সরকারি বা বেসরকারি খাত—কোথাও কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি খুব একটা ভালো নয়। এমন সময়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগপত্র পেয়েও ৯১৮ প্রার্থী চাকরিতে যোগ দেননি। সরকারি চাকরির তীব্র প্রতিযোগিতা, সুযোগ-সুবিধা ও চাকরির নিরাপত্তার কারণে যেখানে সরকারি চাকরিকে দীর্ঘদিন ধরে ‘সোনার হরিণ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেখানে নিয়োগপত্র পেয়েও এত বিপুল প্রার্থীর যোগ না দেওয়ার বিষয়টি বিস্ময় তৈরি করেছে।
সহকারী শিক্ষক পদটি সরকারি বেতনকাঠামোর ১৩তম ধাপের (গ্রেড)। ২০২৬ সালের নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী, এ পদে শুরুতে ভাতাসহ মোট বেতন হবে সর্বনিম্ন প্রায় ৩৬ হাজার টাকা। ফলে বেতনের দিক দিয়ে চাকরিটি আগের চেয়ে আকর্ষণীয়।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ধারণা করছেন, যোগ না দেওয়া প্রার্থীদের অনেকেই হয়তো অন্য কোনো চাকরি করছেন বা অন্য কোনো কাজে যুক্ত আছেন। সে কারণেই নিয়োগপত্র পেয়েও তাঁরা এ চাকরিতে যোগ দেননি। তবে যোগ না দেওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি।
চট্টগ্রাম জেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত ও সুপারিশ পেয়েছিলেন ৫৫১ জন। তাঁদের মধ্যে ২৪ জন কাগজপত্র জমা দেননি। আর নিয়োগপত্র পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েছিলেন ৫২৭ জন। তাঁদের মধ্যে ৫২৫ জনকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়। দুজন নিয়োগপত্র পাননি। কিন্তু নিয়োগপত্র পাওয়া প্রার্থীদের মধ্যে ৬৪ জনই যোগ দেননি।
‘নয় শতাধিক প্রার্থী সহকারী শিক্ষক পদে যোগ না দেওয়ায় অধিদপ্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে চাকরিতে যোগ দেওয়া না–দেওয়া সবার ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিষয়। ধারণা করা যায়, এসব প্রার্থী হয়তো এর চেয়ে ভালো চাকরি পেয়েছেন।’
চট্টগ্রাম জেলার মতো দেশের ৬১ জেলা মিলিয়ে ৯১৮ প্রার্থী নিয়োগপত্র পেয়েও চাকরিতে যোগ দেননি। ১ অক্টোবর ছিল যোগদানের দিন। যাঁরা যোগ দিয়েছেন, উপজেলা পর্যায়ে তাঁদের চাকরিবিষয়ক পরিচিতিমূলক (ওরিয়েন্টেশন) কার্যক্রম চলছে। যোগদান করা নতুন শিক্ষকদের বিদ্যালয়ে পদায়ন করা হবে ১১ অক্টোবর। সাধারণত নির্ধারিত সময়ে যোগদান না করা ব্যক্তিদের এ চাকরিতে যোগ দেওয়ার আর সুযোগ থাকে না। নিয়োগ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ২০২৫-এর ফলাফলের ভিত্তিতে ৬১ জেলায় ১৪ হাজার ৩৮৫টি পদে নিয়োগের জন্য পরীক্ষা হয়। পরীক্ষার ভিত্তিতে মোট ১৪ হাজার ৩৮৪ জনকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের একেবারে শেষ সময়ে, জাতীয় নির্বাচনের আগমুহূর্তে গত ৮ ফেব্রুয়ারি এ নিয়োগের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। নিয়ম অনুযায়ী এরপর যাচাই (ভেরিফিকেশন) করে চূড়ান্ত নিয়োগ দেওয়ার কথা।
প্রথমে ২৪ সেপ্টেম্বর নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের তালিকা প্রকাশ করে প্রতিটি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়। কিন্তু দেখা যায়, আগে সুপারিশ পাওয়া বিপুলসংখ্যক প্রার্থীর নাম নিয়োগের প্রথম তালিকায় ছিল না। তখন সুপারিশ পাওয়া প্রার্থীদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, বাদ পড়া প্রার্থীর সংখ্যা দুই হাজারের বেশি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সুপারিশপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ গোয়েন্দা সংস্থার নেতিবাচক (বিরূপ) মন্তব্যের কারণে প্রথম তালিকায় নিয়োগপত্র পাননি। তখন বাদ পড়া চাকরিপ্রার্থীরা নিয়োগের দাবিতে ঢাকার শাহবাগসহ বিভিন্ন জেলায় আন্দোলন করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। গণমাধ্যমেও এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর বাদ পড়া প্রার্থীদেরও ধীরে ধীরে নিয়োগের তালিকায় যুক্ত করা শুরু করে সরকার। অবশেষে অধিকাংশ প্রার্থীই নিয়োগপত্র পান। তারপরও কেউ কেউ বাদ থেকে গেছেন।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সূত্রমতে, সর্বশেষ হিসাবে ৬১ জেলায় ৮০ জনের বেশি প্রার্থীকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি। তাঁদের কারও কারও বিরুদ্ধে মামলাসহ অন্য কিছু জটিলতা আছে।
