|
জাতীয় বাজেটে পানি সুরক্ষায় সর্বোচ্চ জোর, বিশাল তহবিল বরাদ্দ
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
![]() বাংলাদেশের একটি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ - ছবি: সংগৃহীত বাজেট পেশ করার সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উন্নয়নের জন্য ১০ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেন। এই বিশাল অংকের বরাদ্দ থেকে দেশের নদীগুলোর সংস্কার, সেচ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং বন্যা মোকাবেলা অবকাঠামো তৈরিতে বড় বিনিয়োগের স্পষ্ট আভাস মিলছে। দেশজুড়ে নদী উদ্ধারে বিশেষ মহাপরিকল্পনা প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা এবং বিপন্ন নদনদীগুলোকে নতুন জীবন দেওয়ার লক্ষ্যে দেশের প্রতিটি বিভাগে অন্তত একটি করে নদীকে অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে মুক্ত করার বিশেষ উদ্যোগ হাতে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে চলমান ৭টি প্রকল্পের মাধ্যমে ধলেশ্বরী, লৌহজং, আলাইকুড়ি, মোগড়া, সালতা, সুতাং, বাঁকখালী ও বড়নাই—এই আটটি নদী থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করার কাজ এগিয়ে চলছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করছেন যে, এই পদক্ষেপের ফলে প্রকৃতির বৈচিত্র্য রক্ষা পাবে, স্থানীয় পরিবেশ আরও শক্তিশালী হবে এবং চারপাশের এলাকাগুলোর জলজট ও নিষ্কাশন সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনা তথ্যভিত্তিক শাসনপদ্ধতি গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে রাজধানী ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর জন্য ওয়াটার কোয়ালিটি ইনডেক্স (ডব্লিউকিউআই) বা পানির গুণগত মান নির্ধারণী সূচক তৈরি করেছে সরকার। এর ফলে নদীগুলোর সার্বিক অবস্থা আরও সুনির্দিষ্ট ও পদ্ধতিগত উপায়ে তদারকি করা সম্ভব হবে। একই সাথে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং ডিপ লার্নিং প্রযুক্তির সাহায্যে ভূগর্ভস্থ পানির বর্তমান অবস্থা জানার জন্য একটি রিয়েল-টাইম মনিটরিং ড্যাশবোর্ড চালু করা হয়েছে। এই আধুনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে মাটির নিচের পানির স্তর সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য পাওয়া যাবে, যা পানি সংরক্ষণ ও নিয়মমাফিক তোলার ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ুর পরিবর্তন ও পরিবেশগত সংকটের এই সময়ে এমন আধুনিক প্রযুক্তিগত উদ্যোগ বাংলাদেশের পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনাকে যুগোপযোগী করার ক্ষেত্রে একটি বড় মাইলফলক। দেশব্যাপী বৃহৎ খাল খনন কর্মসূচি পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় বর্তমানে নদী, খাল ও জলাশয় খনন ও পুনঃখনন নামক একটি জাতীয় কর্মসূচি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করছে। এই কর্মসূচিটি আগামী পাঁচ বছরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল, নদী ও পানি নিষ্কাশন পথ খনন করার সরকারের যে বৃহৎ লক্ষ্য রয়েছে, তার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। কেবল ২০২৬-২৭ অর্থবছরেই ৬৮০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট সাধারণ খাল, সেচ নালা ও পানি নিষ্কাশন পথ খনন এবং পুনরায় সংস্কারের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ‘বাংলাদেশের খাল শনাক্তকরণ, শ্রেণিবিন্যাস এবং জিও-ইনফরমেটিক্স ডেটাবেজ উন্নয়ন’ শীর্ষক একটি বড় প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি খালের মানচিত্র তৈরি ও জিআইএস-ভিত্তিক একটি ডিজিটাল নেটওয়ার্ক ডাটাবেজ গড়ে তোলা হবে। এর ফলে দেশের সামগ্রিক জলপথের একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল তালিকা বা আর্কাইভ তৈরি হবে। বন্যা মোকাবেলা ও নৌপথের আধুনিকায়ন আগামী অর্থবছরজুড়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ৩০৯ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে নতুন বাঁধ ও বন্যা সুরক্ষা প্রাচীর নির্মাণ, সংস্কার ও পুনর্বাসনের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে। একই সাথে ৪৮৪ কিলোমিটার নৌপথের পানির গভীরতা