|
সস্তা শ্রমের তামাশা বন্ধ হোক
পোশাক শ্রমিকের মজুরি আসলে কত হওয়া উচিত?
নাজমুল হক শ্যামল
|
![]() পোশাক শ্রমিকের মজুরি আসলে কত হওয়া উচিত? গত কয়েক বছর ধরে যেভাবে লাগাতার মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে, সেখানে শ্রমিকের প্রকৃত আয় প্রতি মাসে কমেছে। এই অবস্থায় প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—পোশাক শ্রমিকদের মজুরি আসলে কত হওয়া উচিত? বর্তমানে শ্রমিকরা ন্যূনতম ৩০,০০০ টাকা মজুরির দাবিতে আন্দোলন করছেন এবং সরকার একটি নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। কিন্তু মালিকপক্ষ এবং এক শ্রেণীর অর্থনীতিবিদ প্রতিবারের মতোই মুখস্থ যুক্তি সাজাচ্ছেন—"মজুরি এত বাড়ালে নাকি শিল্প টিকবে না, ভিয়েতনাম বা কম্বোডিয়ার সাথে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে।" আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতার দোহাই দিয়ে কতদিন দেশের নাগরিকদের ক্ষুধার্ত রাখা যাবে? ভিয়েতনামে ন্যূনতম মজুরি যেখানে প্রায় ১৭৫ ডলার আর চীনে ৩৩৭ ডলার, সেখানে আমাদের দেশে ১০১ ডলারের সমপরিমাণ মজুরি দিতেও মালিকদের বুক কাঁপে কেন? তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকরা যখন প্রতি বছর নতুন গাড়ি আর বিলাসী জীবনযাত্রার মান ধরে রাখতে পারেন, তখন কারখানার ভেতরে দিনরাত খেটে চলা মানুষটি কেন তার সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে পারবে না, কেন দুবেলা পুষ্টিকর খাবার জোগাতে হিমশিম খাবে? অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করলে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি কোনোভাবেই ১২,৫০০ টাকায় থাকা উচিত নয়। একে কেবল "শ্রমিকের দাবি" হিসেবে দেখলে ভুল হবে, এটি বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার। একজন শ্রমিকের ঘরভাড়া, চিকিৎসা খরচ, সন্তানের পড়াশোনা এবং চারজনের একটি পরিবারের খাদ্যের ন্যূনতম ব্যয় হিসাব করলে এই অঙ্কটি মোটেও বিলাসিতা নয়। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শ্রম সংস্থা এবং লিভিং ওয়েজ কোয়ালিশনের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে একটি পরিবারের মর্যাদাপূর্ণভাবে বেঁচে থাকার জন্য এর চেয়েও বেশি অর্থের প্রয়োজন। মালিকপক্ষকে বুঝতে হবে, শ্রমিকদের ক্ষুধার্ত রেখে, তাদের ওপর লাঠিচার্জ করে বা কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে কারখানায় দীর্ঘমেয়াদি শান্তি আনা সম্ভব নয়। সস্তা শ্রমের ওপর ভিত্তি করে কোনো টেকসই শিল্প গড়ে উঠতে পারে না। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে দরকষাকষি করুন, নিজেদের মুনাফার অংশ কিছুটা ছাড়ুন, কিন্তু শ্রমিক ঠকানোর এই সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। সদ্য গঠিত মজুরি বোর্ডের উচিত হবে মালিকদের কর্পোরেট স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে বাজারের নির্মম বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া এবং অবিলম্বে শ্রমিকদের জন্য একটি সম্মানজনক ও মানবিক মজুরি কাঠামো ঘোষণা করা। অন্যথায়, এই অসন্তোষের আগুন শুধু রাজপথেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা পুরো অর্থনীতিকে গ্রাস করতে পারে।
|
| « পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ » |
