ই-পেপার সোমবার ● ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
রোববার ● ১১ অক্টোবর ২০২৬ ● ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩
রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতি, ধর্মীয় অনুভূতি ও আমাদের বিবেকের কিছু কথা
ফাহিম ফরহাদ, গাজীপুর
প্রকাশ: Sunday, 11 October, 2026, 10:55 AM

রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতি, ধর্মীয় অনুভূতি ও আমাদের বিবেকের কিছু কথা

রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতি, ধর্মীয় অনুভূতি ও আমাদের বিবেকের কিছু কথা

একজন মানুষকে কি কেবল তাঁর বাহ্যিক বেশভূষা দিয়ে বিচার করা যায়? যদি বাহ্যিক অবয়বই মানুষের বিশ্বাস, আদর্শ কিংবা পরকালীন পরিণতি নির্ধারণের মাপকাঠি হতো, তাহলে অভিনয়শিল্পীরাই হয়তো সবচেয়ে বেশি ধর্মপরায়ণ হিসেবে বিবেচিত হতেন! অথচ মানুষের প্রকৃত পরিচয় শুধু তাঁর পোশাকে, দাড়িতে কিংবা বাহ্যিক অবয়বে সীমাবদ্ধ নয়; তাঁর চিন্তা, কর্ম, আচরণ ও মানবিকতাও সেই পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাড়ি ছিল—এটি তাঁর বাহ্যিক অবয়বের একটি বৈশিষ্ট্য। কিন্তু সেই দাড়িকে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা কিংবা তাঁর বিশ্বাস সম্পর্কে সিদ্ধান্ত টানা কতটা যুক্তিসংগত? বাহ্যিক সাদৃশ্য কখনোই কারও ধর্মীয় বিশ্বাসের চূড়ান্ত প্রমাণ হতে পারে না। মানুষের অন্তরের প্রকৃত অবস্থা সৃষ্টিকর্তাই ভালো জানেন—এমন বিশ্বাস তো ধর্মীয় শিক্ষারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তাহলে প্রশ্ন জাগে, একজন প্রয়াত কবির গ্রাফিতি কিংবা প্রতিকৃতি দেখেই আমরা কেন এত দ্রুত বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখাতে উদ্যত হই? কেন ভিন্ন ধর্ম, মত কিংবা দর্শনের মানুষের প্রতি সহনশীলতার জায়গাটুকু হারিয়ে ফেলি? মতের অমিল থাকতেই পারে, কারও দর্শন বা জীবনবোধের সঙ্গে দ্বিমতও থাকতে পারে। কিন্তু সেই দ্বিমত প্রকাশের ভাষা কি অসম্মান, বিদ্বেষ কিংবা বৈরিতা হতে হবে?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেবল একটি নাম নন; বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে তাঁর রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। তাঁর সব চিন্তা বা দর্শনের সঙ্গে প্রত্যেকের একমত হওয়া জরুরি নয়।

কিন্তু তাঁর সাহিত্যকর্ম, সৃষ্টিশীলতা ও ঐতিহাসিক অবদানকে মূল্যায়ন করা এবং তাঁর প্রতি ব্যক্তিগত বা ধর্মীয় বিদ্বেষ পোষণ করা—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। সমালোচনা হতে পারে যুক্তির ভিত্তিতে, প্রতিবাদ হতে পারে শালীন ভাষায়; কিন্তু অসম্মান কখনোই যুক্তির বিকল্প হতে পারে না।

রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতি, ধর্মীয় অনুভূতি ও আমাদের বিবেকের কিছু কথা

রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতি, ধর্মীয় অনুভূতি ও আমাদের বিবেকের কিছু কথা

আমি নিজেও ইসলামে বিশ্বাসী। সেই বিশ্বাস থেকেই মনে করি, ধর্মের সৌন্দর্য কেবল কথায় নয়, মানুষের আচরণেও প্রকাশিত হওয়া উচিত। অন্য ধর্মের অনুসারী কিংবা ভিন্ন মতের মানুষকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে নিজের ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা যায় না। বরং ন্যায়বোধ, সংযম, সহমর্মিতা, ভদ্রতা ও মানবিকতার চর্চাই মানুষের ধর্মীয় মূল্যবোধকে সুন্দরভাবে তুলে ধরে।

