়িয়েছেন তৃণা। ফিনল্যান্ডের একটি মাল্টিন্যাশানাল কোম্পানিতে কর্মরত হওয়ার মধ্য দিয়ে প্রথম কর্মজীবন শুরু করেন সাবরিন। আউট সোর্সিং এর কাজটা সেখান থেকেই রপ্ত করেছেন। মাঝপথে থিসিস (১২তম সেমিস্টার) চলাকালীন চাকরি ছাড়তে কিছুটা বাধ্য হয়ে হয় এই তরুণীকে। পড়াশুনায় মনোনিবেশ করেন নিজেকে। ![]() ব্যবসায়ী বাবার কণ্যা তৃণার ডেসডিমোনা'র গল্প সাবরিন বলেন, কখনও ভাবিনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে ব্যবসাতে জড়াবো। স্টুডেন্ট থাকা অবস্থায় আমি এক আপুর সাথে পাকিস্তানি লনের ব্যবসা করতাম। দ্রিক গ্যালারি, ডাব্লিউ ভি এ তে মেলা করতাম। তখন শখের বসে করতাম। খুব বেশি টাকা পেতাম না। হাত খরচটা আসতো। ২০১৫ তে কি মনে করে আমি একটা বিজিনেস গ্রুপ খুলি। আর নাম দেই "ডেসডিমোনা" ( Desdimona)। এই নাম দেয়ার কারন হলো, আমি যখন ইংরেজি সাহিত্য পড়তাম শেক্সপিয়ারের "ডেসডিমনা" চরিত্রটা আমার খুবই ভালো লাগে। তাই এই নামটি আমি নির্বাচন করেছিলাম। আমার এক আপু মালেয়শিয়াতে থাকতো তার থেকে প্রডাক্টের ছবি নিয়ে আপলোড করতাম। টুকটাক অর্ডার পেতাম। এইভাবে চলতে থাকলো। ![]() ব্যবসায়ী বাবার কণ্যা তৃণার ডেসডিমোনা'র গল্প তিনি আরও বলেন, ২০১৬ তে আমি একটি বাংলা মিডিয়াম স্কুলে জয়েন করি ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে। এর পাশাপাশি আমার অনলাইন ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। ঠিক ৬ মাসের মাথায় এত রেসপন্স পাবো কখনো ভাবতে পারিনি। আপুর ব্যবসা আর আমার ব্যবসা দু'টাই এক সাথে দেখাশুনা করতাম। আস্তে আস্তে এত অর্ডার বেড়ে গেলো হিমসিম খেতাম। স্কুলের জব, কোচিং এ ক্লাস নেয়া, টিউশনি করা আর এর পাশে ব্যবসা। আমি রাত ৩টা পর্যন্ত ডেলিভারির প্রোডাক্ট প্যাক করতাম। যেহেতু কোন ডেলিভারিম্যান ছিলো না, দুরের এবং ঢাকার বাহিরের ডেলিভারি আমি সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দিতাম। আর মোহাম্মোদপুর, আদাবর, লালমাটিয়া, শ্যামলিতে আমি স্কুল শেষে নিজেই ডেলিভারি দিতাম। স্মৃতিচারণ করে তৃণা বলেন, আমার আব্বুও একজন ব্যবসায়ী। আমি যখন রাত জেগে প্রোডাক্টের কাজ করতাম তখন আমার আব্বুও আমাকে সাহায্য করতো। আর আমি ব্যবসার কাজে দেশের বাহিরে যখন যাই আমার আম্মু আর আমার ছোট বোন দেখাশুনা করতো বা এখনো করে। প্রোডাক্ট প্যাক করা, ডেলিভারি বয়কে প্রোডাক্ট দেয়া এই সবই তারা দু'জন মিলেই করে। আমার এই ব্যবসার কথা আমার আব্বু-আম্মু ও বোন সবাইকে বলে। এমন অনেক দিন ছিলো যখন বৃষ্টিতে কাক ভেজা হয়েছি, রোদে পুড়েছি, জ্বর নিয়ে প্রোডাক্ট ডেলিভারি দিতে গিয়েছি। কয়েকবার ডেলিভারি দিতে গিয়ে টিপস ও পেয়েছি। বিষয়টা মজাও লেগেছিল খুব। আস্তে আস্তে আমার ব্যবসার ব্যস্ততা অনেক বেড়ে যায়। আমার মা আমাকে সব সময় বলতেন জবটা প্রথম প্রায়োরিটি করি। ব্যবসাটা শখই যেন থাকে। তবে, অন্যদিকে ব্যস্ততা বেড়ে যাবার কারণে আমি জবটাই ছেড়ে দেই। এরপর ব্যবসায় নেমে পড়ি। প্রডাক্ট ডেলিভারির জন্য আমার সাথে ৪টা ছেলে কাজ করতো। এরা সবাই স্টুডেন্ট ছিল। মালেয়শিয়া থেকে সাপ্তাহে ২/৩ বার শিপিং আসতো। আমি সব কিছুর অর্ডার নিতাম। খাবার, ব্যাগ, ড্রেস, জুতা, কসমেটিক্স, যে যেটা অর্ডার দিতেন সবই আনতাম। এর মধ্যেই মাথায় আসলো যদি ইন্ডিয়া থেকে প্রডাক্ট আনা যেত তাহলে খুবই ভালো হতো। যাই হোক বাসায় বললাম। আম্মু-আব্বু প্রথমে একটু মানা করেছিল। একা একা যাবো তাই। পড়ে তারা আমার ব্যবসার ক্রাউড দেখে আর আমার উপর বিশ্বাস ছিলো বলেই তারা রাজি হয়। আমি এটা বলবো, আমার বাবা-মা আমাকে অনেক অনুপ্রেরণা দিতেন। ডেসডিমোনা'র প্রধান নির্বাহী বলেন, তখন ইন্ডিয়ার প্রি-অর্ডার নেয়া শুরু করি। ২০১৭ সালে আমি প্রথম ইন্ডিয়া যাই আমার ইউনিভার্সিটির এক বান্ধবির সাথে। আর আগেতো আম্মু আব্বুর সাথে গিয়েছিলাম। একা একা ফরেন দেশে দেশে গিয়ে কেনা কাটা করা, সব কিছু খুজে বের করা আমার জন্য একটু কষ্টকর ছিল। কিন্তু, প্রথম হিসেবে আমার প্রফিট যা হয়েছিল, খারাপ বলবো না। এর পর থেকে আমি আমার গ্রুপে ইন্ডিয়ার বিজনসের জন্য অনেক সাড়া পাই। আমি ইন্ডিয়াতে রেগুলার যাওয়া শুরু করলাম। ২০১৮ তে আমি আবার একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে জবের অফার পাই। সেখানে দীর্ঘ ৭মাস জব করার পর আমি নিয়োজিত হই ইউরোপীয়ান স্টার্ন্ডাটে। স্কুলে জব করতে গিয়ে আমি আমার ব্যবসায়ে একটুও সময় দিতে পারি নাই। যার ফলে ৮ মাসের একটি গ্যাপের তৈরি হয়েছিল। 'নতুন সময়'র এই প্রতিবেদককে তৃণা জানান, আমি আবার আগের মতো উঠে পড়ে লাগলাম ব্যবসার পিছে। একটু সময় লেগেছিলো। আবার শুরু করলাম ইন্ডিয়ার অর্ডার নেয়া। ব্যাস, দিন রাত আমি গ্রুপের মেম্বার বাড়ানোর জন্য আবার গিভএওয়ে শুরু করলাম (যদিও এটা আমি আগেও করেছিলাম)। এর মধ্যে আমি সবার নজরে পড়ে গেলাম। সবাই আবার