|
কয়লা পরিবহনে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, লোকসানে জাহাজ মালিকরা
বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা, অভিযোগের তীর দুই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে
নতুন সময় প্রতিনিধি
|
![]() কয়লা পরিবহনে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, লোকসানে জাহাজ মালিকরা নৌ খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং এই অসাধু চক্রের প্রভাব চিরতরে বন্ধ করতে অবিলম্বে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগীরা। অন্যথায় জাহাজ পরিচালনা অসম্ভব হয়ে কয়লা পরিবহনে সংকট দেখা দেওয়ার আশষ্কা রয়েছে। ফলে রামপাল ও পায়রার মতো বৃহৎ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হয়ে তীব্র লোডশেডিং সহ বিদ্যুৎ খাতে বিপর্যয় দেখা দেবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে দেশে ৫টি কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মধ্যে একমাত্র মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র ছাড়া বাকি কেন্দ্রগুলোতে ভৌগোলিক ও নদীর নাব্য সংকটের কারণে সরাসরি কয়লাবাহী ‘মাদার ভ্যাসেল’ বা বড় জাহাজ ভিড়তে পারে না। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর থেকে লাইটারেজ (ছোট জাহাজ) জাহাজের মাধ্যমে কয়লা খালাস করে নদীপথে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য নিয়ে যেতে হয়। রামপাল বা পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা খালাসের কাজে ব্যবহৃত ক্রেনে ‘গ্রাব’তুলনামুলক বড়, যা প্রায় ৩৫ কিউবিক মিটার আয়তনের। দেশের সাধারণ ছোট লাইটার জাহাজগুলোর ধারণক্ষমতা ১০০০ থেকে ২০০০ টন এবং এদের হ্যাজ বা খোপ ছোট হওয়ায় ওই সব ক্রেনের গ্রাব সেখানে প্রবেশ করতে পারে না। ভুক্তভোগী সেবা প্রদানকারী ও জাহাজ মালিকদের অভিযোগ, বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি) বিষয়টি বিবেচনা না করেই প্রায়শ ছোট জাহাজ বরাদ্দ দেয়, যা বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা খালাসের অনুপযোগী। বিডব্লিউটিসিসি-এর এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কিছু মধ্যস্বত্বভোগী লজিস্টিক্স কম্পানি একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। বিক্ষুব্ধ জাহাজ মালিক ও সেবা প্রদানকারীদের অভিযোগের মূল তীর পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত দুই ব্যবসায়ীর মালিকাধীন প্রতিষ্ঠান কিউএনএস শিপিং লজিস্টিক্স ও এএমএমএস লজিস্টিক্সসহ কতিপয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। এদের মধ্যে কিউএনএস শিপিং লজিস্টিক্স এর চেয়ারম্যান নুরুল কাইয়ুম খান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘ সময় ডিপো মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো’স অ্যাসোসিয়েশন (বিকডা) সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে শফিকুল আলম জুয়েলের মালিকাধীন এএমএমএস গ্রুপ আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে ভারি যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন পণ্য সরবরাহ করে। অভিযোগ রয়েছে, রামপাল বা পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল ঠিকাদার থেকে কয়লা পরিবহনের সাব-কন্ট্রাক্ট পায় এই প্রতিষ্ঠানগুলো। কিন্তু তাদের নিজেদের পর্যাপ্ত লাইটার জাহাজ নেই। ফলে তারা বিডব্লিউটিসিসি-এর নিয়ম অমান্য করে জাহাজ বিভিন্ন মালিক থেকে ভাড়া নেয়। এ ক্ষেত্রে জাহাজ মালিকের ন্যায্য ভাড়া তারা পরিশোধ করে না। জাহাজ মালিকরাও সংশ্লিষ্ট সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর চাপে জাহাজ ভাড়া দিতে বাধ্য হয়। অভিযোগ রয়েছে, মধ্যস্বত্বভোগী কম্পানিগুলো জাহাজ মালিকদের চট্টগ্রাম থেকে মোংলা বা পায়রা রুটে কয়লা পরিবহনে নৌপরিবহন অধিদপ্তর ও বিডব্লিউটিসিসি-এর নির্ধারিত টনপ্রতি ভাড়ার প্রায় অর্ধেক দিচ্ছে । বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় বাজারে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ, স্টাফদের বেতন এবং ক্রমবর্ধমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে এই ভাড়ায় জাহাজ চালানো মালিকদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তারা বলছেন, প্রতি ট্রিপে নির্ধারিত ভাড়া অর্ধেকে কয়লা পরিবহন করে বড় অংকের লোকসান গুনতে হচ্ছে। মালিকদের এ অভিযোগের পরিপেক্ষিতে গত ১৭ মে নৌপরিবহন অধিদপ্তরে এক জরুরি বৈঠক আহ্বান করা হয়। বৈঠকের খবর পেয়ে মধ্যস্বত্বভোগী কম্পানির সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেন জাহাজ মালিকরা। তারা এ সময় বিডব্লিউটিসিসি-এর নীতিমালা শতভাগ কার্যকরের দাবি জানান। কয়লা পরিবহন খাতে এই বিশৃঙ্খলা ও লোকসানের বিষয়ে দেশের অন্যতম কয়লা পরিবহনকারী প্রতিষ্ঠানের এক উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘আমরা এই সেক্টরে একটি যৌক্তিক ও টেকসই শৃঙ্খলা চাই। একদিকে ট্যাক্স-ভ্যাট এবং জ্বালানিসহ সবকিছুর দাম বাড়ায় রেট কমানো যেমন অসম্ভব, অন্যদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর তো মওকুফ হবে না। তাই সরকারের নির্ধারিত ভাড়ায় জাহাজ চলাচল করতে হবে। মাঝখান থেকে মধ্যস্বত্বভোগী এসে যেন জাহাজ মালিকদের ঠকাতে না পারে।’ উদ্ভূত পরিস্থিতি ও সংকটের বিষয়ে বিডব্লিউটিসিসি আহ্বায়ক শফিক আহমেদ বলেন, ‘গত ১৭ মে এর সভায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মধ্যে পায়রার জন্য নৌপরিবহন অধিদপ্তর আলাদা সিরিয়াল করে দেবে, বিডব্লিউটিসিসি থেকে জাহাজ নেবে বলা হয়েছে। পায়রার জাহাজের রেইটও সরকার নিধারণ করে দেবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন দেশের সবচেয়ে জরুরি বিষয়। এর জন্য সরকারের সার্বিক সহযোগিতা থাকবে, জাহাজ মালিকরাও দেশের স্বার্থে সহযোগিতা করবে।’বিডব্লিউটিসিসির অধীনে এক হাজারের বেশি লাইটার জাহাজ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এর বাইরে বড় শিল্পকারখানার মালিকদের নিজস্ব লাইটার জাহাজ রয়েছে। সেগুলো নিজস্ব কাঁচামাল বা পণ্য পরিবহন করে। সরকারি গেজেটে পরিষ্কার বলা আছে, বাকি সব লাইটার জাহাজ বিডব্লিউটিসিসির সিরিয়ালে বা পুলে চলবে।’ ইনল্যান্ড ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব চিটাগংয়ের (আইভোয়াক) ভাইস চেয়ারম্যান পারভেজ আহমেদ সভার সিদ্ধান্তের বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরে বলেন, ‘যেহেতু বর্তমান সরকার কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে, সে জন্য দেশে প্রচুর কয়লা আসছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে যারা কয়লা পরিবহন করে, তারা বিডব্লিউটিসিসির কাছ থেকে জাহাজ চেয়েছে। জাহাজ আমাদের সমিতি বা পুল থেকেই নিতে হবে এমন একটা নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে।’ কারিগরি উপযোগিতার বিষয়ে তিনি স্বীকার করে বলেন, ‘কয়লা পরিবহন নিরবচ্ছিন্ন করার জন্যই মূলত ওই জরুরি সভাটি ডাকা হয়েছিল। পায়রার জন্য আলাদা সিরিয়াল থাকবে। পায়রাতে মূলত তিনটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। তবে সব জাহাজ পায়রা যেতে পারবে না, কারণ সেখানে হ্যাজের (খোপের) মাপ আলাদা। মিনিমাম ২৮ ফুট প্রশস্ত হতে হয় হ্যাজ, যাতে বড় গ্রাব ঢুকতে পারে। আমাদের যদি ১০০০ বা ১১০০ জাহাজ থাকে, সেখান থেকে পায়রার কারিগরি স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী ২০০-৩০০ জাহাজ নির্ধারিত বা আলাদা পুলে থাকবে। গ্রাবের মাপ অনুযায়ী জাহাজ বরাদ্দ দিতে হবে, নয়তো তা বাস্তবে কোনো কাজে আসবে না। একেকটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গড়ে ৫০-৬০টি জাহাজের সার্বক্ষণিক প্রয়োজন হয়। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরত্বের বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, যারা মূল ঠিকাদারদের কাছ থেকে সাব-কন্ট্রাক্ট নেয়, তাদের নিজস্ব জাহাজের সংখ্যা কম। ফলে তারা লাইটার মালিকের জাহাজ সরাসরি কম ভাড়ায় চালিয়ে আসছিল, যা এ খাতে অস্থিরতা তৈরি করছে। নৌ খাতের ব্যবসায়ী, মালিক ও শ্রমিকদের দাবি এই মুহূর্তে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কয়লা সরবরাহ সচল রাখতে এবং মালিকদের লোকসানের হাত থেকে বাঁচাতে হলে নৌ পরিবহন অধিদপ্তর ও বিডব্লিউটিসিসি-কে কঠোর অবস্থানে যেতে হবে। এএমএমএস বা কিউএনএস শিপিংয়ের মতো লজিস্টিক্স কম্পানিগুলো যাতে পুলে নিবন্ধিত রেটের বাইরে গিয়ে মালিকদের লোকসান করতে না পারে, তার জন্য কঠোর মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে এবং নিয়ম ভাঙলে লাইসেন্স বাতিল করতে হবে। নৌ খাতের এই অস্থিরতা শুধু জাহাজ মালিকদের লোকসানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এক বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের চিফ ইঞ্জিনিয়ার অ্যান্ড শিপ সার্ভেয়ার (রুটিন দায়িত্ব) মির্জা সাইফুর রহমান বলেন, জাহাজ মালিকরা অভিযোগ করেছেন তারা সঠিক ভাড়া পাচ্ছেন না। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিষয়টি তদারকি করার বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়েছে। আশা করছি, মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। যোগাযোগ করা হলে অভিযোগ অস্বীকার করে কিউএনএস শিপিং লজিস্টিক্স এর চেয়ারম্যান নুরুল কাইয়ুম খান বলেন, কয়লা বহনকারী লাইটার জাহাজের ভাড়া মালিক পক্ষের সম্মতিতে নির্ধারণ করা হয়। অভিযোগের বিষয়ে জানতে এএমএমএস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিকুল আলম জুয়েলের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন বলে জানান। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