পৃথিবীর বহু জ্ঞানী, বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, দার্শনিক ও আবিষ্কারক ভিন্ন ভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল থেকে উঠে এসেছেন। তাঁদের সবার বিশ্বাস এক নয়, জীবনদর্শনও এক নয়। তাই বলে তাঁদের অবদান থেকে শিক্ষা নেওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যেতে পারে না।

অন্যের ভালো কাজকে স্বীকার করা মানে নিজের বিশ্বাস বিসর্জন দেওয়া নয়; বরং নিজের চিন্তার পরিসরকে আরও সমৃদ্ধ করা।
আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ একটি বহুধর্মীয় ও বহুমতের মানুষের দেশ। এখানে প্রত্যেক নাগরিকের ধর্মীয় অনুভূতি, বিশ্বাস ও মর্যাদার প্রতি সম্মান দেখানো জরুরি।

আজ আমরা যদি অন্য দেশে আমাদের ধর্মাবলম্বীদের প্রতি অন্যায় আচরণের অভিযোগে ব্যথিত হই, তাহলে নিজের দেশেও অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি ন্যায়বিচার ও সম্মান নিশ্চিত করার দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারি না। অন্যের কাছ থেকে যে সম্মান প্রত্যাশা করি, নিজের আচরণেও সেই সম্মানের প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন।

কোনো গ্রাফিতি, প্রতিকৃতি কিংবা সাংস্কৃতিক উপস্থাপনা নিয়ে আপত্তি থাকলে তা যুক্তি, আলোচনা ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের মাধ্যমে প্রকাশ করা যায়। আইন ও শৃঙ্খলার প্রশ্ন থাকলে তার সমাধানও হওয়া উচিত আইনসম্মত প্রক্রিয়ায়। আবেগের বশে কিংবা অন্যের প্ররোচনায় নিজের হাতে বিচার তুলে নেওয়া কোনোভাবেই দায়িত্বশীল নাগরিকের পরিচয় হতে পারে না।

আরেকটি প্রশ্নও আমাদের বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন—কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়ালে তার প্রকৃত সুফল কারা পায়? কে লাভবান হয়, আর ক্ষতিটাই বা কার হয়? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি, তবে প্রমাণ ছাড়া কাউকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কর্মকাণ্ডের জন্য দায়ী করাও সমীচীন নয়।

ধর্মের মর্যাদা রক্ষার নামে এমন কোনো আচরণ করা উচিত নয়, যা মানুষের মনে ধর্ম সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে। আমাদের কথা, কাজ ও ব্যবহার যেন আমাদের বিশ্বাসের সৌন্দর্য প্রকাশ করে—বিদ্বেষের কারণ না হয়।

আমি বিশ্বাস করি, শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় অন্যকে ছোট করার মধ্যে নয়; বরং নিজের আচরণকে সুন্দর করার মধ্যেই নিহিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হোন কিংবা অন্য কোনো ধর্ম, মত বা দর্শনের মানুষ—তাঁদের মূল্যায়নে আমাদের যুক্তিবোধ, মানবিকতা ও ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখা উচিত।

আসুন, মতের পার্থক্যকে শত্রুতায় পরিণত না করি। ধর্মীয় বিশ্বাসকে বিদ্বেষের হাতিয়ার না বানিয়ে মানবিকতার শক্তিতে পরিণত করি। অন্যের বিশ্বাসকে সম্মান করেও নিজের বিশ্বাসে অবিচল থাকা যায়—এই সহজ সত্যটি উপলব্ধি করি।

কারণ, আমাদের পরিচয় শুধু আমরা কী বিশ্বাস করি, তা দিয়ে নয়; আমরা সেই বিশ্বাসের আলোকে মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করি, তা দিয়েও প্রকাশিত হয়।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status