আগের মতো অর্ডার দেওয়া শুরু করলেন। যে যেটা আমাকে অর্ডার দেয় সবই আনি। আলহামদুলিল্লাহ। এই পর্যন্ত আমি সর্বোমোট ৮ বার একা একা ইন্ডিয়ায় গিয়েছি। এখন আমাকে ইন্ডিয়াতে (কলকাতার) মোটামোটি অনেকেই চিনে। তারা আমাকে সত্যি অনেক সাহায্য করেন। ওখানে গেলে মনেই হয় না অপরিচিত কেউ। যদিও কলকাতায় আমার কিছু আত্মীয় থাকেন। ![]() ব্যবসায়ী বাবার কণ্যা তৃণার ডেসডিমোনা'র গল্প সাবরিনের ব্যক্তিত্ব: আমার মোটিভ, আমাদের দেশের মানুষকে বেষ্ট কোয়ালিটির প্রোডাক্ট দেয়া রিজিনেবল দামে। যেন সবাই সবার সাধ্যমত কিনতে পারে। আমি মনে করি, এক জন ব্যবসায়ীকে সৎ হতে হবে। মানুষ ঠকিয়ে ব্যবসা করাটা উচিত নয়। আমি সব সময় বলি আমরা রেপলিকা ড্রেস অথবা জুতা বা ব্যাগ ব্যবহার করতে পারি কিন্তু কসমেটিকস নয়। আমি কখনওই এমন কিছুই আনি না যা দিয়ে অন্যের ক্ষতি হয়। আমি যা সেল করি প্রতিটা জিনিস আমি আগে নিজের জন্য ক্রয় করি। ব্যবহার করে দেখি এরপর অর্ডার নেই। আজকে সৎ পথে আছি বলেই, সবাই আমাকে বিশ্বাস করে। আমার খুব কষ্ট লাগে আমি যখন কিছু কিছু অর্ডার ক্যান্সেল করে দেই। ওয়েটের জন্য অনেক কিছুই আনতে পারি না। মানবিক তৃণা : আমার কাছে আমার কাস্টমারা হলো প্রথম প্রায়োরিটি। আমি মনে করি আজকে তারা আমাকে বিশ্বাস না করলে অথবা ভালো না বাসলে আমি এই পর্যায়ে আসতে পারতাম না। আমাকে তারা এত ভালোবাসে অনেকে আমার জন্য গিফট ও পাঠিয়ে দেয়। হ্যা, এটা সত্যি কিছু ফেইক সেলারদের জন্য অনেকে বিশ্বাস করতে চায় না। তাদেরকে বিশ্বাস করাতে একটু কষ্ট হয়। ডেসডিমোনা'র নির্বাহীর শুকরিয়া : পরিশেষে এটাই বলবো, আজকে আমি যা, তার জন্য মহান আল্লাহর দরবারে কোটি বার শুকরিয়া আদায় করি। এরপর আমার বাবা-মা-বোন ও আমার ক্রেতাদের অবদান। কারন, আমার বাবা-মা-বোন সবসময় সমর্থন করেছে। আর আমার কাস্টমাররা আমাকে বিশ্বাস করেছে। আমাকে কায়সার আহম্মেদ অনেক সাহস ও সমর্থন দিয়েছেন, তাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই। আত্মবিশ্বাস: সবচেয়ে ভালো লাগে, বাহিরে গেলে যখন আমাকে অনেকেই বলে "আপু, তুমি তৃণা না? তুমি ডেসডিমোনার এ্যাডমিন না?" বিশ্বাস করুন, এই অনুভবটা যে কেমন তা হয়তো বুঝাতে পারবো না। আমার জন্য দেয়া করবেন যেন আমি আপনাদেরকে বেষ্ট প্রোডাক্ট দিতে পারি। সব সময় ডেসডিমোনার (Desdimona) সাথেই থাকবেন। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
