|
বিদেশে কাজের নামে ভয়াবহ প্রতারণা: ৭ বছরে পতিতাবৃত্তি ও নির্যাতনের শিকার হয়ে ফিরলেন হাজার হাজার কর্মী
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
![]() প্রতীকী ছবি ২০২৫ সালের দিকে নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন শিউলি নামের এক নারী। সেখানে প্রাথমিক কর্মস্থলে নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে কাজ বদলানোর চেষ্টা করলে দালালেরা তাকে একটি টিস্যু ফ্যাক্টরিতে ভালো চাকরির লোভ দেখায়। তবে পরবর্তীতে তাকে সেখানে আটকে রেখে জোরপূর্বক দেহব্যবসায় নামানো হয়। নির্যাতনের শিকার শিউলি সাংবাদিকদের জানান, তাকে একটি বদ্ধ ঘরে আটকে রেখে প্রতিনিয়ত মারধর করা হতো এবং পর্যাপ্ত খাবারও দেওয়া হতো না। দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনির পাশাপাশি তাকে চরম অমানবিক লাঞ্ছনার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়ার পরও তাকে ন্যূনতম চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া হয়নি, উল্টো শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। ভুক্তভোগী এই নারী বিভিন্ন স্থানে দফায় দফায় পাশবিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার একপর্যায়ে গর্ভবতী হয়ে পড়েন। এরপর প্রায় পাঁচ মাস প্রবাসের কারাগারে বন্দি থাকার পর দেশে ফিরে তিনি সন্তান জন্ম দেন। মহামারির সময়ে স্বামীকে হারিয়ে মূলত সংসারের পুরো দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতেই তিনি প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত, এই ধরনের মর্মস্পর্শী ঘটনার সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। শুধু ২০২৫ সালেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় দুই হাজার নারী কর্মী চরম নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। একই সময়ে বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশ থেকে ফিরেছেন আরও ৭৪ হাজার পুরুষ কর্মী, যাদের একটা বড় অংশই মূলত দালালের খপ্পরে পড়ে অবৈধ উপায়ে বিদেশে গিয়েছিলেন। এমনকি ২০২৬ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত আরও প্রায় ২৪ হাজার শ্রমিক দেশে ফেরত এসেছেন, যার মধ্যে পুরুষের সংখ্যাই ২৩ হাজার ছাড়িয়েছে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের দেওয়া তথ্যমতে, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী কর্মী প্রবাস থেকে দেশে ফিরেছেন, যাদের সিংহভাগই কোনো না কোনো উপায়ে নির্মম শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছেন। এছাড়া একই সময়ে বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ৮০০ নারী শ্রমিকের মরদেহ দেশে আনা হয়েছে। এই বিষয়ে অভিবাসন বিশ্লেষক শরিফুল হাসান সংবাদমাধ্যমকে জানান, নারী কর্মীদের বিদেশে পাঠানোর পূর্বে যথাযথ কর্মমুখী প্রশিক্ষণ ও যাচাই-বাছাই করা অত্যন্ত জরুরি। একই সাথে প্রবাসে নির্যাতিত হয়ে যারা দেশে ফিরছেন, তাদের আইনি বিচার পাওয়ার পথ সুগম করতে হবে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাসের মাধ্যমে প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করার দাবিও জানান তিনি। প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর গণমাধ্যমকে বলেন, যেকোনো ব্যক্তি বা এজেন্সির বিরুদ্ধে প্রবাসীদের নির্যাতনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তিনি আরও যোগ করেন, সৌদি আরব ও ওমানসহ কয়েকটি দেশে আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে লিগ্যাল ফার্মের সাথে চুক্তি করা হয়েছে, যার ফলে পরিস্থিতির কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন আশা করা যাচ্ছে। সার্বিক এই চিত্র প্রমাণ করে যে, উন্নত জীবনের আশায় বিদেশে যাওয়া বহু বাংলাদেশি—বিশেষ করে নারী গৃহকর্মীরা—আজ সুসংগঠিত প্রতারণা ও নির্মম সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। টিস্যু কোম্পানির মতো ভুয়া প্রতিষ্ঠানের আড়ালে সক্রিয় থাকা এই মানবপাচারকারী চক্রগুলো কেবল চরম মানবিক বিপর্যয়ই ঘটাচ্ছে না, বরং দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ ও জনশক্তি রপ্তানির বাজারেও বড় ধরনের আঘাত হানছে। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা, মানবপাচারকারী চক্রকে কঠোর হস্তে দমন, প্রবাসী দূতাবাসগুলোর তৎপরতা বাড়ানো এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
|
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