এর মধ্যে ১ অক্টোবর নিয়োগপত্র পাওয়া ব্যক্তিদের যোগ দেওয়ার দিন নির্ধারিত ছিল। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, নির্বাচিত প্রার্থীদের মধ্যে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ পেতে কাগজপত্র জমা দিয়েছিলেন ১৩ হাজার ৮৩১ জন। ৫৫৩ জন জমা দেননি। অর্থাৎ তাঁরা নিয়োগের পরবর্তী ধাপেই না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
কাগজপত্র জমা দেওয়া প্রার্থীদের মধ্যে ১৩ হাজার ৭৪৮ জনকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়। এর মধ্যে চাকরিতে যোগ দিয়েছেন ১২ হাজার ৮৩০ জন। অর্থাৎ নিয়োগপত্র পাওয়া ৯১৮ প্রার্থী এ চাকরিতে যোগ দেননি। বাকিরা নিয়োগপত্র পাননি।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, এ সংখ্যা দু-একজন কমবেশি হতে পারে।
কেউ চাকরিতে যোগ দেবেন কি না, সেটি তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু এত প্রার্থীর যোগ না দেওয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিদ্যমান শিক্ষকসংকটের মধ্যে নতুন সংকট তৈরি করতে পারে। কারণ, একটি নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ করে নতুন শিক্ষক পেতে যথেষ্ট সময় লাগে।
দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৬৫ হাজার ৫৬৭টি। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীসংখ্যা এক কোটির বেশি। শিক্ষক রয়েছেন পৌনে চার লাখের মতো। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকটও দিন দিন বাড়ছে। প্রধান শিক্ষকের ৩৬ হাজারের বেশি পদ এখনো শূন্য। অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। পাশাপাশি সহকারী শিক্ষকেরও কয়েক হাজার পদ শূন্য রয়েছে। প্রয়োজনীয় শিক্ষক না থাকায় অনেক বিদ্যালয়ে স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।
এর মধ্যে গত জুলাইয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শূন্য থাকা ৩৬ হাজারের বেশি প্রধান শিক্ষকের পদে পদোন্নতির প্রক্রিয়া শুরুর কথা জানিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।
বর্তমান নিয়োগবিধি অনুযায়ী, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে ৮০ শতাংশ নিয়োগ হয় সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতির মাধ্যমে। সরাসরি নিয়োগ হয় ২০ শতাংশ। ফলে শূন্য থাকা ৩৬ হাজার ২৩৫টি প্রধান শিক্ষক পদে সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতি দেওয়া হলে সহকারী শিক্ষকের বিপুলসংখ্যক পদও শূন্য হবে।
এ অবস্থায় চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে নিয়োগপত্র পেয়েও ৯১৮ জন প্রার্থীর চাকরিতে যোগ না দেওয়া প্রাথমিক শিক্ষার শিক্ষকসংকটে নতুন মাত্রা যোগ করছে। একই সঙ্গে চাকরির বাজারে মন্দার সময়ে যেখানে একটি চাকরির জন্য হাহাকার, সেখানে সরকারি চাকরি পেয়েও এত প্রার্থীর যোগ না দেওয়ার কারণও প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. আবদুর রহিম প্রথম আলোকে বলেন, নয় শতাধিক প্রার্থী সহকারী শিক্ষক পদে যোগ না দেওয়ায় অধিদপ্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে চাকরিতে যোগ দেওয়া না–দেওয়া সবার ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিষয়। ধারণা করা যায়, এসব প্রার্থী হয়তো এর চেয়ে ভালো চাকরি পেয়েছেন। অনেকে একই সময়ে একাধিক চাকরির চেষ্টা করে থাকতে পারেন। তাঁদের কাছে যে চাকরি ভালো মনে হয়েছে, শেষ পর্যন্ত সেটিই বেছে নিয়েছেন। কমবেশি সব চাকরির নিয়োগের ক্ষেত্রেই এমনটি হয়ে থাকে।