বাড়াতে এবং ডুবোচর অপসারণের কাজ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অপরদিকে সরকারের চলমান বন্যা সুরক্ষায় ১৮০ দিনের কর্মসূচি’র আওতায় ইতোমধ্যে ২৯২ কিলোমিটার অঞ্চলে বাঁধ ও বন্যা প্রতিরোধ দেয়াল তৈরি ও মেরামতের কাজ দ্রুত গতিতে চলছে। আশা করা হচ্ছে, এই উদ্যোগগুলো মৌসুমী বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কমানোর পাশাপাশি নদীর পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ও নৌযান চলাচল ব্যবস্থার অগ্রগতিতে বড় ভূমিকা রাখবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভাগ্য পরিবর্তনে মেগা প্রকল্প পদ্মা ব্যারেজ পানি সম্পদ খাতের এবারের বাজেটের মূল আকর্ষণ হলো সদ্য অনুমোদন পাওয়া পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়) মেগা প্রকল্প। নীতিনির্ধারকদের মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য চাষ ও সামগ্রিক পানি ব্যবস্থাপনায় এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন আসবে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন পাওয়া এই বিশাল প্রকল্পের কাজ আগামী জুলাই মাস থেকে শুরু হয়ে ২০৩৩ সালের জুন পর্যন্ত চলবে। এই মেগা প্রকল্পের আওতায় রাজবাড়ী জেলার পাংশায় পদ্মা নদীর ওপর ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি মূল ব্যারাজ তৈরি করা হবে। এর সাথে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন এবং খরা মৌসুমে মিষ্টি পানির জোগান ঠিক রাখতে পদ্মার পানি ধরে রাখা ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা হবে। সরকারি হিসাব মতে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতি বছর ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি ধরে রাখা সম্ভব হবে। ফলে সুন্দরবনসহ সামগ্রিক পদ্মা নদী অববাহিকায় সমুদ্রের লোনা পানি প্রবেশ করা ঠেকানো যাবে। এছাড়াও পাঁচটি শাখা ও উপনদীর নাব্য ফিরে আসবে। প্রায় ২৮ লাখ ৮৮ হাজার হেক্টর চাষের জমিতে উন্নত সেচ সুবিধা দেওয়া সম্ভব হবে। এর ফলে প্রতি বছর ধানের ফলন ২ কোটি ৩ লাখ ৯০ হাজার টন এবং মাছের উৎপাদন ২৩ লাখ ৪০ হাজার টন বৃদ্ধি পাবে। সরকার আশা করছে, দেশের ৪টি বিভাগের ১৯টি জেলার অন্তর্গত ১২০টি উপজেলার বাসিন্দারা এই প্রকল্পের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সুফল পাবেন, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৭ শতাংশ। তিস্তা নদী সুরক্ষায় বিশেষ নজর বাজেট বক্তৃতায় তিস্তা ও পদ্মা নদীর উজানে বিভিন্ন বাঁধ নির্মাণের কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ কমে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানানো হয়। এর ফলে কৃষি, সেচ, মৎস্য সম্পদ ও সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যের যে ক্ষতি হচ্ছে, তাও তুলে ধরা হয়। এই সংকট উত্তরণে সরকার তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প বা বহুল আলোচিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ জোরদার করছে। আধুনিক নদী ব্যবস্থাপনা, পানি ধরে রাখার ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান ও আয়ের উৎস উন্নত করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। পানি সুরক্ষাকেন্দ্রিক ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ভাবনা প্রস্তাবিত এই বাজেটে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জলবায়ুর সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং পরিবেশগত স্থায়িত্বের মূল ভিত্তি হিসেবে পানি সুরক্ষাকে সরকার কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, তা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। নদী থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদ, মাটির নিচের পানি পর্যবেক্ষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এবং পদ্মা ব্যারাজের মতো দেশের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে পানি, কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন ও পরিবেশগত সুরক্ষা জোরদার করার একটি সুসংহত কৌশল এই বাজেটে প্রতিফলিত হয়েছে।
|
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
